অস্তিত্বহীন উন্নয়নের চেয়ে উন্নয়নহীন অস্তিত্ব ভালো: লেলুং খুমী

অস্তিত্বহীন উন্নয়নের চেয়ে উন্নয়নহীন অস্তিত্ব ভালো: লেলুং খুমী

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু আদিবাসীদের সমসাময়িক অবস্থা পর্যবেক্ষন করলে কেমন যেন মনে হয় তারা পরিকল্পিত-অপরিকল্পিত দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ারে এবং সম্প্রীতির মায়া চাঁদরে মোড়ানো এক কন্টকাকীর্ণ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আজ সংখ্যালঘু আদিবাসীদের জীবন-জগৎ যেন এক অদৃশ্য শক্তির বলয়ে বেষ্টিত এবং দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন দিনের পর দিন চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন তাদের জন্য আর কোন নতুন সূর্য উঠবেনা পূর্ব দিগন্তে। বাংলাদেশের আদিবাসীদের অস্তিত্ব সংকট যেন দিনের পর দিন সেই পশ্চিমা আকাশে হেলে পড়া সূর্যাস্তের মত। এক কদম সামনে এগুলে দুই কদম যেন পিছুতে বাধ্য হচ্ছে। এ যেন শাসকগোষ্ঠী আদিবাসীদের সাথে এক প্রকার কানামাছি খেলা খেলছে যে “দিনের আলোয় গাছের শিকড়ে লোক দেখানোর জন্য পানি দিচ্ছে আর রাতের অন্ধকারে রীতিমত শিকড়গুলো কেটে দেওয়া হচ্ছে”। আদিবাসীদের অস্তিত্বকে যেন কৃত্রিম উপায়ে পদ্ধতিগতভাবে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন কার্যকর না করে বা প্রয়োজনীয় কার্যকরী আইনী পদক্ষেপ না নিয়ে এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৪০-৫০ বৎসরের মধ্যে বাংলাদেশের আদিবাসীদের অস্তিÍত্ব ভয়াবহ হুমকির মধ্যে পড়বে- এটা অপ্রিয় সত্য এবং অনুমেয়।

বাংলাদেশ সরকার সংখ্যালঘূ আদিবাসীদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু, তাদের কাঙ্খিত জাতিসত্তার আত্ম-পরিচয়, আত্ম-নিয়ন্ত্রন অধিকার দিতে এবং মানবাধিকার রক্ষায় নির্মমভাবে অনিচ্ছুক বললেও ভূল হবেনা। আদিবাসী সংশ্লিষ্ট যত প্রকার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনকানুন (যেসব আইনে বা সনদে সরকার অনুস্বাক্ষর করেছে) রয়েছে- সেগুলোর অধিকাংশই মানা হচ্ছে না বা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আংশিক মানা হলেও যাদের উপর বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তায় তারাও যেন অদ্ভূত এক অদৃশ্য শক্তির জালে আটকে গেছে। আমরা নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে যদি ১৯৯৭ সালের তৎকালীণ আওয়ামী লীগ সরকার অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাশীন দল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যকার সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিকে বিশ্লেষণ করি, তবে চুক্তির মূলধারা সমূহ তথা যে ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা হলে আদিবাসীরা বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারবে, সেসব ধারাগুলো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়ে গেছে। যে চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ জনগণ স্বপ্ন দেখেছিল যে দীর্ঘ বৎসরের রাজনৈতিক সংকট সমাধান হবে। এবং সকল জাতিগোষ্ঠী উন্নয়নের অংশীদার হয়ে আত্ম-মর্যাদার সাথে তারা নিজেদের ভাগ্য বিনির্মানের সুযোগ পাবে। তারা বিশ্বাস করেছিল যে আর কখনো তাদের ভূমি বেদখল হবেনা, উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ হবেনা কিংবা আতংকে দিন কাটাতে হবেনা, সাম্প্রদায়িক হামলা বা মিথ্যা মামলার শিকার হতে হবেনা, বিচারহীনতার সংস্কৃতির সম্মুখীন হতে হবেনা, ভ্রাতৃত্ব সংঘাত থাকবেনা, খুন-গুম বন্ধ হবে, দিনে-রাত্রে মা-বোনরা নিরাপদে থাকবে বা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তথা ক্ষমতার কাঠামোয় সকল জাতিসত্ত্বার কম-বেশি প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। সর্বোপরি, সংখ্যালঘূ আদিবাসীরা আশা করেছিল এ দেশের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র তথা শাসকগোষ্ঠী তাদের দায়িত্বশীল এবং নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে সকলের মানবাধিকার রক্ষা নিশ্চিত করবে।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন! আদিবাসী মা-বোনদের এখনো অনিরাপত্তায় দিনাদিপাত করতে হচ্ছে এবং তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ বন্ধ হচ্ছেনা। পার্বত্য চুক্তির ২১ বৎসর পরও চুক্তির মূলধারা সমূহ বাস্তবায়ন করা হচ্ছেনা। বরং নতুন নতুন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ যেন নির্দিষ্ট রোগ চিহ্নিত হওয়ার পরও সঠিক ঔষুধ ব্যবহার করছেনা বা করতে দেওয়া হচ্ছেনা। পার্বত্য চুক্তির আলোকে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ যথা ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইন-শৃঙ্খলা, পুলিশ বিভাগ সমূহ জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর না করে বহুমূখী উন্নয়নের নামে তথা পর্যটন শিল্প উন্নয়ন বা রাবার বাগান সৃজনের নামে শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আদিবাসীদের ভোগ দখলীয় হাজার হাজার একর ভূমি বেদখল করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রাকৃতিক সম্পদ ও সংরক্ষিত বন অবাধে ধ্বংস করা হচ্ছে, এবং ঝিড়ি-ঝরনা থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করার কারণে অনেক আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদ আতংকে জীবনযাপন করছে। পরিবেশ ধ্বংসের কারণে জীব বৈচিত্র বিলুপ্ত হচ্ছে। আদিবাসীদের জীবিকার ক্ষেত্রগুলো তথা বেঁচে থাকার অবলম্বনগুলো সংরক্ষিত না হলে বিশ্বের বুকে বহু-জাতি রাষ্ট্রের বৈচিত্রতার পরিচয়ে আমরা যে অহংকার করে আসছি সেই সুযোগ আর পাবোনা অদূর ভবিষ্যতে। এটা যেমনি রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয় ঠিক তেমনি গণতন্ত্র বিকাশের জন্যও মঙ্গল বয়ে আনবেনা।

আদিবাসীদের নিয়ে শাসকগোষ্ঠীদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরী। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা ভাষা-সংস্কৃতির উর্দ্ধে উঠে মানবতার দৃষ্টিতে এ দেশের নাগরিক হিসেবে তাদেরকে সাংবিধানিক আত্ম-পরিচয় স্বীকৃতি দিয়ে আত্ম- মর্যাদার সহিত স্বকীয় সংস্কৃতি-মূল্যবোধ নিয়ে বাঁচার অধিকার দিতে হবে। সকল সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীরা সমতার ভিত্তিতে নয়, বরং ন্যায্যতার ভিত্তিতে যাতে উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বাংলাদেশের বহু-জাতি রাষ্ট্রের বৈচিত্রতা রক্ষার্থেই হোক কিংবা হোক সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে সরকারের রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার কোন বিকল্প নাই।

আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে এমন কোন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহন করা উচিত নয় যার প্রভাব তাদের স্বকীয় জীবন জীবিকা, সংস্কৃতি এবং আচার-বিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আদিবাসীরা এমন উন্নয়ন চায়না যে উন্নয়নে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভূগবে, উচ্ছেদ আতংকে থাকতে হবে, সুন্দর এবং স্থায়ীত্বশীল পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারবে না। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন হোক সুবিধা বঞ্চিত এবং অবহেলিতদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে। আদিবাসীরা সবাই উন্নয়নের পক্ষে। তবে, উন্নয়ন হোক সংখ্যালঘু আদিবাসীদের অস্তিত্ব বান্ধব এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ বান্ধব। আদিবাসীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন সকল প্রকার উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড প্রণয়ন, গ্রহন এবং বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। অস্তিত্বহীন উন্নয়নের চেয়ে উন্নয়নহীন অস্তিত্ব ভালো- কারণ, তাতে সভ্যতা বির্বতন হয়ে বিকশিত না হলেও, অস্তিত্বও বিলুপ্ত হবেনা।
……………………………….
লেলুং খুমী, লেখক একজন উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য