রাজধানীর ছায়ানটে বিশিষ্ট সাংবাদিক দিল মনোয়ারা মনু স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত

রাজধানীর ছায়ানটে বিশিষ্ট সাংবাদিক দিল মনোয়ারা মনু স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত

সতেজ চাকমা: আছে দু:খ, আছে মৃত্যু,বিরহ দহন লগে/ তবুও শান্তি, তবুও আনন্দ,তবুও অনন্ত জাগে। এমনি শোক ও শ্রদ্ধায় আবেগঘন আয়োজনে ঢাকার ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে বিশিষ্ট নারী সাংবাদিক দিল মনোয়ারা মনুর স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর স্বজন, সুহৃদ ও পরিবার বর্গের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হওয়া এই অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন বিশিষ্ট এই গুনী মানুষের নানান দিক। প্রথমেই বিভিন্ন গুনী শিল্পী গান পরিবেবশন করেন এই গুনী মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। কচি কাঁচার মেলার সাথে দীর্ঘকাল যুক্ত থাকার সুবাদে সে মেলার তিন জন তরুণ শিল্পী গান করেন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। বিভিন্ন গুনী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব,সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, সমাজ সেবক তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য প্রদানের শুরুতেই বিশিষ্ট সংস্কৃতি কর্মী কামাল লোহানী বলেন, ‘তাঁকে কেবল সাংবাদিক হিসেবে নয় ,একজন সৎ মানুষ হিসেবেও তাঁকে আমি জানি।’ তাঁর বহুমাত্রিক গুনগুলিই আগামী চলার পথে শক্তি যোগাবে বলে উল্লেখ করেন বিশিষ্ট এই সংস্কৃতি কর্মী । সাংবাদিক,সমাজ কর্মী, লেখিকা হিসেবে তিনি যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন তা সাহিত্যে এবং সমাজে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন এই গুনি ব্যক্তি। অসুস্থ এই ক্রন্তিকালীন সময়ে দিল মনোয়ারা মনুর মত সাহসী ও সৎ মানুষের প্রয়োজনীয়তা এই সমাজে ভীষণ বলেও দাবী করেন বিশিষ্ট এই সাংবাদিক। অন্যদিকে তাঁর (দিল মনোয়ারা মনু) লেখাগুলো মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাজমুন আরা মিনু বলেন, সাংবাদিক, লেখক, মানবাধিকার কর্মী ইত্যাদি নানা অভিধার পরও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি (দিল মনোয়ারা মনু) একজন ‘ভালো মানুষ’।আমাদের সকল কাজের মধ্যেই মনু থাকবেন বলেও আবেগঘন বক্তব্য রাখেন এই সাংবাদিক। এছাড়া তিনি আরো বলেন, তাঁর (মনোয়ারা মনু) ব্যবহার ছিল খুবই অমায়িক। তিনি অনেককে ধরে ধরে লেখা লিখে শিখিয়েছেন বলেও উল্লে করেন নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি।

বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী নিজেরা করি’র নির্বাহী পরিচালক খুশী কবির বলেন, কিছু কিছু ব্যক্তি এক ধরণের অবস্থান তৈরী করে যায় যাদের অনুপস্থিতি খুব অনুভব করার মত। মনু আপা তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অনেক গুনাবলি তাঁর মধ্যে ছিল। তাঁর সবচেয়ে বড় গুন যেটি ছিল সেটি হচ্ছে- মানুষকে ভালোবাসা এবং মানুষের অন্তরে স্থান করে নেওয়া।

কচি কাঁচার মেলার সভাপতি খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, মনু সিনিয়রিটি ব্রেক করে চলে গেছেন। এটা খুবই দু:খের। তাঁর (মনোয়ারা মনু) একটা অভ্যাস ছিল। সেটি হলো- কেউ যদি মারা যান তাহলে তাঁকে তুলে ধরে কিছু লেখা। তবে লেখার মধ্যে সে মানুষটির ইতিবাচক জিনিস গুলোকেই তুলে ধরতেন বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশ তৈরীর প্রক্রিয়ার সময় মনুর একটা ভূমিকা ছিল বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক রাখী দাশ পুরকায়স্থ বলেন, ‘হঠাৎ করে সে(মনোয়ারা মনু) অদৃশ্য হয়ে যাবে ভাবিনি। একজন মানুষের হৃদয়ে কীভাবে স্থান করে নেয়, কী পরিমাণ ভালোবাসা দখল করে নেয়া যায় আর সে ভালোবাসা এবং গোটা দেশ একাকার হয়ে যায় তা মনু আপা’য় দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।’ মানুষকে সমালোচনা করলেও কত ইতিবাচকভাবে সমালোচনা করা যায় তা মনু আপা’য় কেবল দেখিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন বিশিষ্ট এই নারী নেত্রী।

এছাড়া উক্ত অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেনে হোলেনস্টেইন, দিল মনোয়ারা মনুর সহপাঠী, সংরক্ষিত সাংসদ অ্যারোমা দত্ত এমপি, লেখিকা সংঘের সাবেক সভাপতি সেলিনা খালেক, আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং এবং মনোয়ারা মুনর দীর্ঘদিনের জীবন সঙ্গী এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক, মানবাধিকার কর্মী শামসুল হুদা প্রমুখ। এছাড়া দিল মনোয়ারা মুনর প্রতি শ্রদ্ধ জানিয়ে তারঁ পছন্দের কবিতা আবৃত্তি করেন ঝরনা সরকার এবং তাঁর জীবনী পাঠ করেন একেএম বুল বুল আহমেদ।

উল্লেখ্য দিল মনোয়ারা মনু বেগম পত্রিকা,পাক্ষিক অনন্যার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন বহু বছর এবং প্রথম আলো, কালের কন্ঠ, সমকাল সহ বিভিন্ন স্বনামধন্য পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু ছিল নারী অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, অসমতা, প্রান্তিক মানুষের অধিকার এবং সর্বোপূরী মানবিকতাবোধ।

উল্লেখ্য যে দিল মনোয়ারা মনু ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহন করেন এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে এবছরের গত ১৩ অক্টোবর দিবাগত রাত ১ টায় মারা যান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য