পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২ বছর উপলক্ষে জনসংহতি সমিতির সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্য

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২ বছর উপলক্ষে জনসংহতি সমিতির সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্য

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।
ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির সময় ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। সাথে সাথে এই অমুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার নীল-নক্সা প্রণীত হতে থাকে এবং ব্রিটিশ প্রদত্ত ১৯০০ সালের শাসনবিধি খর্ব করা শুরু হয়ে গেলো। ১৮৮১ সালে স্থাপিত ট্রাইবাল পুলিশ বাহিনী ভেঙ্গে দেয়া হলো, ইনার লাইন পারমিট ব্যবস্থা বাতিল করা হলো, বহিরাগতদের অনুপ্রবেশে সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে ভারত থেকে আশ্রিত অউপজাতীয় (মুসলমান) রিফিউজিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে পার্বত্য অঞ্চলে পুনর্বাসন দেওয়া শুরু হলো, পাহাড়ি নেতাদের মধ্যে যারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করার আন্দোলনে যুক্ত ছিল তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করাসহ গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করা হতে থাকে। ফলে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে এক অস্বাভাবিক ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে,১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে ব্রিটিশ প্রদত্ত ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি স্বীকৃতি লাভ করলেও এই আইন লঙ্ঘন করে পাকিস্তান সরকার রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে জুম্ম জনগণের মতামত যাচাই না করে ১৯৫৪ সালে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেওয়ার পরিকল্পনা (ষড়যন্ত্র) গ্রহণ করে থাকে। জুম্ম জনগণের প্রবল আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ১৯৬০ সালে কাপ্তাই নামক স্থানে এই বাঁধ নির্মাণ করা হলো। এই বাঁধের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের সব চেয়ে উর্বর ও বর্ধিষ্ণু ২৫০ বর্গমাইল এলাকা জলমগ্ন হয়ে গেলো। এক লক্ষ জুম্ম উদ্বাস্তু হয়ে গেলো। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জমির বদলে জমি দেয়া হবে। সুষ্ঠু পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।কিন্তু সরকার কার্যত সে রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা সরকার অর্ধেকও ব্যয় করেনি বলে জানা যায়। ফলত সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে একটা অনিশ্চিত ও নিরাপত্তাহীন অবস্থা দেখা দেয়। উদ্বাস্তু জনগণের মধ্যে এ বাস্তবতার ফলশ্রুতিতে ৪০ হাজার ভারতে এবং ২০ হাজার মিয়ানমারে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়। কাপ্তাই বাঁধের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভূমি, কৃষি, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা জুম্ম জনগণের সামগ্রিক জীবনধারা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্দশা, হাহাকার ও দুর্যোগ দেখা দেয়। কাপ্তাই বাঁধ তাই পার্বত্যবাসীদের জীবনে মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও বিকাশ, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভূমি ও অর্থনৈতিক অধিকার সংরক্ষণ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে এক জটিল ও অভূতপূর্ব জাতীয় সমস্যার উদ্ভব হয়।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়। এই সংবিধানে পার্বত্যবাসীদের অস্তিত্ব সংরক্ষণার্থে একটা গণতান্ত্রিক বিশেষ শাসন ব্যবস্থার দাবি উত্থাপন করা হয়। ১৯৭২ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ পার্বত্য অঞ্চলের স্বতন্ত্র শাসনতান্ত্রিক ইতিহাস, জাতীয় পরিচিতি এবং অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকারের নিকট আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু জুম্ম জনগণের প্রবল দাবি সত্ত্বেও এ দাবি উপেক্ষিত ও প্রত্যাখ্যান করা হয়। অপরদিকে পার্বত্যবাসীদের এই দাবি পূরণের পরিবর্তে সরকার একের পর এক দমন নীতি গ্রহণ করতে থাকে। এ উদ্দেশ্যে ১৯৭৩ সালে দীঘিনালা, আলিকদম ও রুমায় তিনটি সেনানিবাস স্থাপন করা হয়। সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে জরুরী অবস্থা জারী করা হয়। জুম্ম জনগণকে সাংবিধানিকভাবে বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। শুরু হয় রাজাকার, মুজাহিদ দমনের নামে নিরীহ নিরপরাধ সাধারণ জনগণের উপর নানাবিধ অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতন। ১৯৭৫ সালে সামরিক শাসন জারী করা হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলনের সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে জুম্ম জনগণের উপর সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর অভিযান ও নির্যাতন জোরদার হয়ে উঠে। জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও ভূমির অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে ও আত্মরক্ষার্থে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে জুম্ম জনগণকে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়।
প্রসঙ্গত ইহা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য যে, দেশ বিভাগের সময় পাকিস্তান আমলে গৃহীত ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে সরকারি অর্থায়নে ও পরিকল্পনাধীনে সমতল জেলাগুলো থেকে পাঁচ লক্ষাধিক বহিরাগত মুসলিম বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের ভিটেমাটি ও জায়গা-জমির উপর সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বসতি প্রদান করা হয়। ১৯৮০ সালে অপারেশন দাবানল নামক সামরিক শাসন জারী করা হয়। এভাবে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর সামরিক দমন পীড়ন, অবৈধভাবে বহিরাগতদের বসতি প্রদান করে জুম্ম জনগণকে সংখ্যালঘুকরণ, ভূমি বেদখল ও জুম্ম জনগণকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদকরণ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিতকরণ, গণহত্যা, সেনা-নিয়ন্ত্রিত তথাকথিত উন্নয়ন, গ্রেপ্তার, নারী নির্যাতন ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অত্যাচার উৎপীড়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যা সমাধানের ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্য-প্রণোদিত নীতি গ্রহণের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা জটিল থেকে আরও জটিলতর আকার ধারণ করেছিল। ফলশ্রুতিতে দমন পীড়ন ও অত্যাচার অবিচার থেকে রেহাই পাওয়া ও নিরাপত্তা লাভের আশায় ১৯৭৮ সাল থেকে লক্ষাধিক পাহাড়ি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
এক পর্যায়ে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে জুম্ম জনগণের দুর্বার আন্দোলনের ফলে এবং দেশে বিদেশে প্রবল জনমতের চাপে পড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক সরকার সেই ভ্রান্ত নীতির পরিবর্তে আলাপ-আলোচনার মধ্যেমে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির সাথে আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৮৫ সালের ২৫শে আক্টোবর তৎকালীন এরশাদ সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় জেনারেল এরশাদ সরকারের সাথে (১৯৮৫-১৯৯০) ৬ বার, বিএনপি সরকারের (১৯৯১-১৯৯৫) সাথে ১৩ বার এবং শেখ হাসিনা সরকারের (১৯৯৬-১৯৯৭) সাথে ৭বার অর্থাৎ মোট ২৬ বার আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সমাপ্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার একটা রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর জাতীয় ও আন্তর্জাাতিক মহলকে সাক্ষী রেখে সংশোধিত পাঁচদফা দাবিনামার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২২ বছর অতিক্রান্ত হলেও সরকার চুক্তির মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ অবাস্তবায়িত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। বলাবাহুল্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যেই সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেই আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বর্তমানে এক নাগাড়ে ১১ বৎসর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোন কার্যকর পদক্ষেপ ও উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। পক্ষান্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিসহ জুম্ম জাতিসমূহের জাতীয় অস্তিত্ব চিরতরে বিলুপ্তির ষড়যন্ত্র অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০১ সালে ‘অপারেশন দাবানল’-এর পরিবর্তে ‘অপারেশন উত্তরণ’ জারী করে সেনা শাসন অব্যাহত থাকে।
চুক্তি স্বাক্ষরকারী আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ ১১ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নে এগিয়ে না আসার কারণে জুম্ম জনগণ তথা পার্বত্যবাসীর মধ্যে একদিকে চরম হতাশা, অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে আর অন্যদিকে নিরাপত্তাহীন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। চুক্তি মোতাবেক বহিরাগত সেটেলারদেরপার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন প্রদান না করে এবং পার্বত্য চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ অবাস্তবায়িত রেখে সরকার উল্টো ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে অব্যাহতভাবে অসত্য, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন প্রচারণা দেশে বিদেশে চালিয়ে যাচ্ছে। “চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক”, “পার্বত্য চুক্তি শতভাগে বাস্তবায়ন করা হবে”, “চুক্তির অবশিষ্ট বিষয়সমূহ পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে” মর্মে বিগত এগার বছর ধরে সরকার কেবল প্রতিশ্রুতি প্রদান করে কালক্ষেপণ করে চলেছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বস্তুত সরকার জুম্ম জাতিসমূহকে চিরতরে নির্মূলীকরণের হীন উদ্দেশ্যে যুগপৎ বাঙালিকরণ ও ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে চলেছে। এই উদ্দেশ্যে একই সাথে শাসকদল এবং সরকার ও সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, প্রতিরক্ষা বিভাগএর একটা বিশেষ মহল চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করা, জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বকে ধ্বংস করা ও চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত সকল কার্যক্রম প্রতিরোধ করার সর্বাত্মক অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বোপরি ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতৃত্ব সশস্ত্র তাঁবেদার ও দালাল বাহিনীসহসাম্প্রদয়িক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাবাহিনী কর্তৃক পার্বত্য অঞ্চলে অবৈধ গ্রেপ্তার ও জেলে প্রেরণ, গুম ও প্রাণহানি, ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ খোঁজার নামে তিন পার্বত্য জেলায় জলপথে ও স্থল পথে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট বসিয়ে জনগণকে নানাভাবে হয়রানিকরণ, অশালীন আচরণ, গ্রামাঞ্চলে তল্লাসী অভিযান, ধরপাকড় ইত্যাদি জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীর তাঁবেদার সংগঠন জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর সদস্যদের রাঙ্গামাটি জেলার সুবলং বাজার, লংগদু উপজেলার তিনটিলাসহ খাগড়াছড়ি সদর জেলার বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্রভাবে মোতায়েন রেখে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির সদস্য ও চুক্তি সমর্থকদের উপর সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর নাকের ডগায় লক্ষ লক্ষ টাকার চাঁদাবাজি করে চলেছে। অন্যদিকে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী সাজিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে একের পর এক সাজানো মামলা দায়ের করে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, একটা মামলায় জামিন পাওয়া গেলে সাথে সাথে আরেকটি সাজানো মামলায় জড়িত করে কারাগারে প্রেরণ ইত্যাদি অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এযাবৎ তিন পার্বত্য জেলায় শতাধিক মামলায় জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মিথ্যাভাবে আসামী করা হয়েছে এবং জনসংহতি সমিতিকে একটি সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহিৃত করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে বিবেচনা করা যায়। এ উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্ব(বিশেষত রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান) রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ মদদ ও যোগসাজশে সংস্কারপন্থী খ্যাত সেনা-সমর্থিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন [যারা জেএসএস (এমএন লারমা) নামে পরিচয় দিতে আগ্রহী] এবং দলচ্যুত আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি) (যারা মাঝে মাঝে মগ লিবারেশন পার্টি নামেও পরিচয় দিয়ে থাকে) নামক বিদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয়ও মদদ দিয়ে জনসংহতি সমিতি ও পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এদের দ্বারা পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অপহরণের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে আর এসব সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর দ্বারা সংঘটিত ঘটনাবলীকে দোহাই দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের উপর নির্বিচারে সেনা অভিযান, তল্লাসী ও দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনকে লঙ্ঘন করেই পার্বত্য মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ১৬-১৭ অক্টোবর তারিখে রাঙ্গামাটিতে আয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, হানাহানি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজীর একতরফা অভিযোগ এনে পার্বত্য চট্টগ্রামে “সামনে ভয়ঙ্কর দিন” আসার হুমকি ও উস্কানীমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। এভাবে জুম্ম জনগণের মধ্যে চরম ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করে জুম্ম জনগণের চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিকে দমন করা এবং আইন-শৃঙ্খলা ও সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার অব্যাহত অপচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আজ পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। জুম্ম জনগণ অকল্পনীয় দমন-পীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। যেই রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার একটা সুষ্ঠু রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল সেই রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে সরকার একটা সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি দল হিসেবে চিহিৃত করে পার্বত্য চুক্তিকে নস্যাৎ করে দিতে বদ্ধপরিকর বলে নির্দ্বিধায় বলা যায়। পার্বত্য অঞ্চলে কোন ঘটনা সংঘটিত হলেই সেই ঘটনার সাথে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মিথ্যেভাবে অভিযুক্ত করে এযাবৎ শত শত সদস্যকে ফেরারী করা হয়েছে এবং জনসংহতি সমিতির কাঠামো তছনছ করে দেয়া হয়েছে ও বহু সদস্যকে গ্রেপ্তার করে জেলে অন্তরীণ করা হয়েছে।
সত্তর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে উগ্র জাতীয়তাবাদী, অগণতান্ত্রিক, উপনিবেশবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে মূল্যায়ন করে জুম্ম জনগণের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন সম্বলিত চার দফা দাবকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল,দমন-পীড়নের পথ গ্রহণ করা হয়েছিল এবং জুম্ম জনগণের যে কোন দাবি-দাওয়া পূরণে অনমনীয় মনোভাব পোষণ করা হয়েছিল। সর্বোপরি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের সকল পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। বর্তমানেও ঠিক সেভাবে সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, উন্নয়নসহ সকল বিষয় স্থানীয় সেনা ও গোয়েন্দাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। বলাবাহুল্য ঔপনিবেশিক কায়দায় আজ জুম্ম জনগণ শাসিত, শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত হচ্ছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পার্বত্য অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত জুম্ম জনগণের পরিচয় ও জীবনধারা সম্পর্কে জানে না। বস্তুত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিষয়ে এদেশের শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত সচেতনতা ও সচতুরতার সঙ্গে আড়াল করে রেখে চলেছে। তাই পার্বত্য অঞ্চলে ঔপনিবেশিক কায়দায় যে সেনা শাসন চলছে, যে জুলুম, নির্যাতন ও নিপীড়ন চলছে; জুম্ম জাতিসমূহের অস্তিত্ব বিলুপ্তির যে ষড়যন্ত্র চলছে;সারাদেশে উগ্র জাত্যাভিমান ও ইসলামীকরণের যে অভিযান চলছে সে সম্পর্কে এদেশের অসম্প্রদায়িকও গণতান্ত্রিক সমাজকে সঠিক তথ্য জানতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি এদেশের গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও বামপন্থী ব্যক্তি, সংগঠন ও রাজনৈতিক দলকে চুক্তি বাস্তবায়ন তথা জুম্ম জাতিসমূহের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোন কর্মসূচি গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করতে এযাবৎ কোন সরকার উৎসাহিত করেনি, বরঞ্চ প্রতি পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে চলেছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
পরিশেষে পার্বত্যবাসীর পক্ষে সবিনয়ে একথা ব্যক্ত করতে চাই- আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধিদলের প্রধান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিবাসীদের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলাম। শান্তিপূর্ণ ও শোষণ-নিপীড়ন মুক্ত একটা নিরাপদ জীবন পাওয়ার আশায় পার্বত্যবাসীরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে আমায় উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছর অপেক্ষা করেও পার্বত্যবাসীর আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করে দেওয়া হলো না। সেটি আজ সুদূরপরাহত।এটি পার্বত্যবাসীরা কখনও ভুলতে পারে না। অগণিত মানুষের তাজা রক্ত আর অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, অকল্পনীয় নির্যাতন, নিপীড়ন, দমন-পীড়ন, শোষণ-বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিনিময়ে অর্জিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি জুম্ম জনগণ বৃথা যেতে দিতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের নীতি পরিহার করে পার্বত্য চুক্তিকে পদদলিত করে, বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে, পার্বত্যবাসীর জমি বেদখল করে, জুম্ম জনগণকে স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ করে, সামরিক উপায়ে দমন পীড়নের মাধ্যমে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ রুদ্ধ করে, জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত ও ফেরারী করে এবং নেতৃস্থানীয় সদস্যদের বন্দী ও জীবনহানি করে, জুম্ম জনগণকে নানা মিথ্যা অভিযোগে জিম্মি করে আর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ আখ্যা দিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের নামে যে কোন ধরনের চক্রান্ত দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কখনই শুভ ফল বয়ে আনতে পারে না।
বলাবাহুল্য জনসংহতি সমিতির তথা জুম্ম জনগণের পিঠ আজ আগের ন্যায় সম্পূর্ণভাবে দেওয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের আর পেছনে যাওয়ার কোন পথ নেই। জুম্ম জনগণ ২২ বছর ধরে চুক্তি বাস্তবায়ন অপেক্ষা করেছে। জুম্ম জনগণ সরকার তথা শাসকগোষ্ঠীকে অনেক সময় দিয়েছে। জুম্ম জনগণ সকল ক্ষেত্রে দুর্বলতর ও পশ্চাৎপদ। তাই বলে তারা অবহেলা ও উপেক্ষার পাত্র হতে পারে না। জুম্ম জনগণ অধিকারকামী ও মুক্তিকামী। আর এটাই তাদের একমাত্র সম্বল। এমনিতর ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতিতে পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণ তাদের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর। জুম্ম জনগণ সমঅধিকার ও সমমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। তাই পার্বত্য অঞ্চলে বিরাজমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তারা আজ গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে তাদের করণীয় কি হতে পারে।বলাবাহুল্য পার্বত্য অঞ্চলের বুকে আজ দুটি পক্ষ পরস্পরে মুখোমুখী অবস্থানে দন্ডায়মান। একপক্ষ চুক্তি বাস্তবায়ন চায় আর অন্যপক্ষ চুক্তি পদদলিত করতে উদ্যত।
বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়ন ছাড়া পার্বত্য সমস্যার সমাধানের আর কোন বিকল্প নেই।
আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
………………………………………………………………..
মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন, জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, হোটেল সুন্দরবন, ঢাকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য