ঐক্যবদ্ধ শক্তি জুম্মজাতির মুক্তিঃ বাচ্চু চাকমা

ঐক্যবদ্ধ শক্তি জুম্মজাতির মুক্তিঃ বাচ্চু চাকমা

আমি পার্বত্যাঞ্চলে তথাকথিত ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত প্রসঙ্গ ও লারমা দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে লড়াই সংগ্রাম” নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। আমার এই প্রবন্ধটি গত ১৭ জুন ২০০৯ ইং তারিখে প্রথমে আইপিনিউজবিডি.কম অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আইপিনিউজবিডি.কম অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর জুম্মনিউজ.বল্কস্পোট.কম এবং ম্রো. ইনডিজেনাস.বল্কস্পোট.কম আরও অনেক অনলাইন পত্রিকাসহ ফেইসবুকের নিজস্ব ওয়ালে প্রকাশিত হয়।

উক্ত অনলাইন পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত হবার পর আমার এই প্রবন্ধের ওপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কতিপয় ব্যক্তি অমার্জিত ও উগ্র ভাষায় সমালোচনা করেন, যা প্রকৃতপক্ষে সমালোচনা নয়- এগুলি প্রকৃতপক্ষে মনগড়া বক্তব্য উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করার অপপ্রয়াস মাত্র। সেসব ব্যক্তি সমালোচনার (সম-আলোচনা ও বস্তনিষ্ঠভাবে আলোচনার পরিবর্তে) পরিবর্তে কতগুলো অযৌক্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। সমালোচনার খাতিরে সমালোচনা করেছিলেন এবং বাস্তবতাকে অস্বীকার করেছিলেন। তারা বাস্তবতাকে এরিয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন। আবেগ প্রবণ হয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। রাজনীতি, সংগ্রাম আবেগের বিষয় নয়। ভাল লাগলো, আবেগ জাগলোভালবাসাবাসি হল। আবেগ যতদিন কাজ করলো ততদিন ভালবাসাবাসি হল, আবেগ শেষ হল তারপর বিচ্ছেদ ঘটলো। রাজনীতি, সংগ্রাম সেরকম কিছু নয়। এটি একটি জাতি বা জাতিসমূহের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। এটি একটি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত। মনে রাখতে হবে রাজনীতি-সংগ্রামে আবেগের কোন স্থান নেই।

এসব সমালোচকের মনগড়া ও অবাস্তব বক্তব্যের কারণে কারো কারো মনে নানা প্রশ্ন জাগতে পারে। বিষয়টি পরিস্কার করা প্রয়োজন বিধায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামের বাস্তব ইতিহাসের আলোকে আরো কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করা হলো।

সংগ্রামে শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমরা সবাই জানি- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা লাভের পর ১৯৭২ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছে। এই সংগ্রামের এক পর্যায়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জম্ম। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ জন্মলগ্ন থেকে জনসংহতি সমিতির সহযোগী সংগঠন হিসেবে কাজ করে আসছে। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পাঁচ দফা দাবীনামার প্রথম দাবীতে উল্লেখ ছিল- বাংলাদেশ সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যেকার সংলাপের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করা। ইউপিডিএফ এর সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসা ও রবি শংকর চাকমা এই পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জন্মলগ্ন থেকে যুক্ত। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রসিত বিকাশ খীসা ও রবি শংকর চাকমা জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার সাথে সমিতির গভীর জঙ্গলে স্থিত প্রধান কার্যলয়ে দেখা করতেন, পরামর্শ নিতেন। প্রসিত, প্রধীর, রবি শংকরসহ বেশ কয়েকজন সমিতির সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনীতে যোগদান করার কথা থাকলেও প্রসিত-রবি শংকররা যোগদান করেননি। তবে প্রধীর তালুকদার তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। তিনি যথাসময়ে শান্তি বাহিনীতে যোগদান করেন। সেকারণে প্রধীর তালুকদার পরবর্তীতে প্রসিত-রবিকে বিশ^াস ঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কারণ প্রসিত-রবি জনসংহতি সমিতির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখেননি। তারা একসাথে শান্তি বাহিনীতে যোগদান করবেন, প্রধীর তালুকদারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও তারা রক্ষা করেননি। নাটক এখানেই শেষ নয়, প্রসিত-রবি পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পাঁচ দফার সাথেও বিশ^াস ঘাতকতা করলেন। বিশ^াস ঘাতকতা করলেন জনগণের আশা-আকাঙ্খার সাথে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হলো। জুম্ম জনগণ এই চুক্তিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এর স্বীকৃতি মিললো। বিশে^র বিভিন্ন দেশ এই চুক্তিকে স্বাগত জানালো। সেসময়ে প্রসিত বিকাশ খীসা এর বিরোধিতা করলেন। দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি বিএনপি-জামাত এই চুক্তিকে সমর্থন জানায়নি। দেশের সাম্প্রদায়িক সামরিক-বেসামরিক আমলাদের অবস্থানও চুক্তির বিপক্ষে ছিল। চুক্তির সময় তারা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতে পারেননি। কারণ আইনের বাধাধরা নিয়ম ছিলো। আমলারা সরকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেতে পারেন না। তারা যে চুক্তির বিপক্ষে ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে উঠে, যখন চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হয়। আওয়ামী লীগ দলের মধ্যে যারা সাম্প্রদায়িক, তারাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চুক্তি বিরোধী ভূমিকা পালন করে। যার কারণে চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। এই চুক্তি ছিল- জুম্ম জনগণের অধিকার। এটি জুম্ম জাতিসমূহের অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকার ভিত্তিভূমি। এই চুক্তি ছিল- জুম্ম জনগণের স্বপ্ন। সে স্বপ্ন প্রসিত বিকাশ খীসা চুরমার করে দিয়েছিলেন। তিনি চুক্তি বিরোধিতা করলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিলেন, চুক্তি পক্ষের শক্তিকে আঘাত করলেন। এভাবে তিনি শাসকগোষ্ঠী ও দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতকে শক্তিশালী করলেন। প্রসিত বিকাশ খীসা ও তাঁর সংগঠন ইউপিডিএফ- এর কাজ এবং শাসকগোষ্ঠী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাজের মধ্যে কোন পার্থক্য রইলো না। সেকারণে প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াটা স্বাভাবিক যে- তিনি জুম্ম জনগণের পক্ষে না বিপক্ষে? তিনি জুম্ম জনগণের পক্ষে অবস্থান নিলেন, না শাসকগোষ্ঠী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিলেন? তিনি কার উপকার করলেন, কার ক্ষতি করলেন? এটি পরিস্কার যে, তিনি শাসকগোষ্ঠী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পক্ষেই অবস্থান নিয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন ও জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করলেন। প্রসিত বিকাশ খীসা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করলেন। তিনি রাজধানী ঢাকায় বসে তাঁর সশস্ত্র সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করলেন। এরপর সচেতন জুম্ম জনগণের মাঝে প্রশ্ন জাগলো- প্রসিত বিকাশ খীসা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম চালিয়ে সে দেশের রাজধানীতে কিভাবে বসবাস করা সম্ভব? এধরণের ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। পৃথিবীর যত দেশে সশস্ত্র সংগ্রাম হয়েছে সেই সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্বে যারা ছিলেন, তারা কখনো একই দেশের রাজধানীতে অবস্থান করতে পারেননি। তাহলে প্রসিত বি. খীসা কিভাবে রাজধানী ঢাকায় বসবাস করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন? প্রিয় পাঠক, আমি এবিষয়ে আর বক্তব্য বাড়াতে চাই না।

ইউপিডিএফ বিষয়ে আপনারা সবকিছু জানেন। এখন আপনারাই বিশ্লেষন করুন, পর্যালোচনা করুন। আমি যেসব কথা বলার চেষ্টা করেছি- এগুলো সব সত্য ঘটনা। এতে একটি শব্দও মিথ্যাশ্রিত নয়। আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ হিসেবে অতীতের ঘটনাবলীর বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। তবে আমি ইউপিডিএফ- এর ইদানীংকালের কার্যক্রমকে স্বাগত জানাই। আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই- ইউপিডিএফ পরবর্তীতে (চুক্তি সম্পাদনের ১৫ বছর পর) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে সমর্থন করেছেন এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিলেন। চুক্তিকে সমর্থন জানানোর পর ইউপিডিএিফ চুক্তি বাস্তবায়নে কোন ভূমিকা পালন না করলেও উভয় সংগঠনের মধ্যে হানাহানি বন্ধ হয়। এর ধারাবাহিকতায় ইউপিডিএফ ২০১৮ সালের নির্বাচনে জেএসএস প্রার্থীকে সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করে। ইউপিডিএফ- এর বর্তমান ভূমিকাকে অবশ্যই আমি ইতিবাচক বলে অভিহিত করবো। আমরা সকলে যদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিই তাহলে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগমও হতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেটাই প্রত্যাশা করি।

সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে জনসংহতি সমিতি সব সময় সংলাপের পথ খোলা রেখেছে। জনসংহতি সমিতি বিরোধ মিটিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে সব সময় সংলাপ চালিয়ে আসছে। সংলাপের পথ খোলা রেখেছে বলে এরশাদ সরকার, খালেদা জিয়া সরকার এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ধৈর্য্য ধারণ করে সংলাপ করার কারণে চুক্তিতে উপনীত হতে সম্ভব হয়েছিল। আমরা বিভিন্ন সংগঠনের সাথেও সংলাপের পথ খোলা রেখেছি- সমস্যা সমাধানের স্বার্থে।

সমস্যার সমাধান চায় বলে জনসংহতি সমিতি জাতীয় বেঈমান বিভেদপন্থী ক্ষমতালোভী গিরি প্রকাশ দেবেন পলাশ চক্রের সাথেও আলোচনার পথ খোলা রেখেছিল। কিন্তু এই চার কুচক্রীজনসংহতি সমিতির সাথে বিশ^াসঘাতকতা করে জুম্ম জনগণের প্রিয় নেতা এম এন লারমাকে হত্যা করে।জুম্ম জাতির মুক্তির স্বার্থে জাতীয় শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করা দরকার- এই শ্লোগান ও আহবান কেবল মাত্র আজকের নয়। জুম্ম জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করার স্লোগানও আজকের নয়। জুম্ম জনগণের প্রিয় নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও বর্তমান নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে এই স্লোগান প্রকম্পিত হয়ে আসছেপার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে কন্দরে। আজো এম এন লারমার ‘ক্ষমা করা, ভুলে যাওয়া’-এই নীতিকে সমুন্নত রেখে জনসংহতি সংহতি তার সংগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে জোরদার করার লক্ষ্যে জুম্ম জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করার জন্য বার বার আহবান জানিয়ে আসছেন।

জুম্ম সমাজের মধ্যেকার মতাদর্শগত সংগ্রাম, ভুল ও নির্ভুলের মধ্যেকার সংগ্রাম চলমান রেখেই পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমগ্র জুম্ম জনগণ ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির স্বপক্ষে দাঁড়িয়ে মুক্তির সংগ্রাম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ। বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে বা বাস্তবতার নিরিখেই যে নেতৃত্ব রাজনৈতিক কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারে সেই নেতৃত্বই একমাত্র আপোষহীন ও সংগ্রামী। এই বিশ্লেষনের আলোকে আমরা বলতে পারি এবং আমি মনে প্রাণে বিশ^াস করি- প্রয়াতনেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও বর্তমান নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে পরিচালিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিই পার্বত্যাঞ্চলের নিপীড়িত জুম্ম জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে নিরন্তর ও আপোষহীন লড়াই সংগ্রাম সঠিক পথে এগুচ্ছে। আমি আমার পূর্বের লেখাতে এই বাস্তব সত্যটাকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলাম। অথচ কতিপয় সমালোচক (তথাকথিত) আমার উপর সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও আত্মকেন্দ্রিক- এই তকমা চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে গেলেন। আমি ছাত্র জীবন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত এবং আমি প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ আজীবন নিপীড়িত নির্যাতিত জুম্ম জনগণের মুক্তির জন্য হাসি মুখে জীবন দেবো। পৃথিবীর কোন সংগ্রাম বৃথা যায়নি। সুতরাং সন্তু লারমার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতির সংগ্রাম কখনো বৃথা যেতে পারে না। জীবন দিয়ে রক্ত দিয়ে আমরা জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা করবোই। কে সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও আত্মকেন্দ্রিক তা সময় বলে দেবে।

এ কথা সবারি অজানার বিষয় নয় যে, অত্যাচারী শাসকেরা যুগে যুগে নিপীড়িত মানুষের উপর জোরপূর্বক শাসন-শোষন নীতি প্রয়োগ করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী সামরিক শাসন জারী রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের উপর শোষন-নির্যাতন ও জুলুমী শাসন কায়েম করে রেখেছে। অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা সকলের পবিত্র দায়িত্ব। শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষন বোঝার জন্য আমি ইতিহাসের আলোকে আলোচনার চেষ্টা করেছিলাম। আমি উল্লেখ করেছিলাম কখন হতে মানবসমাজে শোষক ও শোষিতের বিভাজন শুরু হয়েছিল এবং কেন হয়েছিল। আমি সেখান থেকে আমার প্রবন্ধটি শুরু করেছিলাম।আমি আমার প্রবন্ধে কাউকে হেয় করে কোন কিছুই বলার চেষ্টা করিনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আন্দোলনের বাস্তব সত্য ঘটনাবলীকে একসূত্রে গ্রথিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি মাত্র। যাইহোক প্রিয় পাঠক বন্ধুরা ইতিহাসের দিকে যখন আমরা ফিরে তাকাই তাহলে দেখবো যে, ভাল-মন্দ যেটাই হোক না কেন বস্তু জগৎ যেভাবে আছে ঠিক সেভাবেই ইতিহাসের পাতায় সেই বাস্তব চিত্রকেই তুলে ধরাটাই যুক্তিযুক্ত।
আমাদের অস্বীকার করার কোন জো নেই, পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীত ইতিহাস কোনদিনই সুখকর ছিল না। ব্রিটিশ আমলে হোক কিংবা পাকিস্তান আমল বা অধুনা বাংলাদেশ আমলই হোক না কেন, কোন সময়েই জুম্ম জনগণ ভাল অবস্থায় ছিল না। প্রতিনিয়ত শোষন-নির্যাতন, বঞ্চনা আর অবহেলায় কেটেছিল আমাদের সমগ্র জুম্ম জাতীয় জীবন। সেখান হতে শিক্ষা নিয়ে পশ্চাৎপদ, গুণেধরা জুম্ম সমাজকে জাগ্রত করে জুম্ম জনগণের স্বাধিকার অধিকারের জন্যে ৬০-৭০ দশকের শুরুতে আন্দোলনের শুভ সূচনা করেছিলেন প্রয়াতনেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ১৯৭২ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভাষাভাষি জুম্ম জাতির জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের সংগ্রামকে তীব্রতর করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রয়াতনেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের জোয়ার যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের খপ্পরে পড়ে ক্ষমতালোভী,সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও বিভেদপন্থী গিরি প্রকাশ দেবেন পলাশ চক্র জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত প্রিয় নেতা এম এন লারমাকে হত্যা করে। এই হত্যকান্ডের মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণ তাদের প্রিয় নেতাকে হারিয়ে জুম্ম জাতির এক অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হলো। এই হত্যাকান্ড জুম্ম জনগণের আন্দোলনে এক কলংকজনক অধ্যায় রচিত হলো।প্রিয় নেতা এম এন লারমা শহীদ হবার পর তাঁর ছোট ভাই সন্তু লারমা পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করে পার্টিকে সংগঠিত করে জুম্ম জনগণের সংগ্রাম জোরদার করতে সক্ষম হয়। যুগে যুগে সুবিধাবাদী জাতীয় বেঈমান যেভাবে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয় তেমনিভাবে জাতীয় বেঈমান ক্ষমতালোভী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্রও এক পর্যায়ে নি:শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে এবং আগামীতে যেসব সংগঠন ও গ্রুপ অর্থ লোভ ও ক্ষমতা লোভের বশবর্তী হয়ে শাসকগোষ্ঠীর নিকট দালালীপনার মধ্য দিয়ে জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছেঅবধারিতভাবে তারাও একদিন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে এবং জুম্ম জনগণ তাদের কখনো ক্ষমা করবে না।

এম এন লারমা শহীদ হবার পর সন্তু লারমার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতি যেহেতু ন্যায় ও সঠিক পথে ছিল, জনগণের সহযোগিতায় জনসংহতি সমিতির আবারো শক্তিশালী হয়ে উঠে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সরকার সংলাপের প্রস্তাব দেয়। সংলাপ যথারীতি শুরু হয়। এরশাদ সরকার, খালেদা জিয়া সরকার এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনা সরকার- এই তিনটি সরকারের সাথে ২৬টি সংলাপের পর ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির মধ্যেকার চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি অর্জনের জন্য দীর্ঘ দুই যুগের অধিক বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র লড়াই সংগ্রাম হয়েছিল পাহাড়ের বুকে। জুম্ম জাতির বীর সেনানীরা অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছিল। সেই বীর সেনানীদের সাহস ও শক্তি যুগিয়েছিল প্রত্যন্ত এলাকার খেটে-খাওয়া নিরন্ন মানুষ- যারা জুমচাষ করে, যারা বাগান বা জমি চাষ করে, যারা ক্ষেত খামারে কাজ করে, যারা গরীব মেহনতি মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা শত্রু বাহিনীর কবল থেকে অনেক বীর যোদ্ধার প্রাণ রক্ষা করেছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ সংকট অধিকতর ঘনীভূত হতে চলেছে। বর্তমান পরিস্থিতি ও বাস্তবতায় জুম্মজাতির বিরুদ্ধে সুবিধাবাদী শক্তি প্রচন্ডভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। তবে আশার দিক হল বর্তমানে নতুন করে ছাত্র তরুণদের মাঝে জুম্ম জাতীয় জাগরণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে বেশ গর্ব করার মতো বিপ্লবী উপাদান। এই সময়ে শাসকগোষ্ঠী ও তার লেলিয়ে দেয়া জুম্ম দালালদের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম জোরদার করার জন্য সংগ্রামী শক্তিকে একত্রিত করা খুবই জরুরী। আমাদের জুম্ম সমাজে ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যেকার লড়াই সংগ্রাম অনিবার্য পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগজনক হল এই-জেনে বা না জেনে সবখানেই কেউ কেউ আমাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকেও শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দালালদের প্রচারণা ও অপ-প্রচার বেশ প্রবলভাবে অবস্থান নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দালালেরা জুম্ম জনগণের ঐক্য প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জুম্ম সমাজের মধ্য থেকেও কেউ কেউ না জেনে এমন কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করছে যা শত্রু পক্ষের ষড়যন্ত্রকে সহায়তার সামিল। তাই সেসব ব্যাপারে আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

ঐক্যের ভিত্তি কি? এব্যাপারে ছাত্র ও যুব সমাজের পক্ষ থেকে গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা জরুরী বলে মনে করি। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে হালকা করে বা ¯্রফে স্বার্থগত অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করলে সঠিক পন্থা-পদ্ধতি খুঁজে বের করা কঠিন হবে। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও বাস্তব অবস্থাকে বস্তুনিষ্ঠতার সহিত বিচার-বিশ্লেষণ করে যথাযথভাবে সমাধানে আন্তরিক সহকারে এগিয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ বহু মর্মান্তিক, হৃদয় বিদারক বহু কালো অধ্যায় পেরিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে আরও অনেক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। শাসকগোষ্ঠী এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে মুখোশ বাহিনী, আঙ্গুল বাহিনী, স্পাই বাহিনী, গুগ্রুক বাহিনী গড়ে তুলেছিলো জনসংহতি সমিতির আন্দোলনের বিরুদ্ধে। একই কায়দায় শাসকগোষ্ঠী পাহাড়ের বুকে আজও সংস্কারপন্থী, ইউপিডিএফ গনতান্ত্রিক দল, মগ পার্টি, জুম্মলীগ, জুম্মদল সৃষ্টি করে চলেছে, যাদের কাজ হল জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করা ও ক্ষতিগ্রস্ত করা। আমি শাসকগোষ্ঠীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- অতীতে জনসংহতি সমিতি, শাসকগোষ্ঠীর সকল বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে সকল বাহিনীকে পরাস্ত করে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছে। সুতরাং শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সৃষ্ট বাহিনী নিয়ে জনসংহতি সমিতি ভীত নয়। জনসংহতি সমিতি অতীতে বহু বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিল। জনসংহতি সমিতি আগামীতেও শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সৃষ্টসহ সকল বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হবে। জনসংহতি সমিতি এখনো সে যোগ্যতা রাখে। তাই সংগ্রামী বন্ধুগণ, জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে, সংকীর্ণ স্বার্থকে অপ্রধান মনে করে জুম্ম জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সৃদৃঢ় করে চুক্তি বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সামিল হোন। ‘জুম্ম জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তিই জুম্মজাতির একমাত্র মুক্তি’। আমাদের আন্দোলন সফল হবেই হবে। সংগ্রাম দীর্ঘজীবী হোক।

…………………………….
বাচ্চু চাকমা, সাবেক সভাপতি, পিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য