রাজধানীতে বন আইন ও বনবাসী মানুষের অধিকার শীর্ষক আলোচনা

রাজধানীতে বন আইন ও বনবাসী মানুষের অধিকার শীর্ষক আলোচনা

অমর শান্তি চাকমা: অদ্য ২৬ জুন ২০১৯ এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভলপমেনন্ট (এএলআরডি) কর্তৃক রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে “বন আইন, বিধিমালা ও বনবাসী মানুষের অধিকার” শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদার সঞ্চালনায় এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি মোঃ নিজামুল হকের সভাপতিত্বে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাকমা সার্কেলের চীপ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং,বেলা’র নির্বাহী পরিচালক রেজোয়ান হাসান, এএলআরডির সদস্য রওশন জাহান মনি প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে চাকমা সার্কেলের চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় ব্রিটিশ আমল, পাকিস্থান আমল এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের পরবর্তী সময়ের বন আইন, নীতিমালা-বিধিমালা সম্পর্কে আলোচনা করেন। এ ব্যাপারে তিনি জাতীয় বন নীতি ১৮৯৪, ১৯৫৫, ১৯৬২, ১৯৭৯ এবং ১৯৯৪ সালের আইনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রতিনিয়ত আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে ইকো পার্ক, ন্যাশনাল পার্ক করে রিজার্ভ ফরেস্টের নামে আদিবাসী ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। বন আইন অনুযায়ী রিজার্ভ ফরেস্ট করতে হলে স্থানীয় মানুষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না।তিনি বলেন, ২০১৬ সালে খচড়া বন নীতি [ঘ,৩] এর “বন এবং বনের আশেপাশে বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বন সংক্রান্ত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কর্তৃক বন, বন্য প্রাণী এবং জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত উদ্যোগসমূহ উৎসাহিত করা হবে”অনুযায়ীপার্বত্য চট্টগ্রামের কোন বন অধিগ্রহণ করতে গেলে অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, সার্কেল চীফ, হেডম্যান এবং কার্বারীদের সাথে আলোচনা করতে হবে । সামাজিক বনায়নের নামে, রিজার্ভ ফরেষ্টের নামে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে আদিবাসীদের চিরায়ত ভূমি অধিগ্রহণ বন্ধ করতে হবে বলেও তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্ববান জানান।

বিশিষ্ট সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, বনের মধ্যে ইকো পার্ক, ন্যাশনাল পার্ক, বসতবাড়ি, কলকারখানা নির্মাণ হচ্ছে যার ফলে প্রাকৃতিক বনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তিনি বলেন, বন প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠে। এই প্রাকৃতিক বন রক্ষা করতে হলে বনবাসী মানুষের কাছে বনকে হস্তান্তর করতে হবে। বনবাসী মানুষরা বুঝে কিভাবে বনকে রক্ষা করতে হয়। বনখেকো, ভূমিখেকো দস্যুদের কাছ থেকে বন-মাটিকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

রেজোয়ানা হাসান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বনভূমিকে ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হচ্ছে। গাজীপুর, মহেশখালীতে প্রাকৃতিক বন উজাড় করে বিদ্যুৎ প্রকল্প করা হচ্ছে। মূলত বন বিভাগে অদক্ষ, অস্বচ্ছ ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মীদের কারণে বন বিভাগ দেশের বনকে রক্ষা করতে পারছে না।

আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ইকো পার্ক, ট্যুরিজমের নামে প্রাকৃতিক বনকে ধ্বংস করে কৃত্রিমতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর পেছনে মানুষ নয় বরং মুনাফার আকাঙ্খাই দায়ী। তিনি বলেন, বনকে রক্ষা করতে হলে বন এবং বনবাসী মানুষের সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। কারণ বনকে বনবাসী মানুষ আদিবাসী মানুষ বেঁচে থাকার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, বন-ভূমি বেদখলদারদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার না হওয়ার কারণে দিনকে দিন আরো বেশী পরিমাণ প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হচ্ছে। বন বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের প্রাকৃতিক বন রক্ষা করা যাবে। এক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে সকলকে বন সংরক্ষণ আন্দোলনে এক যোগে কাজ করে যেতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে বিশিষ্ট আইনজীবি বলেন, বন ও আদিবাসী জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক বনের ধ্বংস করা মানে আদিবাসী জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা। সিডর, আয়লা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের সাধারণ মানুষ প্রকটভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তাই বনখেকো না হয়ে বনের বন্ধু হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানিয়ে আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য