সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬৪ বছর: আজিম হায়দার

সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬৪ বছর: আজিম হায়দার

আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সাঁওতাল হুল এক অনন্য সংগ্রাম গাঁথা। সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল ১৮৫৫ সালে ৩০ জুন। ১৮৫৫-১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ ভারতের কৃষক-বিদ্রোহের ইতিহাসে অতুলনীয়। কেবলমাত্র ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের সাথে এর আংশিক তুলনা করা চলে। যে প্রকারের শাসন ও শোষণ-উৎপীড়ন পরাধীন জাতির স্বাধীনতা-সংগ্রামের সৃষ্টি হয়, ১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দের সাঁওতাল উপজাতির বিদ্রোহ বা স্বাধীনতা-সংগ্রাম এবং ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম ঐকবদ্ধ স্বাধীনতা-সংগ্রাম সেই প্রকারের শাসন ও শোষন-উৎপীড়নেরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। সাঁওতাল পরগনার সাহেবগঞ্জ জেলার বেরহাইত অঞ্চল থেকে এ বিদ্রোহের দাবানল জ্বলে উঠেছিল ভোগনাডিহি গ্রামের প্রধান সিধু মুরমু ও কানু মুরমুর নেতৃত্বে এবং ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র সাঁওতাল পরগনায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের দেশীয় দালাল, জমিদার, মহাজনদের শোষণ বঞ্চনা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের প্রতিবাদে। ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশ সরকার. জমিদার ও মহাজন শ্রেণীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল সাঁওতালরা। অনেক কষ্ট ও পরিশ্রম করে দামিন-ই-কোহ নামে যে জনপদ তারা গড়ে তুলেছিল, সে জনপদ একদিন আর তাদের নিজস্ব থাকলো না। সে জীবনে ঢুকে গিয়েছিল ইংরেজ দারোগা, মহাজন ও লোভী ব্যবসায়ী শ্রেণী। এই মুনাফাভোগী ব্যবসায়ী শ্রেণী সাঁওতাল পরগনা থেকে বিপুল পরিমাণ ধান, সরিষা ও বিভিন্ন প্রকারের তৈলবীজ গরুর গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে প্রথমে মুর্শিদাবাদে ও পরে কোলকাতায় চালান দিতো। সেখান থেকে এসব দ্রব্য সামগ্রী ইংল্যান্ডে রফতানি করা হতো। এ সব দ্রব্য সামগ্রীর জন্য ব্যবসায়ীগণ সাঁওতালদের সামান্য পরিমাণ লবণ, অর্থ, তামাক অথবা কাপড় চোপড় দিতো। এভাবে মহাজন ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর শোষণ ক্রমান্বয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। সাঁওতালদের অভাবের সময়ে কিছু অর্থ বা দ্রব্য সামগ্রী প্রদান করেই মাহজন শ্রেণী সাঁওতালদের সমস্ত জীবনের জন্যে ভাগ্য বিধাতা ও দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসতো। মহাজনেরা সাঁওতালদের মধ্যে ঋণের কারবার চালু করেছিল। এ ঋণের সুদের কোন নির্দিষ্ট হার ছিল না। একজন সাঁওতালকে তার ঋণের জন্য তার জমির ফসল, লাঙ্গলের বলদ, এমনকি নিজেকে এবং তার পরিবারকেও হারাতে হতো। আর সেই ঋণের দশগুণ পরিশোধ করলেও তার ঋণের বোঝা পূর্বে যে রূপ ছিল পরেও সে রূপ থাকতো। সংক্ষেপে বলা যায়, পাহাড় অঞ্চলে বহিরাগত ব্যবসায়ীদের আগমনের ফলে সাঁওতালদের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। তাছাড়া মহাজনদের দেয়া ঋণের অর্থ পরিশোধ করার সামর্থও অধিকাংশ সাঁওতালদেরই ছিল না। কোন সাঁওতালের ঘরে মৃত্যু হলে মৃতদেহের সৎকারের জন্য সেই সাঁওতালকে মহাজন শ্রেণীর নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হতো। কিন্তু ঋণের জামিন দেবার মতো জমি বা ফসল না থাকায় সেই সাঁওতালকে লিখে দিতে বাধ্য করা হতো যে, ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত সে ও তার স্ত্রী পুত্র পরিবার মহাজনের দাস হয়ে থাকবে। এর ফলে ঋণ গ্রহণের পরদিনই সাঁওতালকে সপরিবার মহাজনের বাড়িতে দাসত্ব করতে যেতে হতো। এ জীবনে তার ঋণ আর কোনদিনই শোধ হতো না। মৃত্যুর সময় সাঁওতালটি তার বংশধরদের জন্য রেখে যেতো বিশাল ঋণের বোঝা। যদি কোন ক্রীতদাস সাঁওতাল কখনো তার প্রভুর জন্য সারাজীবন কাজ করতে অস্বীকার করতো, তবে মহাজন তার আহার বন্ধ করে দিতো এবং জেলের ভয় দেখিয়ে তাকে বশে আনতো। যে মুহুর্তে কোন সাঁওতাল জমিদার বা মহাজনের নিকট হতে ঋণ গ্রহণ করতো, সে মুহুর্ত হতেই সে হতভাগ্য সাঁওতাল জমিদার মহাজনের শোষণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সমস্ত বৎসর সাঁওতাল পরিশ্রম করুক না কেন, জমিদার বা মহাজন তার সমস্ত ফসলই নিজেদের গোলায় তুলতো।

অবশেষে অসহনীয় অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সাঁওতাল সমাজ বিদ্রোহ করে। (প্রথমত) আদিবাসীদের সাথে ব্যবসা চালাতে গিয়ে মহাজনদের লোভ ও লুণ্ঠনের প্রবৃত্তি, (দ্বিতীয়ত) ঋণের জন্য ব্যক্তিগত ও বংশগত দাসত্বের বর্বর প্রথাজনিত ক্রমবর্ধমান দুর্দশা ও দুর্গতি, (তৃতীয়ত) পুলিশের সীমাহীন দুর্নীতি ও উৎপীড়ন এবং পুলিশ কর্তৃক মহাজনদের দুষ্কর্মে সহায়তা, (চতুর্থত) আদালতে সুবিচার লাভ সাঁওতালদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

বিদ্রোহের সূচনাঃ ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সিদু, কানুর এবং তাদের অপর দুই ভাই চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে প্রায় ভাগনাদিহিতে ৪ শত গ্রামের ১০ হাজার সাঁওতাল প্রতিনিধি এক জনসভায় উপস্থিত হয়। সিদু ও কানু এ সভায় বক্তৃতা করে। সাঁওতাল অর্থনৈতিক অধিকার ও স্ব-শাসনের দাবীতে গড়ে তোলেন গণআন্দোলন। তারা একে একে সাঁওতালী জীবনের দুঃখের কাহিনী, মহাজন শ্রেণীর উৎপীড়ন, পুলিশদের অন্যায় অবিচারের কাহিনী জনতার সামনে প্রকাশ করে। স্ত্রী পুত্র কন্যা পরিবার পরিজনদের ওপর অত্যাচার ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সমস্ত সাঁওতাল সমাজ গর্জে ওঠে। শোষণহীন স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য সকলেই শপথ বাক্য পাঠ করে। বিদ্রোহের নেতা সিদু মুরমুর নির্দেশে ইংরেজ সরকার, জমিদার, ম্যাজিস্ট্রেট ও থানার দারোগাদের নিকট চরমপত্র প্রেরণ করা হয়। দারোগা ও জমিদারদের নিকট থেকে ১৫ দিনের মধ্যে চরমপত্রের জবাব দাবী করা হয়।

১৮৪৮ সালের দিকে মহাজনদের জ্বালায় বেশ কয়েকটি গ্রামের সাঁওতাল পরিবার দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। জমিদার মহাজনের অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। ওজনে ঠকানো, জমি থেকে উৎখাত, এমনকি তাদের উৎপাদিত ফসল পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হত। কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হতো। কেউ দিতে অস্বীকার করলে মারধর করা হতো। আবার ঋণ আদায়ের নামে গ্রামে এসে তাদের খেয়াল খুশিমতো ঘরে ঢুকে এবং মুরগি, ছাগল যা পায় জোর করে ধরে নিয়ে যেত। মিথ্যা চুরি ও ডাকাতির অভিযোগ এনে থানায় মামলা দায়ের করে। এর প্রতিকার চাইতে গেলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কোন ফল হয় না। এ অবস্থা দেখে এগিয়ে এলেন চার ভাই সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব। সাঁওতালদের অবস্থা কিভাবে উন্নত করা যায়, কিভাবে অন্যায়-অত্যাচার ও মহাজনীর কবল থেকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে লাগল। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর তারা স্থির করলেন যে, সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সাঁওতালদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না এবং সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রয়োজন। আর এ কর্মকান্ডে এলাকার মেহনতি জনতাকে শামিল করতে না পারলে তাদের বিদ্রোহ আশানুরূপ হবে না। সাঁওতাল আদিবাসীসহ মুক্তিকামী জনতার মধ্যে প্রেরণা সঞ্চারের জন্য সিধু, কানু ঘোষণা করলেন, ঠাকুরের আশীবাদ নিয়ে তারা অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে যাচ্ছেন। তাদের বিদ্রোহে শামিল হওয়ার আহবান জানিয়ে ১৮৫৫ সালে গোড়ার দিকে তারা একটি পরোয়ানা প্রচার করলেন। দারোগা মহাজনদের পক্ষ নিয়ে তাদের ধরতে সিধু, কানুর কাছে যখন সাঁওতালরা শুনল তাদের শোষকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলেছেন তখন তারা আর বসে থাকতে পারল না। তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত হলো বিদ্রোহের জন্য, যাই হোক সিধু-কানুর পরোয়ানা পাওয়ার পর সাঁওতালসহ মুক্তিকামী জনতার মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। কর্ম-পদ্ধতি ঠিক করার জন্য বেশকিছু সাঁওতাল যুবক ভগনাডিহি গ্রামে মিলিত হলো। আলাপ-আলোচনার সময় থানা থেকে এক সিপাহী হালচাল বোঝার জন্য সেখানে এসে উপস্থিত হলে সমবেত জনতা তার হাতে একটি পরোয়ানা ধরিয়ে দিয়ে সেটি দারোগা বাবুকে দিতে বলেন। সেটা দেখে সিপাহী রেগে স্থান ত্যাগ করে। যুবকরা সেই সমাবেশে ঠিক করে পরের দিন সবাই শিকারে বের হবে। পরদিন সকালে সিধু-কানুর নেতৃত্বে ৪০/৫০ জন সাঁওতাল যুবক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শিকারে যাওয়ার পথে দারোগা মহেশ দত্ত, দুইজন সিপাহী ও কয়েকজন মহাজনে ওপর পাকড়াও করে। দারোগার সাথে ছিল দুটি দড়ি বোঝাই গাড়ি। যুবকরা দড়ি বোঝাই গাড়ি দেখে বুঝতে পারে যে, দারোগা মহাজনদের পক্ষ নিয়ে তাদের ধরতে এসেছে। এ কথা দারোগাকে বললে উত্তাপের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় তাদের মাঝে তর্কযুদ্ধ। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলেই সিধু দারোগা মহেশ ও কানু মানিকরাম মহাজনকে হত্যা করে। সেখানে বেশ কয়েকজন বরকন্দাজও নিহত হয়। ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল সাঁওতালরা। নীলকর, মহাজন, নায়েব প্রভৃতি অত্যাচারীরা হলো তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।

সরকারের পদক্ষেপঃ এই বিদ্রোহের খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার জন্য সরকার সৈন্য তলব করতে বাধ্য হলো। ১৮৫৫ সালের জুলাই থেকে সেনাবাহিনী বিদ্রোহ দমনের কাজে নেমে যায়। ১৮৫৫-এর ১৫ জুলাই মুর্শিদাবাদের ম্যাজিস্ট্রেট হাতি ও ২০০ সিপাহি নিয়ে মহেশপুর অভিযান চালান। একদিকে তীর-ধনুক-টাঙ্গী আর একদিকে কামান-বন্দুক। তবু সাঁওতালরা পিছপা হলো না। লাল পোশাক পরে কানু রণাঙ্গনে আবির্ভূত হলেন। সাঁওতালদের উজ্জীবিত করার জন্য তলোয়ার হাতে তিনি শুরু করলেন রণনৃত্য। প্রায় আড়াই ঘন্টা সামনে সামনে যুদ্ধ চলল। এই যুদ্ধে প্রায় ১০০ জন সাঁওতাল প্রাণ হারায় এবং আহত হয় অনেক। তবু তারা যুদ্ধ করে চলল। এমন সময় হঠাৎ একটি গুলি এসে সিধুর ডান হাতের কবজিতে লাগল। ভৈরবও পেটে আঘাত পেল। এঅবস্থা দেখে বিদ্রোহীরা যুদ্ধ থামিয়ে দিল। আহত সিধুকে মহেশপুর থেকে ভাগনাডিহি গ্রামে নিয়ে গেল। ভগনাডিহিতে বিদ্রোহীরা আছে জেনে মুর্শিদাবাদের ম্যাজিস্ট্রেট বিদ্রোহীদের দিকে রওয়ানা দিলেন। তাদের আসার খবর শুনে সাঁওতালরা তাদের মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হলো। সিধু আহত, কাজেই যুদ্ধ পরিচালনার সমস্ত দায়দায়িত্ব এবার এসে পড়লো কানুর ওপর; কিন্তু তিনিও পারলেন না, তাদের প্রতিরোধ করতে। কানুর পরাজয়ের সংবাদ ভগনাডিহিতে পৌছালে সিধু তার অনুগামীদের নিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন। এর কয়েকদিনের মধ্যে সেনাবাহিনী ভগনাডিহি গ্রামটি ধ্বংস করে দেয়। সিধু-কানুর বাড়িও আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় সাঁওতাল গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনীদের অত্যাচার ও জুলুম, হাজার হাজার সাঁওতাল গ্রাম আগুনে জালিয়ে দেয়া হয়। আাবার আগুন লাগিয়ে দেয়। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে ১৮৫৫ সালের ১৭ আগষ্ট বিদ্রোহীদের কাছে আত্মসমর্পণের আহবান জানানো হলো।
সাঁওতালদের ভাগ্যে যা ঘটেছিলঃ সাঁওতাল বিদ্রোহীরা ঘৃণার সঙ্গে সরকারের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল; কিন্তু কয়েকজন সাঁওতালের বিশ্বাসঘাতকতায় সিধু সেনাবাহিনীদের হাতে ধরা পরল। এরপর কানু সঙ্গীদের নিয়ে হাজারীবাগ অভিমুখে পালানোর সময় জারোয়ার সিং নামক এক ব্যক্তির তৎপরতায় ১৮৫৫ সালের ৩০ নভেম্বর কানুও ধরা পড়েরন। এরপর সিধু এবং কানুর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ, লুণ্ঠন, অত্যাচার ও মানিকরাম মহাজনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। ১৮৫৬ সালের ১৪-১৬ জানুয়ারী স্পেশাল কমিশনার এলিয়েটের এজলাসে বিচার হয়। বিচারে যা প্রত্যাশিত ফল তাই হলো লেফটেন্যান্ট হ্যালিডের আদেশে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার জন্য কড়া পাহারায় কানুকে ভগনাডিহি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সিধু-কানু যে ঠাকুরবাড়ি থেকে বিদ্রোহের প্রথম সূচনা সেখানেই ফাঁসির মঞ্চ তৈরী করা হয়। ১৮৫৬ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারী কানুকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার দৃঢ়তা ও মানসিকতা প্রশান্তি অক্ষুন্ন ছিল। দীর্ঘ ৪৫ মিনিট তার দেহটি ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে রাখার পর সেটিকে নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। আদিবাসীদের সমাজে অশুভ শোষক শ্রেণীর সঙ্গে আপসহীন লড়াইয়ে সাঁওতাল বিদ্রোহের আদর্শ আজও অম্লান হয়ে আছে। আদিবাসীদের মূল লক্ষ্য ছিল এদেশ থেকে শোষক শ্রেণীকে উৎখাত করে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। বিভিন্ন সময়ে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তারা তাদের জীবন দিয়ে হলেও মাতৃভূমিকে শোষক মুক্ত করবে।

বৎসরাধিককাল অপ্রতিহত গতিতে চলবার পর ভারতবর্ষ আলোড়নকারী সাঁওতাল-বিদ্রোহের অবসান ঘটে। চল্লিশ বৎসরব্যাপী ওয়াহাবী বিদ্রোহ ও ১৮৫৭-৫৮ খৃীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পরেই সাঁওতাল বিদ্রোহের স্থান। এই বিদ্রোহ সমগ্র ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসনের ভিত্তিমূল পর্যন্ত কাঁপাইয়া দিয়াছিল এবং ইহা ছিল বারতের যুগান্তকারী মহাবিদ্রোহের অগ্রদ্রুত স্বরূপ। সহস্র সহস্র সাঁওতাল অজস্র ধারায় বুকের রক্ত ঢালিয়া ভারত-বর্ষের কৃষকের সমগ্র জনসাধারণের এক নুতন মহাশত্রুর দিকে সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল। প্রধানত ইহাদের বিরুদ্ধেই দেখা দিয়াছিল ১৮৭৫-৭৬ খ্রীষ্টাব্দের দাক্ষিণাত্য বিদ্রোহ। সাঁওতাল-বিদ্রোহ ঊনবিংশ শতাব্দী ও বর্তমান বিংশ শতাব্দীর কৃষকের মহাজন-বিরোধী সংগ্রামের সূচনা করিয়া গিয়াছে।
সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফলঃ অবিচলিত নিষ্ঠা ও মৃত্যুভয়হীন শৌর্ষবীর্য সত্ত্বেও সেদিনের সাঁওতাল-বিদ্রোহের ভবিষ্যৎ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। ভারতের অন্যান্য অঞ্চল তখনও শান্ত, নিস্তরঙ্গ। সুতরাং ইংরেজ মাসকশক্তি উহার ভারতব্যাপী বিশাল সাম্রাজ্যের বিপুল সামরিক শক্তি সংহত করিয়া এই আঞ্চলিক বিদ্রোহকে দমন করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও ত্রিশ হইতে পঞ্চাশ সহস্র সাঁওতাল বীর ধনুক-বাঙ্গি-তরবারি মাত্র সম্বল করে এবং সকল সম্প্রদায়ের নিপীড়িত মানুষের সমর্থনের উপর নির্ভর করিয়া কামান-বন্দুকে সজ্জিত পনের সহস্রাধিক সুশিক্ষিত সৈন্যের সহিত দীর্ঘকাল যুদ্ধ করে সমগ্র ভারতের জনগণের সম্মুখে যে পথনির্দেশ করেছে, সে পথ ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের মধ্য দিয়া ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সুপ্রশস্ত রাজপথে পরিণত ইয়েছে। সেই রাজপথ বিংশ শতাব্দীর মধ্য দিয়া প্রসারিত। ভারতবর্ষের কৃষক সেই রাজপথেরই অভিযাত্রী।
একথা সত্য যে, বিপুল খাজনা ও করভার লাঘবের জন্য, যে শোষণ-উৎপীড়নের অবসানের জন্য যে, আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য সমগ্র সাঁওতাল উপজাতি বিদ্রোহের পথে পদক্ষেপ করিয়াছিল, তাহা পূর্ণ হয় নাই। কিন্তু শক্তিপরীক্ষায় পরাজিত হইলেও তাহারা আত্মসমপূর্ণ করে নাই, তাহাদের উন্নত মস্তক উন্নতই রহিয়াছে। তাই দেখিতে পাই, সাঁওতাল বিদ্রোহের আগুন আবার জ্বলিয়া উঠিয়াছিল ১৮৭১ এবং ১৮৮০-৮১ খ্রীষ্টাব্দে। ১৮৮০-৮১ খ্রীষ্টাব্দের বিদ্রোহ প্রথমবারের মতই ভীষণ আকার ধারণ করিলে ইংরেজ সেনাপতি টমাস্ গর্ডনের নেতৃত্বে বহু কামানসহ পাঁচ সহস্রাধিক সৈন্য এই অঞ্চলে উপস্থিত হয়। ইহারা সাঁওতাল পরগনা বেষ্টন করিয়া এবং বহু নেতৃস্থানীয় সাঁওতালকে হত্যা ও গ্রেফতার করিয়া সেই বিদ্রোহকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করিতে পারিয়াছিল। কিন্তু তথাপি এই সকল বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় নাই। সাঁওতাল-বিদ্রোহের মাদল-ধ্বনি যুগে যুগে প্রতিধ্বনিত হয়ে বঙ্গদেশের, বিহার প্রদেশের, সমগ্র ভারতবর্ষের কৃষক-শক্তিকে জাগ্রহত করিয়াছে, আত্ম-প্রতিষ্ঠা পথ নির্দেশ করিয়াছে।

এই সকল বিদ্রোহের সামরিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও সাঁওতাল উপজাতির সেইদাবিসমূহ কোনদিন বিস্মৃত হয় নাই এবং পরবর্তী কালে তাদের সংগ্রামের রূপের পরিবর্তন ঘটলেও তাদের সেই সংগ্রাম কোনদিন পরিত্যক্ত হয় নাই। স্বাধীন ভারতের কংগ্রেসী শাসনেও তাহাদের সেই সকল দাবি অপূর্ণই রয়েছে। আজও তাদের জমির দাবি, জমিদার-মহাজনগোষ্ঠীর শোষণ-উৎপীড়ন হইতে বাঁচিবার দাবি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূর্ণ হয় নাই। উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতি লাভের ফলে সাঁওতালদের জমি হস্তান্তরের যে সামান্য আইনগত বাধা আছে তা কার্যকরী করবার জন্য ইংরেজ শাসনকালের মত এখনও কোন বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয় নাই। সাঁওতালদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও পূর্বের মতই আজো সূদূরপরাহত।

কিন্তু এই সকল দাবী এখন আর কেবল সাঁওতালদের একার দাবী নহে, এখন এই সকল দাবী ভারতের সকল উপজাতীয় কৃষকের- ভারতের সমগ্র কৃষক সম্প্রদায়ের সাধারণ দাবী। তাই এই সকল দাবী পুরূণের সংগ্রামও হবে সমগ্র ভারতবর্ষের কৃষক জনসাধারণের মিলিত সংগ্রাম। ১৮৫৫-৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ঐতিহাসিক সাঁওতাল-বিদ্রোহ বর্তমানকালের সেই সংগ্রামেরই সূচনা করে গিয়াছে।

সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং এর প্রভাবঃ আদিবাসীদের দীর্ঘকালের আন্দোলন, ঝাড়খন্ড আন্দোলন ও আত্মত্যাগ ভারত সরকারকে তাদের কয়েকটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। যেমন-
এক. আদিবাসীদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে পিছিয়ে পড়া দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে প্রকৃত গবেষণা ও ব্যাখ্যা দ্বারা তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে পুন:স্থাপিত করতে বাধ্য করেছে।
দুই. ট্রাইবাল এজেন্ডাকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত করা হয়েছে।
তিন. এই আন্দোলন জাতিসত্ত্বার প্রশ্নে আদিবাসীদের নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে।
চার. এই আন্দোলনের ফলে ১৯৪৭, ১৯৫১, ১৯৫৭ সালের স্থানীয় নির্বাচনে ভারতের জয়পাল সিং মুন্ডার নেতৃত্বাধীন ঝাড়খন্ড পার্টির কাছে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়। কিন্তু ১৯৬১ সালের নির্বাচনে ঝাড়খন্ড পার্টি কংগ্রেসের সঙ্গে মার্জ করে। স্থানীয়দের ধারণা জয়পাল সিং কংগ্রেসের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেন। ফলে ঝাড়খন্ড আন্দোলন এক বিরাট ধাক্কা খায়।
পাঁচ. ঝাড়খন্ড আন্দোলনের ফলে আদিবাসীদের ভাষা স্বীকৃতি পায়। ভারতের একমাত্র রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাইবাল রিজিওনাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিপাটমেন্ট প্রতিষ্ঠা হয়। এই বিভাগে নয়টি ট্রাইবাল ভাষায় পোস্ট গ্রাজুয়েট লেভেলে পড়ানো হয়।
……………………………….
মির্জা মোঃ আজিম হায়দার, উন্নয়ন কর্মী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য