কক্সবাজারে আদিবাসীদের জীবন মান উন্নয়নের সংলাপ অনুষ্ঠিত

কক্সবাজারে আদিবাসীদের জীবন মান উন্নয়নের সংলাপ অনুষ্ঠিত

সতেজ চাকমা: গত ১৩ ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার আদিবাসীদের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার আয়োজনে একটি সংলাপ আয়োজিত হয়। কক্সবাজারের বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজ হোটেলে অনুষ্ঠিত উক্ত সংলাপে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯ টি এবং সমতল অঞ্চলের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা’র সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন আন্তজার্তিক শ্রম সংস্থা বাংলাদেশর ন্যাশন্যাল কো-অর্ডিনেটর অ্যালেক্সসাস চিসাম। এছাড়া উক্ত সংলাপে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রদীপ্ত খীসা, কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক মং এ খেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার আন্দোলনের সভাপতি জুমলিয়ান আমলাই এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আসমা তাসকিন।

কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর খোকন সুইটেন মুর্মুর পরিচালনায় উক্ত সংলাপে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন কাপেং ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক হিরন মিত্র চাকমা। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন, ইনডিজিনাস নেভিগেটর প্রকল্পটি বিশ্বের বিভিন্ন আদিবাসী অধ্যুষিত দেশে চলমান রয়েছে। বাংলাদেশেও এ প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও কাপেং ফাউন্ডেশন একযোগে কাজ করছে।বিগত এক বৎসর ধরে এ প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে মাঠ পর্যাযে বাংলাদেশের ১০ টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি তাঁর সূচনা বক্তব্যে আরো জানান, সংগৃহীত তথ্যগুলোতে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ কেমন অবস্থায় আছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁরা পিছিয়ে রয়েছে সেসব তথ্য এ প্রকল্পের মাধ্যমে উঠে এসেছে বলেও জানান তিনি।

মূল বক্তব্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ওখঙ) বাংলাদেশ এর ন্যাশন্যাল কো-অর্ডিনেটর অ্যালেক্সাস চিসাম এ প্রকল্পের আওতায় সংগৃহীত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থান এবং নানা সূচক ও পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী সমূহের বিভিন্ন দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দু’টি মূল স্তম্ভকে সামনে রেখে এ প্রকল্পটি চলমান রয়েছে। প্রথমটি হল- সংগৃহীত তথ্যগুলা ব্যবহার করে বিভিন্ন সংস্থা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে পারবে। দ্বিতীয়টি হল- জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষনাপত্র সরকার কতটুকু দায়-দায়িত্বের সাথে পালন করছে সেটা জানা এবং ঝউএ বাস্তবায়ন থেকে আদিবাসীরা কতটুকু পিছিয়ে রয়েছে সে বিষয়গুলো তুলে আনা।
বিভিন্ন উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের মতামত(pre prior concent) নেয়া হয়না বলেও জানান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এই প্রতিনিধি। সংগৃহীত তথ্যে এমন বক্তব্য উঠে এসেছে বলে তিনি হতাশ। এছাড়া তিনি আরো জানান, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথাগত নেতৃত্বের অংশগ্রহন খুব সীমিত। এক্ষেত্রে বিশেষ করে সরকারী সংস্থাগুলোকে আরো উদার হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। সরকার কতৃৃক গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রথাগত নেতৃত্বের কোনো প্রতিনধিকে ডাকাও হয়না বলে জানান তিনি।

সংগৃহীত তথ্যগুলোতে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জাতিসমূহের বিভিন্ন নাজুক পরিস্তিতি তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আদিবাসীদের ভাষা সমূহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া আদিবাসীদের উৎপাদিত পণ্য দ্রব্য বাজারজাত করণের কোনো সুব্যবস্থা না থাকা সহ সেসকল পণ্য গুদামজাতের সুবিধা না থাকার ফলে আদিবাসীরা জুম চাষ ব্যবস্থা থেকে সড়ে এসে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে। যাার ফলে তাদের ঐতিহ্যগত পেশা হুমকির মধ্যে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে পটুয়াখালী বরগুনা অঞ্চলের রাখাইন আদিবাসীওদের চাষ করার জন্য কোনো জমিতো নেই বরং তাদের বাস্তুভূমি দখলের জন্য স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা জাল দলিল তৈরী করে দখল করছে বলেও জানান তিনি।

সরকারী তথ্যের নানা গড়মিলের ফলে আদিবাসীরা উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ছে বলেও সংগৃহীত তথ্যগুলো বলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে সমতল আদিবাসীদের দারিদ্র্যের হার ৩৫% এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের দারিদ্র্যর হার ৫১%। কিন্তু তিনি জানান, নেভিগেটর প্রকল্পের মাধ্যমে যে তথ্য উঠে এসেছে তা হল- আদিবাসী পুরুষের দারিদ্র্যের হার ৬৮% এবং আদিবাসী নারীদের দারিদ্র্যর হার ৭৬%।

ঝউএ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদেরকে প্রস্তুত করার জন্য আদিবাসীদের ভাষা সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের আরো অধিক হারে সম্পৃক্তকরণ, ভূমি সংরক্ষণ এবং জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী অধিকার ঘোষণা পত্রের যথাযথ বাস্তবায়নসহ ৬ টি সুপারিশ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা’র এই প্রতিনিধি।

সংলাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আসমা তাসকিন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সমস্যা হল-ভূমি। এই সমস্যা সমাধানে পার্বত্য চুক্তির আলোকে যে ভূমি কমিশন গঠিত হয়েছে তা কার্যকর করার জন্য সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানান তিনি। এছাড়া ভূমি কমিশনের বিধিমালা প্রস্তুত করণের পথে রয়েছে বলেও আশ্বাস তাঁর। তবে তাঁর বক্তব্যে আদিবাসীদেরকে ‘আদিবাসী’ বলে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর বক্তব্যের একপর্যায়ে ‘আদিবাসী’ শব্দ উচ্চারণের পর তিনি ‘সরি’ বলে দু:খও প্রকাশ করেন।

উক্ত সংলাপে অন্যান্যের মধ্যে মতামত প্রকাশ করেন উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপির প্রতিনিধি বিক্রম খীসা, নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়ি মৌজার তরুণ হ্যডম্যান মংনু মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম হ্যাডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারন সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা, ম্রো জনগোষ্ঠী বিশিষ্ট লেখক ইয়াঙান ম্রো পাংখো ইয়ং এসোশিয়েশন নেতা নিকোলাই পাংখোয়া, কক্সবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রদীপ্ত খীসা, কক্সবাজার সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক।

উক্ত সংলাপের সভাপতি পল্লব চাকমা বলেন, পাহাড়ে যেমন মাঠ পর্যায়ে এই তথ্য সংগ্রহ করলাম সমতলেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।সেই তথ্যগুলো ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী সংস্থা আদিবাসীদের উন্নয়নে কাজ করতে পারবে। এভাবে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের সাথে সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সংগৃহীত তথ্যগুলো সরকারকে সরবরাহ করে আদিবাসীদের যথাযথ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। এছাড়া ২০২১ সালের আসন্ন আদমশুমারিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিগত পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা করারও জোর দাবী করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের এই প্রধান নির্বাহী।

দুই দিন ব্যাপী আয়োজিত এই সংলাপে প্রথমদিন ৫টি জনগোষ্ঠী এবং পরের দিন(১৪ ডিসেম্বর) আরো ৫ টি জনগোষ্ঠীর মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যের যথার্থতা যাচাই করে সেগুলোতে আরো নতুন সংযোজন ও বিয়োজনের কাজ করা হয়। প্রথম ধাপে যেসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহ করা হয় সেগুলো হল- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখোয়া, বম, খুমি, ম্রো, খিয়াং ও রাখাইন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য