বাগদাফার্ম: আদিবাসী বিচারহীনতা ও প্রান্তিকতা

বাগদাফার্ম: আদিবাসী বিচারহীনতা ও প্রান্তিকতা

ক. ভূমিকা:
বাংলাদেশ বহু জাতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তৈরি একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এ দেশে বৃহত্তর বাঙালী জাতি ছাড়াও প্রায় ৫৪টির অধিক ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জাতিসত্তার জনগণের বসবাসস্মরণাতীতকাল থেকে। বাংলাদেশের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তাদের জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আশা-আকাক্সক্ষা। মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীরাও বাঙালিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাক বাহিনীর কাছ থেকে দেশটিকে স্বাধীন করেছে।

উত্তরবঙ্গে বসবাসকারি সাঁওতাল আদিবাসীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন সহ মুক্তিযুদ্ধে সাঁওতালদের ছিল গুরুত্বর্পূণ অবদান। কিন্তু দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার পর সাঁওতালরা নিজভূমে পরবাসীর ন্যায় জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য আদিবাসীর ন্যায় সাঁওতালরাও হামলা, মামলা ও নির্যাতনেরশিকার হচ্ছে।সহজ সরল আদিবাসী মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য প্রশাসনের কাছে ধরনা দিলেও তারা প্রতিকার পাচ্ছে না। ফলে নিরবে তারা দেশান্তরিত হচ্ছে । গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের উপর রংপুর মহিমাগঞ্জ চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের হামলা, মামলা, লুটপাট, খুন, উচ্ছেদ, অগ্নিসংযোগ ও হয়রানির ঘটনা আজ আরেকটি বিচারহীনতারই প্রকৃতউদাহরণ।যাস্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান, মানবিকতা ও আইন সবকিছুকেই লংঘন করেছে।

খ. বাগদা ফার্ম ও আদিবাসী জনগণ
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের ১৮৪২.৩০ একর জমিতে সুদীর্ঘকাল ধরে আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে আসছে। ১৯৩৭ সালের রেকর্ড অনুযায়ি আদিবাসী রায়ত বাগদা সরেনের নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বাগদার্ফাম । উল্লেখ্য, সে সময়ে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাও ছিল সাঁওতাল অধ্যূষিত।১৯৫৪-৫৫ সালে তৎকালীন গোবিন্দগঞ্জ থানার সাপমারা ইউনিয়নের রামপুর, সাপমারা, মাদারপুর, নারেংগাবাদ ও চকরাহিমপুর মৌজার ১৮৪২.৩০ একর জমি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার রংপুর (মহিমাগঞ্জ) সুগার মিলের ইক্ষু ফার্ম করার জন্য অধিগ্রহণপ্রক্রিয়া শুরু করেন। অধিগ্রহণকৃত জমিতে গাইবান্ধা জেলার একমাত্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ সুগার মিল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৬ সালে। ফলে উক্ত মৌজার ১৫টি আদিবাসী সাঁওতাল গ্রাম ও ৬টি বাঙ্গালি গ্রামের প্রায় ২ হাজার ৫০০ পরিবারের আদিবাসী ও প্রান্তিক বাঙালি কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত ও উচ্ছেদ হয়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মূখীন হয়েছিল আদিবাসী সাঁওতালরা।পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশন বিভিন্ন মেয়াদে রংপুর জেলা প্রশাসনকে অধিগ্রহনকৃত ১৮৪২.৩০ একর জমির মূল্য বাবদ মাত্র ৮ লাখ সাত হাজার ৩১৮ আনা ১০.৬ পয়সা প্রদান করেছিল । উক্ত২০টি গ্রামের আদিবাসী ও বাঙালি উত্তরাধিকারীদের মতে, রংপুর জেলা প্রশাসন সেদিন ন্যয্য মূল্য বন্টনে গরিমসি করেছিল।

গত ৩১ মার্চ ২০০৪ রংপুর (মহিমাগঞ্জ) সুগার মিলটি লোকসানের ফলে লে-অফ হয়। মিলটি চালু হওয়ার পর থেকে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির কারণে বেশির ভাগ মৌসুমেই মিলটিকে ব্যাপক লোকসান গুণতে হয়েছিল। ২০১৬ সাল নাগাদ মিলটির লোকসানের পরিমান দু’শ ৩৭ কোটি টাকা। ফলে অধিগ্রহনকৃত১৮৪২.৩০ একর জমি স্থানীয়দের কাছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।২৭তম বিসিএস ক্যাডারভূক্ত অবিদিও মার্ডি এসি(ল্যান্ড) হিসেবে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় যোগদান করলে সাঁওতালরা জমি সর্ম্পকে সচেতন হয়। ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি অবিদিওআকস্মিকভাবে মারা যান। তার পরিবারের দাবি, ভূমিদস্যূরা অবিদিও মার্ডি’কে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। ২০১৪ সালের শুরুর দিকে জমির মূল মালিক/উত্তরাধিকারী আদিবাসী ও কিছু বাঙ্গালী পরিবার ধীরে ধীরে বাগদাফার্মের পাশ^বর্তী আদিবাসী গ্রাম জয়পুর এবং মাদারপুরে বসতি স্থাপন করে বসবাস করা শুরু করেন।

১. পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশনের চুক্তি ও অধিগ্রহন:
সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের আদিবাসী ও বাঙালি পরিবারবর্গের ভোগদখলীয় ১৮৪২.৩০ একর জমি The East Bengal (Emergency) Requisition of Property Act 1948 (No. VIII of 1948) এর বিধান অনুসারে সুগার মিলের ইক্ষুচাষ ও ইক্ষু সরবরাহ করার জন্য রিকুইজিশন (Requisition) করা হয়। ১৯৬২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার উক্ত আইন মোতাবেক পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশনের সাথে একটি চুক্তিপত্র সম্পাদন করে। চুক্তিতে বলা হয়, যে কাজের জন্য (ইক্ষুচাষ) জমি রিক্যুইজিশন করা হয়েছে তা করা না হলে খেসারতসহ পূর্ব মালিকদের কাছে ফেরত দিতে হবে। তৎকালীন সরকার জোরজুলুম ও নানা ছলনার মাধ্যমে রিক্যুইজিশন করলেও সুগার মিলের স্বার্থে আদিবাসীরা বাপদাদার ভিটা-জমি-বাড়ি-ঘর ছেড়ে যায়।

২. অধিগ্রহণের চুক্তি ভঙ্গ করে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষের অবৈধ লিজ প্রদান:
২০০৪ সালে রংপুর মিল বন্ধ ঘোষণা করাহলে মিল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাঝে সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম এলাকার ১৮৪২.৩০ একর জমি অবৈধভাবে লিজ প্রদান করতে থাকে।লিজ প্রদানের বিরুদ্ধে আদিবাসী-বাঙালি প্রতিবাদ করলে অসাধু মিল কর্মকর্তারা প্রভাবশালী স্থানীয় কুচক্রিমহলের যোগসাজসে উক্ত জমিতে ইক্ষুচাষ বাদ দিয়ে অন্যান্য ফসলাদি যেমন: ধান, গম, ভূট্টা, তামাক, সরিষা, আলু ইত্যাদি ফসল চাষাবাদ শুরু করে। কিন্তু ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই তারিখের চুক্তিপত্রে (মেমোরেন্ডাম) উল্লেখ আছে যে, ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি রংপুর সুগার মিলের ইক্ষু ফার্ম করার জন্য অধিগ্রহন করা হয়েছে। উক্ত সম্পতিতে ইক্ষু চাষের পরিবর্তে যদি কখনো অন্য ফসল উৎপাদিত হয় তাহলে অধিগ্রহনকৃত সম্পত্তি পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন সরকার বরাবর ফেরৎ (সারেন্ডার) প্রদান করবেন। সরকার উক্ত সম্পত্তি গ্রহন করে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবেন ।

৩. সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির জমি ফেরত পাবার দাবিতে আন্দোলন:
সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম এলাকার উত্তরাধিকারি আদিবাসী ও বাঙালি জনগণ সর্বস্তরের মানুষের সংহতির মাধ্যমে পৈত্রিক সম্পত্তি ফেরতের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। আদিবাসী-বাঙালিদের আন্দোলনের এক পর্যায়ে মিল কর্তৃপক্ষ জমির অবৈধ লিজ বাতিল করতে বাধ্য হয়। ফলে কুচক্রি প্রভাবশালীদের স্বার্থহানি ঘটে। আদিবাসী বাঙালি সম্মিলিতভাবে পৈত্রিক জমি ফেরতের দাবিতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করে। তখন মিল কর্তৃপক্ষের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী কুচক্রীমহল যোগসাজস করে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে জুলুম ও নির্যাতনের প্রক্রিয়া শুরু করে। এ প্রেক্ষাপটে আদিবাসী-বাঙালি ভূমি উদ্ধার কমিটি গঠিত হয় এবং ন্যায়সংগত ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করে। সেসময় আদিবাসী সাঁওতাল ও বাঙালিদের জুলুম নির্যাতন নিপীড়ণসহ তাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি মিথ্যা মামলার অভিযোগ পাওয়া যায়।

৪. সাঁওতালদের উপর হামলা; তিন সাওঁতাল খুন, ২০০ পরিবারে অগ্নিসংযোগ ও বারশ’র উপর পরিবার উচ্ছেদ:
গত ৬ই নভেম্বর ২০১৬ মিল কর্তৃপক্ষ বেআইনীভাবে (কোর্টের আদেশ ব্যতীত) ৫০০শ’র অধিক পুলিশ, রেপিড একশন ব্যটালিয়ান (র‌্যাব), রংপুর সুগার মিল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভাড়া করা সন্ত্রাসীরা উচ্ছেদের নামে নিরীহ আদিবাসীদের উপর হামলা, বসতবাড়ি ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং বর্বরোচিতভাবে গুলিবর্ষণ করে। সে হামলায় ৩ জন আদিবাসীকে গুলি করে হত্যা, ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৭ জনেরও বেশী আদিবাসী গুরুতর জখম হন। নিহত তিন আদিবাসী হচ্ছেন, শ্যামল হেমরম (৩৫), মঙ্গল মার্ডি (৫০) ও রমেশ টুড (৪০) এছাড়াও সেদিন রাতেই দ্বিজেন টুডু, চরন সরেন ও বিমল কিস্কুকে জখম অবস্থায় পুলিশ গ্রেপ্তার করেন। উক্ত ঘটনায় ১২০০ উপর পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়। গোবিন্দগঞ্জ পুলিশ প্রশাসন ঘটনার পরেই আদিবাসীদের বিরুদ্ধে দু’টি মিথ্যা মামলা করে (মামলানং: ২২৪/২০১৬, তাং: ৬/১১/২০১৬ এবং মামলা নং: ৫৫১/২০১৬, তাং: ৭/১১/২০১৬)। এই মামলা দু’টিতে৪২ গ্রামবাসী এবং ৪০০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়।

স্থানীয় প্রশাসন ও চিনিকল কতৃপক্ষ ঘটনার পর থেকে উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী আদিবাসী ও বাঙালিদের বিরুদ্ধে মোট ৯টি মিথ্যা মামলা করে। এ পর্যন্ত ৮৮ জনকে সেই মামলা গুলোর মধ্যে একাধিকবার আসামী হিসেবে দেখানো হয়েছে। অনেককে গ্রেফতার ও নির্যাতন করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। পরিবার চালানোর মত আর্থিক অবস্থা যেখানে আদিবাসীদের নেই সেখানে ৯টি মামলার ভার পরিচালনা করতে গিয়ে আজ তারা দিশেহারা। মামলার ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তৎকালীন পুলিশ ও কুচক্রী প্রভাবশালীমহল থানায় ভিকটিমদের মামলা গ্রহন না করে দীর্ঘ ১০দিন পর স্বপন মুরমু নামে এক ব্যক্তিকে দিয়ে অজ্ঞাত ৫০০/৬০০ জনকে আসামী করে মামলা রেকর্ড করে। স্বপন মুরমু আদিবাসী ভিকটিম পক্ষের প্রতিনিধি নন, অথচ ভিকটিমদের প্রতিনিধি থোমাস হেম্ব্রম কর্তৃক স্থানীয় সাংসদসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক অভিযোগ/এজাহার অজ্ঞাতকারণে থানা মামলা রেকর্ড করেনি।

৫. বিচারহীনতার প্রায় তিন বছর:
গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রাষ্ট্রীয় চিনিকলের কর্মকর্তা কর্মচারী, তৎকালীন সাংসদসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাংশ ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের বর্বর হামলায় ইউনিফরম পরিহিত পুলিশ কর্তৃক অগ্নিসংযোগের দৃশ্য আল জাজিরা টিভিসহ দেশীয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে আর্ন্তজাতিক মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। ফলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশে গাইবান্ধা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কৃর্তৃক বিচারিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সে তদন্তে পুলিশ কর্তৃক আদিবাসীদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের বিষয়টি প্রমানিত হয়। অগ্নিসংযোগকারী ৩ পুলিশ বিভাগীয় তদন্তে চিহ্নিত ও সাময়িক বরখাস্ত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, চিহ্নিত ৩ পুলিশকে এখনো এ অপরাধ সংঘটনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়নি বা তাদের বিচারের কাঠগড়ায় আনা হয়নি।আদিবাসীরা মনে কওে, ঐ তিন পুলিশকে রিমান্ডে নিলে অগ্নিসংযোগকারী, লুটপাটকারী, সন্ত্রাসী, খুনিদের সনাক্ত করা যাবে বলে অভিজ্ঞমহল দাবি করেছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রেফতার করেনি। উপরন্তু আদিবাসীদের বাড়িতে আগুন দেওয়া, হামলা-নির্যাতনের ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে।রংপুর (মহিমাগঞ্জ) চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের মিথ্যা মামলার হয়রানি, ভূমি সন্ত্রাসীদের চোখ-রাঙানি ও হামলার ভয়ে বাগদা ফার্মের আদিবাসী সাঁওতাল জনগন আজ ভীত সন্ত্রস্ত। তারা ন্যায়বিচারের অভাবে নিজভূমে পরবাসীর জীবন যাপন করছে।

পুলিশ ব্যূরো অব ইনভেশটিগেশন (পিবিআই) এর তদন্ত রির্পোট প্রকাশে বিলম্ব:
মহামান্য হাইকোর্ট উক্ত ঘটনায় পিবিআই’কে গোবিন্দগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে জনৈক স্বপন মুরম’র (তাং:১৬/১১/১৬,জি.আর:৫৬০/১৬) এবং আদিবাসীদের পক্ষে থোমাস হেমরম (তাং: ২৬/১১/২০১৬, জি.ডি ভূক্ত) এর দায়ের করা মামলার তদন্তের নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু ঘটনার প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে পিবিআই আজও তদন্ত রির্পোট পেশ করতে পারেনি। আসামী পক্ষ উল্টো মামলার আলামত সমূহ নষ্ট করার চেষ্টা করেছে পরিকল্পিতভাবে। এছাড়াওভিকটিম ও চাক্ষুস সাক্ষীদের ফৌ: কা: বি: ১৬৪ ধারার জবানবন্দিও গ্রহণ করা হয়নি। প্রশাসন আজও মুল আসামীদের আইনের আওতায় কেন আনছে না তা রহস্য হিসেবেই থাকছে।

গ. বৈষম্যহীনতা ও প্রান্তিকতা; চিনিকল, প্রশাসন ও পুলিশী মামলার হয়রানি এবং আদিবাসী প্রজন্মের অনিশ্চিত ভবিষৎ
৬ নভেম্বরে আদিবাসী সাঁওতালদের উপর বর্বরোচিত হামলা ও হত্যার ঘটনায় মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্বেও পিবিআই আজও রির্পোট পেশ করেনি। কিন্তু একই জেলায় ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যা মামলার ক্ষেত্রে প্রায় ক্লুলেস একটি হত্যাকান্ডে জড়িতদের আড়াই মাসের মধ্যে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন।৬ নভেম্বরে দিনে দুপুরে শত শত মানুষ এবং গণমাধ্যমের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনায় কারা জড়িত ব্যক্তিরা যে প্রশাসনের সহযোগিতা পাচ্ছে তা আজ পরিস্কার। এ ঘটনা প্রমান করে বিচার প্রক্রিয়ায় আদিবাসীরা বৈষম্যের শিকার।

বাগদা ফার্মের আদিবাসী সাঁওতাল জনগণ প্রশাসন ও পুলিশি মামলার হয়রানিতে এবং ভূসন্ত্রাসীদের হুমকির মধ্যে দিনাতিপাত করছে। আজ উচ্ছেদকৃত বারোশ’র অধিক আদিবাসী পরিবারে দিনে দু’মুঠোআহার জুটছে না। নিস্ব পরিবারগুলো আজও খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে। ৬ নভেম্বরের ঘটনায় আতঙ্কিত শিশুরা আজও স্কুলে যেতে ভয় পায়। নিহত তিন সাঁওতাল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উর্পাজনক্ষম ব্যক্তি। তাদের পরিবার আজ নিস্ব, নিহত শ্যামল হেমরমের স্ত্রী ডুমি কিসপট্টা স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা। দুই নাবালক সন্তান নিয়ে সে আবারো ফার্মের মাটি থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছে। নিহত শ্যামল ও মঙ্গলের পরিবারেরও একই দশা। তাদের স্ত্রীরা পরের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রান্তিক আদিবাসীরা দু’বেলা অন্নের যোগান যেখানে করতে পারছে না সেখানে ৯টি মামলা কিভাবে চালাবে তার কূলকিনারা পাচ্ছে না। সহায়-সম্বলহীন আদিবাসীরা আবারো হয়ত একে একে এভাবেই নিরুদ্দেশ হবেন।

ইক্ষু খামার এর পরিবর্তে ইপিজেড স্থাপনের অভিসন্ধি:
গত ২২ জানুয়ারি ২০১৮ গাইবান্ধা জেলা পরিষদ গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় রংপুর চিনিকলে ইপিজেড স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমীপে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ উক্ত স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেন, “সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার” এর অব্যবহৃত ১৮৩২ একর জমিতে ইপিজেড স্থাপন করলে পর্যায়ক্রমে দরিদ্র সকল সাঁওতাল গোষ্ঠীসহ প্রায় ৮-১০ লক্ষ উত্তর বঙ্গের লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং প্রতি বৎসর প্রায় ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। কিন্তুচুক্তির ৩ ও ৫ ধারা মতে- উক্ত সম্পত্তিতে ইক্ষু চাষের পরিবর্তে যদি কখনো কোন সময় অন্য ফসল উৎপাদন হয় তাহলে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনঅধিগ্রহনকৃত ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি সরকার বরাবর ফেরত দিবেন।ইতোমধ্যে জমির মূল মালিক আদিবাসী সাঁওতাল ও বাঙালি কৃষকেরা দাবি করেছেন, অধিগ্রহনকৃত ১৮৪২.৩০ একর জমি রেসটোরেশনের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে দেবার জন্য। গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখের চিনিকলের সন্ত্রাসীদের হামলায় ও পুলিশের গুলিতে তিন সাঁওতাল নিহত হন। এই পরিস্থিতিতে গাইবান্ধা জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষের উক্ত জমিতে ইপিজেড স্থাপনের পরিকল্পনা আসলে সুদূরপ্রসারি এক দূরভিসন্ধিই বটে।

ঘ. সুপারিশ
বাগদা ফার্মের চলমান আন্দোলনের শক্তি আদিবাসী-বাঙালি তথা নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের এক সম্মিলিত কন্ঠস্বর। আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায় নিজস্ব সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা নিয়ে যুগ যুগ ধরে যে প্রতিবেশি বাঙালিদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে সম্মিলিত আন্দোলন তারই নজির। তাই স্বাধীন বাংলাদেশে আদিবাসীরা আজ স্বপ্ন দেখে ন্যায়বিচারের। উদ্বাস্তু বা শরনার্থীর মত করে নয় বরং নিজ দেশে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তারা বেঁচে থাকতে চায়। বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাই উচিত সংবেদনশীল হয়ে বাগদা ফার্মের চলমান সংকট কাটানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা। প্রয়োজন অনতিবিলম্বে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে পিবিআই কর্তৃপক্ষের তদন্ত রির্পোট প্রকাশ এবং সে অনুযায়ী বিচার-প্রক্রিয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করা। পরিশেষে, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির দাবি’র সঙ্গে একমত পোষণ করেউপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বেশকিছু সুপারিশ উল্লেখ করা হলোঃ

১. গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম-এর রিক্যুইজিশন (Requisition) করা ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি আদিবাসীদের ফেরত দিতে হবে। সেই লক্ষে অবিলম্বে সংগ্রামরত স্থানীয় সাঁওতাল ও বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী ও বাঙ্গালী পরিবারের কাছে স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে;
২. আদিবাসী সাঁওতাল পল্লীতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং গুলি করে নিহত ও গুরুতর আহত করার সাথে জড়িত উস্কানিদাতা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য এবং সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সেই সাথে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে;
৩. ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ আদিবাসী-বাঙালিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আদিবাসী বাঙালি নারী-পুরুষের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের জুলুম ও পুলিশী হয়রানি বন্ধ করতে হবে;
৪. ১৯৪৮ সালের The East Bengal (Emergency) Requisition of Property Act 1948 (No. VIII of 1948) মোতাবেক যে কার্যের জন্য (ইক্ষুচাষ) মূল মালিকদের কাছ থেকে ভূমি গ্রহণ হয় তা না করা হলে খেসারতসহ পূর্বমালিকদের ফেরতের বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে;
৫. ২০০৪ সালে সুগার মিল বন্ধের পর প্রভাবশালীদের মাঝে লিজের নামে যে অর্থআত্মসাৎ ও দুর্নীতি হয়েছে সেই দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে;
৬. ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে উচ্ছেদকৃত সাঁওতাল আদিবাসী ও বাঙালি পরিবারের জন্য তাদের নিজ ভূমিতে পূর্ণবাসন করতে হবে এবং তাদের জন্য ঘরবাড়ি, স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আবাসনের সকল ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে;
৭. সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সংকট নিরসনে পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।

……………………………………………………………
সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, এএলআরডি ও কাপেং ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত, ২৪ জুলাই ২০১৯, ডব্লিউভিএ অডিটরিয়াম, ধানমন্ডি, ঢাকা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য