জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সুনিশ্চিতকরণের প্রস্তাবনা

জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সুনিশ্চিতকরণের প্রস্তাবনা

প্রেক্ষাপট
জাতীয় বাজেট ২০১৯-২০ দেশের সকল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দলিল। অর্থায়নের জন্য করারোপ ও বাজেট ব্যায় বরাদ্দের ধারার ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের ৩০ লক্ষাধিক পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিগত বাজেটগুলোর কোনটিতেই পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। বরং জাতীয় বাজেটে আদিবাসীরা বরাবরই অবহেলার শিকার হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, বিগত কয়েক বছরের বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসীদের সম্পর্কে কোন একটি আলাদা অনুচ্ছেদ/প্যারাগ্রাফ বা সুস্পষ্ট বক্তব্যের উপস্থিতি ছিল না। এমনকি তাদের জনসংখ্যা অনুপাতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। বাজেট প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের সরাসরি অন্তভূর্ক্তিও করা হয়নি।
জাতীয় বাজেটের আকার প্রতিবছর বাড়তে থাকে। বাজেটে দেশের উন্নয়নে নানা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়। যার ফলে দেেেশর গড় আয় ও উন্নয়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটি একটি ভালো দিক। কিন্তু দেশে টেকসই উন্নয়ন আনার জন্য জাতীয় গড় আয়ের সাথে আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের আয়ের যে তারতম্য রয়েছে তা দূর করতে হবে। যেমন; বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২৩.২০% এ কমে এসেছে, সেখানে বাংলাদেশের শুধুমাত্র সমতলের আদিবাসীদের মাঝে দারিদ্র্যের হার এখনও ৮০% এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মাঝে তা ৬৫% । তাহলে জাতীয় আয় বাড়লেই যে আদিবাসী এবং প্রান্তিক মানুষের আয় বাড়বে কিংবা জাতীয় দারিদ্র্য হার কমলেই যে অন্যদের বেলায়ও তা কমবে তা ভাবা ঠিক হবে না। এজন্য আদিবাসী বা প্রান্তিক মানুষদের সামনের দিকে টেনে তোলার জন্য জাতীয় বাজেটেও তাদের পেছনে না রেখে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং সকলক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাজেটে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। আমরা মনে করি, এদেশের আদিবাসীদের দুঃখ, কষ্ট ও যন্ত্রণাকে জিঁইয়ে রেখে শুধুমাত্র গড় আয় বৃদ্ধি করে প্রকৃত উন্নয়ন বা টেকসই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

মিলেনিয়াম ডেভেলেপমেন্ট গোলের (এমডিজি) লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সফল হলেও আদিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। বর্তমান সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বা ভিশন ২০৩০ নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রা উন্নয়নের পাশাপাশি আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনে অঙ্গীকারবদ্ধ। ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ এসডিজির এ মূলমন্ত্রটি গুরুত্ব দিয়ে সরকার আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০১৯-২০-এ আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের কথা প্রাধান্য দিবে এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে, এটাই আদিবাসীদের প্রত্যাশা।

আদিবাসী পরিচিতায়ন ও জনসংখ্যা
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের আদিবাসীদের বিভিন্নভাবে পরিচিত করেছেন, যেমন ‘উপজাতি’, ‘ট্রাইবাল’, ‘ইনডিজিনাস পিপল’ ‘জুম্ম বা হিল পিপল’ ও ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ ইত্যাদি। রাষ্ট্র সর্বশেষ বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ২৩(ক) উপধারার মাধ্যমে এ জাতিসত্তাসমূহকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে সংবিধানে উল্লেখ করেছেন । দেশের মূল জনস্রোতের আরোপিত সাম্প্রদায়িক এ প্রত্যয়গুলোর উর্দ্ধে রাষ্ট্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের চিরন্তন অভিব্যক্তিকে উপলব্ধি করে এদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবেই পরিচয় দিবে, এ দাবি আদিবাসী জনগণের।

সরকারি হিসেবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৫৮ লাখ । উপজাতি বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৫,৮৬,২৩২ জন । ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগণ, এ হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১.১০ ভাগ। কিন্তু বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের দাবি, বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলে ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগণ বসবাস করেন । কেউ কেউ মনে করেন এদেশে আদিবাসীদের সংখ্যা হবে তারও বেশি। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাথে সরকারি পরিসংখ্যানে জনসংখ্যা নিরূপনের বিস্তর এ ব্যবধান, সত্যি ভাবার বিষয়। সমতল এবং পাহাড়ের আদিবাসীদের নিয়ে কর্মরত মানবাধিকার সংগঠন ‘কাপেং ফাউন্ডেশন’সহ বিভিন্ন আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও তাদের নেটওয়ার্কসমূহের মতে, বাংলাদেশে ৫৪ টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কমপক্ষে ৩০ লক্ষ জনগণের বসবাস রয়েছে । আদিবাসী জনসংখ্যার সঠিক তথ্যের সার্বজনীনতা না থাকায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা এখনও নির্দিষ্ট নয়। যার ফলে, জাতীয় বাজেটে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। সরকারি মতে, আদমশুমারি ১৯৯১-এ প্রায় ১২ লক্ষ, ২০০১-এ ১৪ লক্ষ এবং ২০১১-এ ১৫ লক্ষ ৮৬ হাজার আদিবাসী জনগণ বাংলাদেশে বসবাস করেন। কিন্তু বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের মতে, এ সংখ্যা আরো বেশি হবে।

সঠিক পরিসংখ্যানের অভাবে আদিবাসীরা উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দে বৈষম্যের শিকার
অনেকক্ষেত্রে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সরকার বাজেট প্রণয়ন করে থাকে। এ যাবত পাঁচবার আদমশুমারি হওয়া সত্ত্বেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি। তাদেও সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় সঠিকভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাজেট প্রণয়ন ব্যাহত হচ্ছে। জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দের চিত্র দেখলে বুঝা যায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রে নাগরিক সুযোগ সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আগামী আদম শুমারি ২০২১-এ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান ও মানচিত্রায়নের জন্য প্রয়োজন পৃথক ‘আদিবাসী শুমারি’। তাহলেই বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমতা এবং আদিবাসীদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।
প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়ছে। নতুন নতুন প্রত্যাশাও বাড়ছে। অর্থমস্ত্রী আ হ ম মস্তফা কামাল বলেছেন, “এবার বাজেটে মজা পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে” । আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নে এবার বাজেট চমক সৃষ্টি করুক আমরা এমনটা চাই। কারণ বাজেট বৈষম্য ও অবহেলার এখানেই ইতি ঘটুক। বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট সমূহে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে আদিবাসীদের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ রাখা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য যে উন্নয়ন বরাদ্দ হয় এবং তা বাস্তবায়ন করে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। কিন্তু বরাদ্দকৃত এই অর্থ শুধুমাত্র পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এই অঞ্চলে বসবাসকারী সেটেলার বাঙালি, স্থানীয় অআাদিবাসী ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর উন্নয়ন খাতেও খরচ হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রনালয়ের বরাদ্দকৃত এই অর্থ। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলের আদিবাসীরা যে বাজেট বরাদ্দে বৈষম্যের শিকার তা নিম্নের চিত্রগুলো হতে স্পষ্ট প্রতীয়মান;

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের পরিমাণ (বিগত ১০ বছরে) নিম্নরূপঃ
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সম্পাদিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ অনুযায়ী তার পরবর্তী বৎসরে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা হয়। এই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের সমন্বয় সাধন এবং এই অঞ্চলের জনসাধারণের সাংস্কৃতিক উন্নয়নসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যথাযথ ব্যবস্থাদি গ্রহণের কথা রয়েছে।
যেখানে ১৪টি আদিবাসী জাতিসত্তার ১০ লক্ষাধিক মানুষসহ তার প্রায় সমপরিমাণ বাঙালি জনগণ সেখানে বসবাস করছে। প্রয়োজন অপেক্ষা কম অর্থ বরাদ্দ এবং আদিবাসীদের মূল সমস্যা সমাধানে নির্দিষ্ট বরাদ্দ না থাকায় পাহাড়ি আদিবাসীদের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না। বিগত বছরের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাজেট সারণীতে পর্যায়ক্রমে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, বাজেট বৃদ্ধির হার কত মন্থর। ২০১৬-২০১৭ সালের অর্থ বছরে ৮৪০ কোটি অর্থ বাজেট বরাদ্দ ছিল। ২০১৭-২০১৮ সালের অর্থ বছরে বরাদ্দ সামান্য বেড়ে হয় ১১৫০ কোটি টাকা।
বিগত ২০১৮-২০১৯ সালে জাতীয় বাজেটের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১৩০৯ কোটি টাকা। বাজেটের আকার বাড়ছে প্রতি বছর, যার ব্যয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতওয়ারী হয়ে থাকে। এটি সহজবোধ্য যে, মূল বাজেট হতে আদিবাসীদের উন্নয়নে সরাসরি বরাদ্দ পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নের জন্য ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ রয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট অপ্রতুল। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা আদিবাসী ও বাঙালিদের জন্য উন্নয়নমূলক বরাদ্দ মূলত সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়। সুতরাং, বরাদ্দকৃত অর্থ শুধু আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্যে ব্যবহৃত হয় না।

সমতলের আদিবাসীদের জন্য সরকারি বরাদ্দ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের Development Assistance for Special Area (except CHT) বা “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক কর্মসূচি সংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী উল্লেখকৃত যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে বাস্তবায়নাধীন “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক কর্মসূচির কার্যক্রম ১৯৯৬-৯৭ সালে ৫ কোটি অর্থ বরাদ্দ দিয়ে শুরু করা হয়েছে যা চলতি অর্থ বছর পর্যন্ত চলমান আছে। দেশের বিভিন্ন জেলার সমতল ভূমিতে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। কর্মসূচিটি শুরু থেকে সম্পূর্ণ সরকারী অর্থে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কর্মসূচির অনুকূলে বিগত ২০০৯-১০ হতে ২০১৮-১৯ বিগত ১০টি অর্থ বছরে মোট ১৯৬.০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এই কর্মসূচীর উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক কর্মসূচির মাধ্যমে সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন।

সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের পরিমাণ (গত ১০ বছরে) নিম্নরূপঃ
বিগত ১০ বছরের সমতলের আদিবাসীদের জন্যে অর্থাৎ ৬১ টি জেলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ মোটেই সঙ্গত নয়। সরকারি পরিসংখ্যানের মতে, হিসাব কষলে বিগত ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ১ জন সমতলের আদিবাসীর জন্য গড়ে বাজেট হয় ১০০ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে তা বেড়েছে ১৫০ টাকায়। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ২০০ টাকায়। জাতীয় বাজেটে গড়ে প্রতি জনের জন্য বরাদ্দ যেখানে ১১,২২৯ টাকা সেখানে পিছিয়ে পড়া বঞ্চিত একজন আদিবাসী প্রেষণামূলক বার্ষিক বরাদ্দ ২০০ টাকায় কতটুকু অগ্রসর হয়ে উন্নয়নের মূল ধারায় আসতে পারবেন তা সত্যিই প্রশ্ন সাপেক্ষ?
২০১০-১৬ সালের মধ্যে ৪০০টি প্রকল্পে ৪,৫৬২.২৭ লক্ষ্য টাকা ২৭০ টি উপজেলায় ১,০৬,০৫০ জন উপকারভোগীর মধ্যে বন্টন করা হয়েছে । সমতলের প্রায় ২০ লক্ষাধিক আদিবাসীদের জন্য ১ লাখ উপকারভোগী যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত কম। আবার এর বন্টন প্রক্রিয়ার মধ্যেও রয়েছে নানা জটিলতা। আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত এই প্রকল্পের মধ্যে অন্যান্য জনগণকেও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত আদিবাসী উপকারভোগী জনগণের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। একদিকে যেমন অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ আদিবাসী জনসংখ্যা অনুযায়ী খুবই কম আবার অন্যদিকে, প্রতি বছর সবগুলো উপজেলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে একসাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ এ বরাদ্দ প্রদান করা হয় না। তাই কোনো কোনো উপজেলার আদিবাসীদের এ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সমতলের আদিবাসীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা’ নামে থোক বরাদ্দ ছিল ৩০ কোটি টাকা। এ টাকার অর্ধেক অর্থাৎ ১৫ কোটি টাকা দেশের ৮ টি বিভাগের ১২০ টি উপজেলায় আদিবাসীদের আয়বর্ধন প্রকল্প/শিক্ষা বৃত্তি ও অন্যান্য খাতে খরচের জন্য বিভাজন করা হয়। ঐ বছরের বাজেটে দেখা যায়, কতগুলো উপজেলা রয়েছে যেখানে আদিবাসী অধ্যুষিত কিন্তু বাজেট নেই। আবার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা নয় কিন্তু বরাদ্দ ২০ লক্ষ টাকার ওপর। যেমন ময়মনসিংহ বিভাগের দুর্গাপুর, ধোবাউড়া ও নালিতাবাড়ী উপজেলাগুলো আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা হয়েও কোন বাজেট হয়নি আবার নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলায় মাত্র ১৫ পরিবারের মতো আদিবাসী রয়েছে কিন্তু এ উপজেলায় বাজেট ২১.৮৯ লক্ষ টাকা। এরকম আরো অসম বন্টন ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আদিবাসীদের অন্তর্ভূক্তিকরণ কতটুকু?
গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার জাতীয় বাজেটে প্রতিফলিত হবে। কিন্ত সংবিধানের ১৯ (১) অনুচ্ছেদ ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন’ কথাটি বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কতটা বিবেচনা করা হয়! যদি তা হতো, তাহলে আদিবাসী পিছিয়ে পড়া মানুষ বাজেটের খাতভূক্ত বরাদ্দে অবহেলার শিকার হতেন না। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আমরা দেখেছি একটি বিরাট অংশ বরাদ্দ প্রতিবছরই থাকে। ২০১৬-১৭ সালে এখাতে বরাদ্দ ছিল ৪৫,২৩০ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ সালে ৫৪,২০৬ কোটি এবং ২০১৮-১৯ সালে ৬৪,১৭৭ কোটি টাকা। কিন্তু সমতলের আদিবাসীদের জন্য “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” নামে থোক বরাদ্দ ছিল ২০১৬-১৭ সালে ২০ কোটি, ২০১৭-১৮ সালে ৩০ কোটি এবং ২০১৮-১৯ সালে ৪০ কোটি। যদিও এ টাকার কত শতাংশ আদিবাসীদের মাঝে সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হয়েছে তার কোন হিসেব নেই।

সমতলের সহজ সরল আদিবাসীরা আমলাতন্ত্রের জটিলতার মধ্যে কতটুকু সামজিক সেবা লাভ করতে পেরেছে, তা সত্যিই ভাবার বিষয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী; ভিজিএফ, ভিজিডি, এফএফই, কাবিখা, কাবিটা ইত্যাদি বড় বাজেটগুলোতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্তি খুবই কম। টিআইবি-এর একটি গবেষণায় ওঠে এসেছে, একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড পেতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৫০০-৫,০০০ টাকা, প্রতিবন্ধী ভাতা পেতে ১,০০০-৫,০০০ টাকা, বিধবা ভাতা পেতে ৫০০-২,০০০ টাকা, মাতৃত্বকালীন ভাতা পেতে ৫০০-৪,০০০ টাকা, ভিজিএফ/ভিজিডি ১,০০০-২,০০০ টাকা, গৃহ নির্মাণে ৬,০০০-২০,০০০ টাকা আদিবাসীদের কাছ থেকে উত্তোলন করা হয় । আদিবাসীরা অধিকাংশই প্রান্তিক ও গরীব। তাদের কাছে এই নিয়মবহির্ভূতভাবে দেয়ার মতো অর্থ ও লবিং ক্ষমতা থাকে না বলে এ সেবা থেকে তারা প্রায়শই বঞ্চিত হয়। শুধু তাই নয় তাদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে দেয়া বরাদ্দ “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” বাস্তবায়নেও উপজেলা পর্যায়ে নানা অনিয়ম, নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় ইত্যাদি অভিযোগ পাওয়া যায়।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় আদিবাসীরা প্রান্তিকতার শীর্ষে অবস্থান করলেও সামাজিক নিরাপত্তা ঝুঁকির রাষ্ট্রীয় সুযোগ ভোগ করতে পারছে না। অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকত তাঁর গবেষণা ‘বাংলাদেশের কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ মধ্যে বলেছেন, ‘প্রান্তিকতার যত মাত্রা জানা আছে তার সবটাই আমাদের দেশের আদিবাসী মানুষের জন্য পূর্নমাত্রায় প্রযোজ্য। আদিবাসী মানুষের জমি ও বন দখলে বিভিন্ন রুপের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বেশ রীতিতে পরিণত হয়েছে। আর এসবে সরকার-রাষ্ট্র কখনও প্রভাবক কখনও নির্বিকার। আদিবাসী মানুষের আর্থিক উন্নয়নের জন্যে তাই প্রয়োজন সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে তাদের অর্ন্তভূক্তিকরণ।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের মানদন্ডে ইতিমধ্যে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। মধ্যমে আয়ের দেশে পরিণত হতে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল- কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার মাথাপিছু আয় (বাংলাদেশে যা বর্তমান; ১৭৫২, টাকার মূল্য প্রায় ১,৪৫,৪১৬ টাকা) । ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগনের কয় জনের জাতীয় মাথাপিছু আয়ের সাথে সামঞ্জস্য আছে তা সত্যিই ভাবার বিষয়? একদিকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার স্বীকৃতি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এনে দিচ্ছে মর্যাদা অন্যদিকে তা উন্নয়ন সহযোগীদের বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। ফলে নিজস্ব অর্থায়নে আদিবাসী সহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন সরকারের কাছে খুবই চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১৫-১৬ হতে ২০১৯-২০, অনুচ্ছেদ ১৪; ‘সামাজিক সুরক্ষা, সামাজিক কল্যাণ ও সামাজিক অর্ন্তভূক্তি’ এর ‘সামাজিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সেবা’র আওতায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সামাজিক মূলধারা নিয়ে আসতে একটি কার্যকর নালিশ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা’ তৈরি করবেন । ২০১৯-২০ বাজেটে এই প্রতিশ্রুতির প্রতিফল সরকার ঘটবে এটা আদিবাসী জনগণের আশা।

বাজেট বরাদ্দে সরকারের নীতি ও চুক্তির বাস্তব প্রতিফলন প্রয়োজন
পঞ্চবার্ষিক (৫ম ও ৬ষ্ঠ) পরিকল্পনায় সরকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কথা উল্লেখ করলেও জাতীয় বাজেটে তার প্রতিফলন হয়নি। সরকার ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অনুচ্ছেদ ১৪ মধ্যে, নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর জন্যে কৌশল’ প্রণয়নে জাতিসংঘ ঘোষণা, পার্বত্য শান্তিচুক্তি, ভূমি অধিকার, নৃতাত্বিক জনগণের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা-ভাষা-সংস্কৃতিতে অভিগম্যতা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিবে এ কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছে। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্য প্রণীত এ সমস্ত নীতি-চুক্তি প্রতিফলিত হবে যদি বাজেটে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ পর্যাপ্ত থাকে। উপরন্তু আদিবাসীদের মধ্যে নিরঙ্কুশ দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ৬৫ শতাংশ ও ৪৪ শতাংশ। চরম দারিদ্র আদিবাসীদের কাজ খুঁজে পাবার সামর্থ্যও তাই কম, যা তাদের অবস্থাকে আরও করুণ করে তোলো। প্রস্তাবিত বাজেটে তাই আদিবাসী জনগণের জন্যে রাষ্ট্রের এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিগুলোর আঙ্গিকে বাজেট প্রণয়ন করা উচিত।

বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্পর্কিত বেশকিছু রাষ্ট্রীয় নীতি বা আইন যেমন- পূর্ব বঙ্গীয় প্রজাসত্ব আইন- ১৯৫০, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ ইত্যাদি রয়েছে। এ নীতিসমূহের প্রকৃত বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকে না।

নির্বাচনী অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন জরুরি প্রয়োজন
‘আদিবাসী মানুষ-পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে নিরন্তর বঞ্চিত। পার্বত্য হোক আর সমতল হোক-আদিবাসী মানুষের মানুষ হিসাবে উন্নয়নের কোন মানদন্ডেই ভাল নেই। জমি-জলা-জঙ্গল-এ আদিবাসী মানুষের মালিকানা বা অভিগম্যতা নেই (সামাজিক, প্রথাগত, ঐতিহ্যগত, গোষ্ঠীগত, ব্যক্তিগত)- এ মানদন্ডে আদিবাসী মানুষের হয়েছে আধোগতি। আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থানীয় উদ্যেগ, স্থানীয়-শাসন-কোন কিছুতেই তাদের এখন মূল ধারায় অর্ন্তভূক্ত করা যায়নি। ১৯৯৭ সালে (০২ ডিসেম্বর) ‘শান্তিচুক্তি’ খ্যাত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার প্রায় ২০ বছর পরেও এখনও পর্যন্ত পার্বত্য আদিবাসী মানুষের মধ্যে বঞ্চণা-বৈষম্য হ্রাসকারী জনকল্যানকারী কোন স্থায়ী উন্নয়নের সুলক্ষণ প্রতিভাত হয়নি।’ আর্থিক বাজেটের মধ্যেও সরকারের প্রতিশ্রুতি শুধু প্রতিশ্রুতি হিসেবেই আছে।

আওয়ামীলীগ ৯ম জাতীয় সংসদ (২০০৮) নির্বাচনী ইশতেহারের ১৮.১ দফায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে ‘আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকার সনাতনি অধিকারের সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করবে।’ ১৮.২ দফায় প্রতিশ্রুতি দেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।’ ৯ম সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর ১০ম সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন জোট পুনরায় সরকার গঠন করলেও এখনো সেসব প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। দিন বদলের সনদে ১০ম জাতীয় সংসদ (২০১৪) নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮.১ ও ১৮.২ সামান্য পরিবর্তত হয়ে ২২.১ ও ২২.২ হিসেবে ইশতেহার হিসেবেই থেকে যায়। আওয়ামীলীগ আবারো আগের আদলেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৮) নির্বাচনী ইশতেহারে ৩.২৯ ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্বা, নৃ-গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অনুন্নত সম্প্রদায়ের’ জন্য লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ঠিক করেন। দিন যায় আদিবাসীদের জন্য শুভ দিনের উদয় হয়না।

মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ
বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। মোট জনসংখ্যার মধ্যে আদিবাসীদের সংখ্যা ৩০ লক্ষাধিক। সে অনুযায়ী বলা যায়, আদিবাসী জনসংখ্যা এদেশের সমগ্র জনসংখ্যার প্রায় ২%। সে হিসেবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৪ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেটে তাদের জন্য ৯ হাজার ২৯১ কোটি টাকার বেশী বরাদ্দ হওয়ার কথা ছিল। এটি জনসংখ্যা অনুযায়ী অংকের হিসাব। যেহেতু আদিবাসীরা নানাকারণে শোষণ, বৈষম্য ও মানবসৃষ্ট দরিদ্র ও বঞ্চনার শিকার, তাই বরাদ্দ শতকরা হিসাবের বাইরে আরো বেশি হওয়া উচিত।

কিন্তু প্রকৃত বাজেট বরাদ্দ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ে (যেখানে আদিবাসীদের জন্য একটি অংশ বরাদ্দ থাকে) ১৩০৯ কোটি টাকা আর সমতলে মাত্র ৪০ কোটি টাকা। তাতে হিসেব কষলে সমতলের একজন আদিবাসীর ভাগে পড়ে মাত্র ২০০ টাকা। তবে, তার চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই অর্থ বাস্তবায়নে সমতল আদিবাসীদের কোন অংশগ্রহন বা ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মূখ্য সচিবের অধীনে সংশ্লিষ্ট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে উন্নয়ন মূলক প্রকল্পের অর্থ বন্টন করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে এবং উপজেলার বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তা, ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় কয়েকজন আদিবাসী প্রতিনিধিসহ একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে এ অর্থ বন্টনের কাজ করা হয়। সমতলের আদিবাসী জনগণ এখনও ভালোভাবে এ অর্থ বরাদ্দের সুষ্ঠু বন্টন প্রক্রিয়ার সর্ম্পকে অবগত নয়। আবার কোনো কোনো জায়গায় এ অর্থ বন্টনে স্বচ্ছতা নিয়েও নানান প্রশ্ন ওঠেছে। অর্থ বন্টনের এই বিষয়টিতে স্বভাবতই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যায়। সমতলের আদিবাসীদের বরাদ্দকৃত অথের্র সুষ্ঠু ব্যবহার এবং আদিবাসীদের উন্নয়নের মূল প্রকৃতভাবে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন তাই সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়।

জাতীয় বাজেটে আদিবাসী অধিকার সুনিশ্চিতকরণের প্রস্তাবনাসমূহঃ
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনে উন্নয়নের বিকাশ ঘটাতে হলে প্রয়োজন জাতীয় বাজেটে আদিবাসীদের বরাদ্দ বৃদ্ধি। তখন খুব সহজে তারা দেশের মূল ¯্রােতের জনগণের সহিত সামনে অগ্রসর হবার সুযোগ পাবে এবং ক্রমান্বয়ে অনগ্রসরতা কাটিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে। বাংলাদেশে পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর, অবহেলিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত-নির্যাতিত আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও তাদের অধিকার সুনিশ্চিতকরণে আমাদের প্রস্তাবনাসমূহ নিম্নে তোলে ধরা হলো;

১.সমতলের আদিবাসীদের বিষয়টি দেখার জন্য এখনও কোন পৃথক মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর নেই। তাই, সমতলের আদিবাসীদের উন্নয়ন ও অংশগ্রহণমূলক বাজেট নিশ্চিতকরণে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে;
২.আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্য খাতভিত্তিক ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
৩.সকল মন্ত্রণালয়ের/বিভাগের বাজেটে আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে এবং বরাদ্দের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে এবং এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে;
৪.জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় আদিবাসী বিষয়ে স্পষ্ট বিবরণী থাকতে হবে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা নিরুপণ এবং বাজেট বরাদ্দে জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে;
৫.পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ এর পূর্ণ বাস্তবায়নে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও ভূমি কমিশনের কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বরাদ্দ রাখতে হবে;
৬.পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদসমূহের বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা শক্তিশালীকরণে পর্যাপ্ত বাজেট রাখতে হবে;
৭.জুম্ম শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য ‘টাস্কফোর্স’ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ রাখতে হবে;
৮.আদিবাসীদের স্বস্ব সামাজিক অনুশাসন, প্রথা, কৃষ্টি, নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও মর্যাদা বৃদ্ধি এবং প্রতিপালনে ‘আদিবাসী কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠন করতে হবে;
৯.আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমীগুলোতে আদিবাসীদের সংস্কৃতি উন্নয়নে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে এবং তাদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য বিশেষ বরাদ্দসহ একাডেমীর কর্মী নিয়োগে আদিবাসীদের প্রাধান্য দিতে হবে;
১০.সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সামাজিক ক্ষমতায়নের বাজেট খাতে আদিবাসীদের সেবা লাভ নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনা থাকতে হবে;
১১.উচ্চ শিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষায় বৃত্তিসহ আদিবাসী নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে;
১২.আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, স্বস্ব মাতৃভাষা জানা শিক্ষক নিয়োগ ও পর্যায়ক্রমে দেশের সকল আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে;
১৩.টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও আদমশুমারি ২০২১-কার্যক্রমের সাথে আদিবাসীদের সরাসরি সম্পৃক্ত রাখতে হবে, সকল আদিবাসী জাতিসত্তার আর্থ-সামাজিক, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে বিভাজিত তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগ নিতে হবে এবং সকল উন্নয়ন প্রক্রিয়ার তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজেট রাখতে হবে।
১৪.নির্বাচনী অঙ্গীকার ও আদিবাসী অধিকার সম্পর্কিত নীতিমালা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।
……………………………………………..
কাপেং ফাউন্ডেশন ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত আলোচনায় সভায় পঠিত মূল প্রবন্ধ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য