আদিবাসী ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসার আহবান

আদিবাসী ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসার আহবান

সোহেল হাজং, ঢাকা: মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম ততটা ফলপ্রসূ হয় না এটা বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত। এটা যেকোন রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশের নাগরিকদের নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম সুনিশ্চিত করা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভেতরে একটি অশান্ত পরিবশে বিরাজ করছে। তাদের মধ্যে একটি ভীতির সঞ্চার হয়েছে তারা যেন সংবিধান অনুযায়ী সমঅধিকার সম্পন্ন নাগরিক নন। এর দু’টো কারণ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এক.পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। এ চুক্তি বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাভাবিক অবস্থা আশা করা যায় না। দুই. পার্বত্য চুিক্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব নয় কারণ সেখানে নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অখন্ডতার নিরাপত্তার প্রশ্ন সেখানে জড়িত বলে কেউ কেউ মনে করেন। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কাকে রাষ্ট্র দেশপ্রেমিক বলবেন আর কাকে দেশদ্রোহী বলবেন তিনি তার ব্যাখ্যা চান। তিন প্রশ্ন রাখেন আজ যে আদিবাসীরা এ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে সমবেত হয়ে আবেগ দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমার ভালবাসি…’ -গেয়ে অনুষ্ঠান শুরু করল সে কি দেশদ্রোহী; নাকি যিনি শতশত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে জনগণকে পথে নামিয়েছে সে দেশদ্রোহী? এ রাষ্ট্র কার পক্ষ অবলম্বন করবেন-এ প্রশ্নটি তিনি ছুঁড়েন। সুতরাং নিরাপত্তার দোহায় দিয়ে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের অখন্ডতা থাকবে না এ খোঁড়া যুক্তি আর বেশিদিন টানা সম্ভব না।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন শুধু আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের জন্য শুধু গুটিকয়েক আদিবাসী ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, আদিবাসীদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি রাষ্ট্রের মর্যাদা থাকতে হবে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেন বাংলাদেশে এখনও গণমুখী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পায়নি। সমতলে আদিবাসীদের জাতীয় জীবনে বিরাজ করছে অস্থিরতা এবং পাহাড়ে আদিবাসীদের জাতীয় জীবনে চলছে অশান্তি। একদিন এই অশান্তি ও অস্থিরতার কারণ ঠিকই খোঁজে পাওয়া যাবে।

সমাবেশে উপস্থিত বক্তারা আরো বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরোলেও দেশের ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগণ মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। সম্পূর্ণ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ক্রমাগতভাবে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এক সময় যেসব অঞ্চলে আদিবাসীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, সেখানে ‘পপুলেশন ট্রান্সফারের’ ফলে আদিবাসী জনগণ নিজভূমিতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, গারো পাহাড়, উত্তরবঙ্গ, গাজীপুর, মধুপুর বনাঞ্চল, পটুয়াখালী-বরগুনা, খাসিয়া অঞ্চল সর্বত্র আদিবাসীরা তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি হারিয়েছে। আদিবাসীদের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, এখন আত্ম-পরিচয়, মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও আদিবাসী জনগণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং তার স্বাগত বক্তেব্যে বলেন, ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এবার সারা বিশ্বে এ দিবসের রজতজয়ন্তী পালন হচ্ছে। বাংলাদেশে এবার ঈদুল আযহা ছুটির সময়টা বিবেচনা করে একটু এগিয়ে ৫ তারিখেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদিবাসী দিবসের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম। কিন্তু দেশব্যাপী ৯ তারিখেও এ দিবসের উদযাপন চলবে।

মূল সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঐক্যন্যাপ-এর সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের ওযার্কার্স পার্টিও সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, সিপিবি-এর সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ডালেম চন্দ্র বর্মন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদেও সাধারণ সম্পাদক এড. রাণাদাশ গুপ্ত প্রমুখ। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনাওে ৫ আগস্ট সকাল হতেই পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন আদিবাসীদের সংগঠন, আদিবাসী নারী, যুব ও ছাত্র সংগঠন, এবং সহযোগী অন্যান্য সংগঠন তাদের নিজ নিজ ব্যানার নিয়ে অনুষ্ঠানে যোগদান করে। সমাবেশের পর বিভিন্ন আদিবাসী শিল্পীদের অংশগ্রহণে এটি আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পরিশেষে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালির আয়োজন করা হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য