কল্পনা চাকমা অপহরণের ২৩ বছর: ন্যায় বিচারের দাবি

কল্পনা চাকমা অপহরণের ২৩ বছর: ন্যায় বিচারের দাবি

আজ ১২ জুন ২০১৯, বুধবার, সকাল ১০.৩০ টায় কল্পনা চাকমা অপহরণ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে ধানমন্ডির ২৭ এ অবস্থিত উইমেন্স’স ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউভিএ) মিলনায়তনে ‘কল্পনা চাকমা অপহরণের ২৩ বছর: ন্যায় বিচারের দাবিতে ও মামলার বর্তমান প্রেক্ষিত’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য লুৎফুননেছা খান এমপি, বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী খুশী কবীর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাখি দাশ পুরকায়স্থ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, লেখক ও সাংবাদিক বিপ্লব রহমান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্য দীপায়ন খীসা, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা ও সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সহ সাধারণ সম্পাদক জুয়েল হাউই। হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মনিরা ত্রিপুরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সঞ্চালনা ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুণী ত্রিপুরা। এছাড়া বিভিন্ন অধিকার কর্মী, সাংবাদিক, নারী সংগঠনের প্রতিনিধি ও আদিবাসী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনায় সুলতানা কামাল বলেন দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রে সমান অধিকার, সমান মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। কিন্তু কল্পনা চাকমা অপহরণের মাধ্যমে দেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে আমরা তার মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছি। তিনি আরো বলেন কল্পনা চাকমাকে উধাও করে দেয়ার মাধ্যমে একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে উধাও করছি এ দেশ থেকে। সে সব জনগোষ্ঠীর মনোবল সাহস ও সংগ্রামী চেতনাকে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয় বলে সুলতানা কামাল মনে করেন। তিনি আরো বলেন কল্পনা চাকমা আমাদের নারী আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে রয়েছে। এ দেশ অনুন্নত ধাপ পেরিয়ে উন্নয়নশীল ধাপে রুপান্তরিত হচ্ছে কিন্তু আমরা আজো সভ্য হয়ে উঠতে পারিনি।

লুৎফুননেছা খান এমপি বলেন কল্পনা চাকমা একজন প্রতিবাদী সংগ্রামী ছিলেন। তিনি শুধু নারীদের জন্য সংগ্রাম করেননি তিনি নারী পুরুষ সবার জন্য সংগ্রাম করেছেন। নারীরা ভাষাগত, লিঙ্গগত পার্থক্যের কারণে তারা আরো বেশি অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। তিনি ১৯৯৭ সালের সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি করেন এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আদিবাসীদের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
খুশী কবির বলেন, বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও রাষ্ট্রে অমুসলমানদের জায়গা খুবই নিচু পর্যায়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী অদিবাসীরা ক্রমাগত সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে। সেখানে সেটেলারদেরকে সেনাবাহিনীরা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। কল্পনা চাকমাকে নিয়ে রাষ্ট্র সব সময় হাস্যকর রিপোর্ট দিয়ে এসেছে। এ হাস্যকর রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলার সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া সঠিক বিচারের অন্তরায়। অপহরণের সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান।

রাখী দাশ পুরকায়স্থ বলেন, কল্পনা চাকমা পাহাড়ী জাতির সংগ্রামের প্রতীক। আগামীতে যে শুনানী হবে সেটিও আবার কালক্ষেপন হবে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যতদিন বাস্তবায়িত হবে না ততদিন পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তিনি আরো বলেন রাষ্ট্র কল্পনা চাকমার বিচার ব্যবস্থাকে সব সময় ধামাচাপা দিয়ে আসছে। রাষ্ট্র তার দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে আজকে কল্পনা চাকমাসহ তনু হত্যার সুষ্ঠু বিচার আজো হয়নি। কল্পনা চাকমা পাহাড়ের প্রতিবাদী নারীদের মধ্যে অন্যতম কন্ঠস্বর। তিনি আরো বলেন কল্পনা চাকমার অপহরণের দায় রাষ্ট্র কখনো অস্বীকার করতে পারে না।

আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ২৩ বছর পেরিয়ে গেলো তদন্ত প্রকাশ করতে না পারা ও প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জার । তিনি আরো বলেন একটি স্বাধীন দেশে কল্পনা চাকমা নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রের জন্য চরম ব্যর্থতা। এছাড়া কল্পনা চাকমার অপহরণের সাথে যাদের নামে অভিযোগ আছে তাদের খুঁজে বের করে এবং কল্পনা চাকমার প্রকৃত সন্ধান করার জন্য তিনি সাংবাদিকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
দীপায়ন খীসা বলেন, সরকার আদিবাসীদের সাথে প্রতারনা করেছে। তিনি বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণের সাথে জড়িত এবং মামলার এজাহারভুক্ত আসামীরা গ্রেপ্তার হননি। কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনায় সেনাসদস্যরা জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও রাষ্ট্র তা অস্বীকার করছে। এছাড়া বিচারের জন্য শুধু বিলাপ নয়, ক্ষোভ নয়, দ্রোহে রূপান্তর করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাংবাদিক বিপ্লব রহমান বলেন, কল্পনা চাকমা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম একে অপরের পতিশব্দ। তিনি আরো বলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন ঘটনার প্রতিবাদ করলে ঘুম ও হত্যার শিকার হতে হয়। রাষ্ট্র ২৩ বছর ধরে কল্পনা চাকমাকে খুঁজে পাচ্ছে এটা রাষ্ট্রের প্রহসন মাত্র। তিনি কল্পনা চাকমার সুঠু বিচারের জন্য আন্দেলন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।

চঞ্চনা চাকমা বলেন সমতল ও পাহড়ী আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কন্ঠরুদ্ধ করে কাউকে আধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না বলে তিনি মনে করেন।

সভায় আয়োজকদের পক্ষ থেকে কতিপয় দাবিনামা তুলে ধরা হয়।

দাবিনামাসমূহ নিম্নরূপ:
* অবিলম্বে কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা এবং দোষীদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা।
* অভিযুক্ত কল্পনা অপহরণকারীদের এবং রূপন, সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমার হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
* আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
* পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য