বাগদাফার্মের মূল মালিকদের নিকট জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি

বাগদাফার্মের মূল মালিকদের নিকট জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি

সোহেল হাজং: গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের চুক্তিভিত্তিক অধিগ্রহণকৃত জমি মূল মালিক/উত্তরাধিকারী আদিবাসী ও বাঙ্গালীদের কাছে ফিরিয়ে দেবার দাবিতে ২৪ জুলাই সকালে উইমেন ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, এএলআরডি ও কাপেং ফাউন্ডেশন এ ৫টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং’য়ের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় শুভেচ্ছ বক্তব্য রাখেন কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসূল হুদা, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাধারন সম্পাদক সবিন চন্দ্র মুন্ডা ও সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’র সভাপতি ফিলিমন বাস্কে প্রমূখ। আলোচনা সভার শুরুতে বাগদাফার্মের সমসাময়িক অবস্থার উপর নির্মিত প্রামান্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়। মূল আলোচনাপত্র উপস্থাপন করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রকল্প সম্বন্বয়কারী খোকন সুইটেন মুরমু।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, গাইবান্ধার বাগদাফার্মে আদিবাসী ও বাঙালিদের ওপর বেআইনীভাবে গুলিবর্ষণ, হত্যা, উচ্ছেদ ও অগ্নিকান্ড সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই হত্যাকারীরা এদেশে যতদিন বিচারহীনভাবে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত এদেশটি হত্যাকারীর দেশ হিসেবে পরিচয় বহন করবে। কিন্তু আমরা এদেশকে হত্যাকারীর দেশ হিসেবে দেখতে চাই না। এদেশকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের দেশ হিসেবেই দেখতে চাই। তিনি আরো বলেন, বাগদাফার্মে এ বর্বোরোচিত হামলার সাথে জড়িত অন্যান্যদের সাথে ৩জন পুলিশ সদস্য যেভাবে আগুন লাগানোর কাজে সম্পৃক্ত ছিল। এটিও একটি রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ। তিনি বলেন, সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মে আদিবাসী ও বাঙালি কৃষকদের লড়াই মানবিক ও নৈতিক যুদ্ধ। এই লড়াই ততদিন থাকবে যতদিন না আদিবাসীরা জয়ী হচ্ছে।

শামসূল হুদা বলেন, সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে গাইবান্ধা জেলা পরিষদ কর্তৃক ইপিজেড স্থাপনের দাবি অনৈতিক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে যেখানে বলেছেন, কোন ভারী শিল্পের জন্য দুই-তিন ফসলী জমি কখনো অধিগ্রহণ করা হবে না। সেখানে গাইবান্ধা জেলা পরিষদ কর্তৃক বাগদাফার্মের ১৮৪২.৩০ একর জমিতে ইপিজেড স্থাপনের দাবি এক গভীর ষড়যন্ত্র। আদিবাসীরা আজ নিজভূমে পরবাসী। ২০০৪ সালে রংপুর চিনিকল যেখানে লে-অফ ঘোষণা করা হয়েছে তাহলে সেখানকার মিল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসিয়ে রেখে বেতন প্রদান সরকারের জন্য বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতিরই নামান্তর। অবিলম্বে এসব কর্মকর্তা কর্মচারীদের সেখান থেকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, দেশে আজ বিচারহীনতার সংস্কৃতি মহামারি আকার ধারণ করেছে। বাগদাফার্মের আদিবাসীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সারা বাংলাদেশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে।

সভাপতির বক্তব্যে সঞ্জীব দ্রং বলেন, গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের জমি যারা অবৈধভাবে লিজ নেয় সরকারের পুলিশ বাহিনী তাদের পাহাড়া দেয়। অথচ জমির মূল মালিক আদিবাসী সাঁওতাল ও বাঙালি কৃষকের আজ ন্যায্য দাবির জন্য সরকারের সেই পেটোয়া পুলিশ বাহিনীর দ্বারাই খুন হতে হচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আদিবাসীরা আজ বড় অসহায়। আদিবাসীরা সবসময় দেশের উন্নয়নের মাপকাঠির বাইরে থেকে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের উচিত দেশের প্রান্তিক আদিবাসী মানুষের প্রতি আরো মানবিক হওয়া। গাইবান্ধা গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালরা যেখানে দু’বেলা দুমুঠো ভাতের জোগাড় করতে পারে না সেখানে মাসে ২/৩টি মামলায় হাজিরা কিভাবে দিবে? তিনি বলেন, রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের উচিত জমির মূল মালিক আদিবাসী ও বাঙালি কৃষকদের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং সেই সাথে ০৬ নভেম্বরের প্রকৃত হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা।

ফিলিমন বাস্কে বলেন, গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের উপর রংপুর মহিমাগঞ্জ চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের হামলা, মামলা, লুটপাট, খুন, উচ্ছেদ, অগ্নিসংযোগ ও হয়রানির ঘটনা স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান, মানবিকতা ও আইন সবকিছু লংঘন করেছে। ঘটনার পর প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু দুঃখের বিষয় আদিবাসীরা আজও বিচার পায়নি। বাগদাফার্মের জমির উত্তরাধিকারীরাও এদেশের নাগরিক এবং তারা ন্যায্য দাবির জন্য লড়াই করছে। আদিবাসী ও বাঙালি জনগণ ততদিন পর্যন্তই লড়াই সংগ্রাম করে যাবে যতদিন না তাদেরকে বাপদাদার সম্পত্তি পূনর্বাসন করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ৬ নভেম্বরের হামলাকারিদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও শাস্তি প্রদান এবং আদিবাসী বাঙ্গালী কৃষকদের বিরুদ্ধে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের সকল প্রকার মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

সবিন চন্দ্র মুন্ডা বলেন, গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের উপর আক্রমন ১৯৭১ সালের হামলাকেও হার মানিয়েছে। উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা ভূমি থেকে উচ্ছেদের নিমিত্তে প্রতিনিয়তই হামলা, মামলা, নির্যাতন ও খুনের শিকার। বাগদাফার্মের উপর রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশী হামলার পর উল্টো আদিবাসীদের নামে ৯টি মিথ্যা মামলা প্রমান করে প্রশাসন আদিবাসী বান্ধব নয়। এবং ঘটনার প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হবার পর মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্বেও পিবিআই কর্তৃক তদন্ত রির্পোট পেশ না করা আদিবাসীদের প্রতি চরম বৈষম্যেরই প্রতিফলন। বাগদাফার্মে আদিবাসীদের সকল প্রকার দাবি মেনে নিয়ে তাদেরকে বাপ-দাদার জমিতে পূনর্বাসন করতে হবে দাবি জানান। সেসাথে সমতল আদিবাসীদের জন্য এশটি পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করারও জোড়ালো দাবি জানান জাতীয় আদিবাসী পরিষদের এ নেতা।

খোকন সুইটেন মুরমু তার প্রবন্ধে বলেন, উত্তরবঙ্গে বসবাসকারি সাঁওতাল আদিবাসীরা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন সহ মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহন করলেও স্বাধীনতার পর তারা নিজভূমে পরবাসীর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য আদিবাসীর ন্যায় সাঁওতালরাও হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার। সহজ সরল আদিবাসী মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য প্রশাসনের কাছে ধরনা দিলেও তারা প্রতিকার পাচ্ছে না। ফলে তারা নিরবে দেশান্তরিত হচ্ছেন। গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের উপর রংপুর মহিমাগঞ্জ চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের হামলা, মামলা, লুটপাট, খুন, উচ্ছেদ, অগ্নিসংযোগ ও হয়রানির ঘটনা আজ আরেকটি বিচারহীনতারই প্রকৃত উদাহরণ। ঘটনাটির প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী। যা স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান, মানবিকতা ও আইন সবকিছুকেই লংঘন করেছে। বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাই উচিত সংবেদনশীল হয়ে বাগদা ফার্মের চলমান সংকট কাটানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা। প্রয়োজন অনতিবিলম্বে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে পিবিআই কর্তৃপক্ষের তদন্ত রির্পোট প্রকাশ এবং সে অনুযায়ী বিচার-প্রক্রিয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করা।

অনুষ্ঠানের মুক্ত আলোচনায় আদিবাসী যুব পরিষদের সভাপতি হরেন্দ্রনাথ সিং, আদিবাসী ফোরামের সদস্য সোহেল হাজং ছাড়াও বক্তব্য দেন গাইবান্ধা সাহেবগঞ্জ এলাকা থেকে আসা ভিকটিম রমিলা কিস্কু, আজমল হুসেন প্রমুখ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য