বান্দরবানে পাথর উত্তোলন বন্ধে আদিবাসীদের প্রচেষ্টা ও হাইকোর্টের নির্দেশনা

বান্দরবানে পাথর উত্তোলন বন্ধে আদিবাসীদের প্রচেষ্টা ও হাইকোর্টের নির্দেশনা

সোহেল হাজং: ২২ মার্চ। বিশ্ব পানি দিবস। বিশ্ব পানি দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’, যা টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০ এর মূল অঙ্গীকার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ এখন সারাবিশ্বে চলমান রয়েছে, যেখানে প্রত্যেকেই উপকৃত হবার কথা রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ৬ নং লক্ষ্য হলো সবার জন্য নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সহজপ্রাপ্যতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। তার মানে এ নিরাপদ পানি সুবিধা হতে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়।

কিন্তু বিশ্বে আজ কোটি কোটি মানুষ নিরাপদ পানির সহজ প্রাপ্যতা হতে বঞ্চিত। তারা তাদের পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, খামার ও কারখানাগুলোতে নিরাপদ পানির জন্য সংগ্রাম করে চলেছে। এ মনুষ্যজনরাই আবার পরিবেশ ও পানি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়! যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা, আলীকদম ও লামা উপজেলার ঝরনা, ঝিরি ও ছরা থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করছে একটি মহল। এর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ তো হুমকীর সম্মুখীন হচ্ছেই সেসাথে স্থানীয় আদিবাসী মানুষের জীবন রক্ষায় নিরাপদ পানির উৎস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয় জনগণের ক্ষোভ ও অভিযোগের কমতি নেই। তারা বারবার প্রশাসনকে অবগত করা হলেও এ পাথর উত্তোলন কাজ বন্ধ করা যাচ্ছে না।

গত একবছর যাবত এ বিষয়টি নজরে এনে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশের চার আদিবাসী তরুণ। তারা এ অবৈধ পাথর উত্তোলন ঠেকাতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ড-এর সহযোগিতায় তারা একটি ছোট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কিন্তু এগ্রুপের একজন সদস্য পল্লব চাকমা বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষা বিষয়ে আমাদের এ কাজকে আমরা শুধু একটি প্রকল্পের কাজ হিসেবে দেখি না। মানুষ ও মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য আমরা আমাদের প্রাণপণ লড়াই চালিয়েই যাব। ‘ তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে, আমরা যদি একসাথে দাঁড়াই ও লড়াই করি, তাহলে আমরা আমাদের সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারব। ‘ অবশেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ঐ এলাকায় পাথর উত্তোলন বন্ধে নির্দেশ দেয় মহামান্য হাইকোর্ট। বান্দরবান পার্বত্য জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী এবং নদীর পার্শ্ববর্তী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ঝরনা, ঝিরি ও ছরা থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধে এ নির্দেশ। এক মাসের মধ্যে পরিবেশ মন্ত্রণালয় সচিব, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক, বান্দরবান জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ মামলার ১০ বিবাদীকে এ আদেশ বাস্তবায়ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া দেয় হাইকোর্ট।

পল্লব চাকমা ছাড়াও এ গ্রুপে রয়েছেন-জেনেট নেকো, লেলুং খুমী ও সোহেল চন্দ্র হাজং। তারা সকলেই অস্ট্রেলিয়া অ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। সামাজিক বিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, মধ্যস্থতা ও দ্বন্দ্ব নিরসন, পরিবেশ ও উন্নয়ন অধ্যয়নসহ নানা বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ চারজনই উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেছেন। এখন সকলেই কাজ করছেন দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও সেবরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে।

এর আগে গত ২৬-২৯ নভেম্বর ২০১৮ ভুটানের থীম্পুতে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ড আঞ্চলিক কর্মশালায় দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার সাতটি দেশের ১৬টি জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক প্রকল্পের কার্যক্রম-এর মধ্যে বাংলাদেশের এ গ্রুপটি চ্যাম্পিয়ন হয়। তাদের কর্মসূচির মধ্যে ছিল-বান্দরবান পার্বত্য জেলার ঐ অঞ্চলের পানি সংকটের দূরাবস্থা ও অবৈধ পাথর উত্তোলন বিষয়ে জনগণকে সচেতায়নে একটি ভিডিও ডকুমেন্টরি প্রকাশ করা। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন সভা সেমিনারে দেখানো হয়। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে স্থানীয় লোকদের মাঝ থেকে এ সমস্যার প্রতিক্রিয়া জানা ও প্রতিবাদ আন্দোলনে তাদের উদ্বুদ্ধ করা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে আলোচনা, স্বারকলিপি পেশ ইত্যাদি কাজও করা হয়। আবার দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় এ গ্রুপটি বান্দরবানে অবৈধ পাথর উত্তোলন ঠেকাতে কী আইনী ব্যবস্থা নেয়া যায় তার জন্য জাতীয় পর্যায়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, আদিবাসী প্রতিষ্ঠান ও আইনজীবীদের সাথে আলাপ আলোচনা করতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল ল’ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), আদিবাসী ফোরাম, নিজেরা করি, কাপেং ফাউন্ডেশন, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) এবং স্থানীয় নাগরিক মং শৈপ্রু খিয়াং হাই কোর্টে রিট দায়ের করেন। যেখানে তারা সফল হন। এখন হাইকোর্টের এ নির্দেশনাতেই কি বন্ধ হচ্ছে বান্দরবানের উক্ত বনাঞ্চলের ঝরনা, ঝিরি ও ছরা থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন? সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে সবার!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য