পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা : কেমন চলছে ?

পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা : কেমন চলছে ?

সতেজ চাকমা: শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। এই শিক্ষা প্রত্যেকটি শিশুর বিকাশকে প্রভাবিত করে।প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামো মজবুত না হলে শিশুদের উচ্চ স্তরের শিক্ষা গ্রহনে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা ঝরে পড়ে। এই ঝরে পড়ার হার পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী অধ্যুষিত প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের ক্ষেত্রে আরো বেশি। বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলার মধ্যে পার্বত্য তিনটি জেলার (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) প্রাথমিক শিক্ষা খাতটি তিন জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ’৯৭ মোতাবেগ এই তিন জেলা পরিষদের অধীনে চলমান প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অসচ্ছতার অনেক অভিযোগ পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শোনা যায়। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র শিক্ষক নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, জেলা পরিষদ যে শিক্ষকগুলো নিয়োগ দিচ্ছে তার মধ্যে অধিকাংশই অদক্ষ এবং অযোগ্য। যার ফলে নিয়োগপ্রাপ্ত এই শিক্ষকদের সাথে কাজ করতে বেশ হিমশিম খেতে হয় বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকদের। শিক্ষার্থীরা দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের পাঠদান থেকে বি ত হচ্ছে বলেও অভিমত এই শিক্ষকের।

সরকার ২০১৭ সাল থেকে পাঁচটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের (চাকমা, মারমা, ককবরক,গারো ও সাদ্রী) মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে। এই মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কেমন চলছে জানতে চাইলে জুরাছড়ি উপজেলার ২ নং বনযোগীছড়া ইউনিয়নের কতরখাইয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রাজশ্রী চাকমা জানান, সংশ্লিষ্ট ভাষার আদিবাসী শিক্ষকদেরকে স্ব স্ব ভাষার উপর ১৪ দিনের একটি ট্রেনিং দেয়া হয়। ১৪ দিনে একটি ভাষার লিখিত ব্যবস্থাকে রপ্ত করা খুবই কঠিন একটি কাজ। তিনি এই ট্রেনিং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত শিক্ষাকে আরো টেকসই করতে ট্রেনিং এর কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষাই নিয়োজিত এই শিক্ষিকা আরো জানান, আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ৫ জন নির্ধারিত থাকলেও চলছে কেবল মাত্র ৩ জন দিয়ে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বাকী দুইজন ডেপুটিশনে অন্য বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাঘাইছড়ি উপজেলার সদর এলাকায় অবস্থিত কাচালং মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষিকা ইতি চাকমা জানান, আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ১২ জন। তিনি আরো বলেন, এই বিদ্যালয়ে ২০০ এর অধিক শিক্ষার্থীর আশি শতাংশই মূল ধারার বাঙালি জনগোষ্ঠীর। বাকীরা চাকমা, ত্রিপুরা,রাখাইন ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী বলে জানান তিনি।

মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবতা জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নলবনিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ভাগ্যবান চাকমা জানান, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা আসলে পুরোপুরি ভাবে পরিপূর্ণতা পাইনি এখনো।কেবলমাত্র তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত মাতৃভাষায় পুস্তক প্রদান করা হয়।আর উক্ত পুস্তকগুলোও তেমন স্বয়ং সম্পূণ নয়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাহাড়ের অনেক জনপ্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষক এখনো নিয়মিত বিদ্যালয়ে যান না। সুষ্ঠু মনিটরিং এর অভাবে অনিমিত এই শিক্ষকরা স্থানীয় স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তিকে বর্গা দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করছে। রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বটতলী মৌন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সাথে এই প্রতিবেদকের সরাসরি আলাপের মধ্যেও এই তথ্য উঠে এসেছে। বটতলী মৌন এলাকা থেকে ঢাকায় উচ্চ শিক্ষায়রত শিক্ষার্থী রমেল তঞ্চঙ্গ্যার সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের উক্ত বিদ্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যান না। কলেজের বারান্দায় পা রাখা স্থানীয় যুবক লক্ষীজয় তঞ্চঙ্গ্যা এবং সাথে তাঁর কিছু বন্ধু মিলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনুজদের প্রতি নিজেদের দায় অনুভব করে ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ান।

বিগত বছরের (২০১৯) শেষের দিকে এই প্রতিবেদকের যাওয়ার সুযোগ ঘটে বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার ছোট মদক এলাকায়। উক্ত এলাকার ত্রিপুরা অধ্যুাষিত গ্রামগুলোতে এখনো সরকারী ব্যবস্থাপনায় নেই কোনো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। ক্যাসুপ্রু পাড়া, ক্যামং হ্যাডম্যান পাড়া এবং রংসোলা পাড়ার ত্রিপুরাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেখান যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো রয়েছে সবগুলোই খ্রিষ্টান মিশনারীদের সহযোগীতায় গড়ে ওঠা। প্রত্যন্ত পাহাড়ের উক্ত শিক্ষার্থীদের পড়ান স্থানীয় স্বল্পশিক্ষিত কিছু ব্যক্তি। স্বল্প বেতন নিয়ে এইসব এলাকার শিক্ষার্থীদের পাঠদানে দায়িত্ব প্রাপ্তদের তেমন কোনো উচ্চ শিক্ষা নেওয়ারও সুযোগ ঘটেনি। যার ফলে শিক্ষার মানের প্রশ্নটা সামনে এসে যায় স্বাভাবিকভাবেই। ক্যাসাপ্রু পাড়ার স্থানীয় প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ক্যাসাপ্রু ত্রিপুরা (কার্বারী) জানান, তাঁর পাড়ায় ৫৫ পরিবারের বসবাস। এই ৫৫ পরিবারের জন্য কোনো সরকারী বিদ্যালয় নেই। যা তাঁদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের।

বিশিষ্ট আদিবাসী ভাষা গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌরভ সিকদার বিগত কয়েক দিন আগে খাগড়াছড়ি জেলার সদর উপজেলার হামাচাং ত্রিপুরা পাড়ায় “হামাচাং বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়”এ ঘুরে আসেন।মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় তাঁর সরেজমিন অভিজ্ঞতা জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী আছে, উন্নত-অনুন্নত অবকাঠামোও আছে, বই আছে। কিন্তু যেটা নেই সেটা হচ্ছে প্রশিক্ষিত শিক্ষক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরো বলেন, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে নতুন ধরণের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সেই সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব। যারা এইসব শিখাবে তাঁরা নিজেরাই জানেনা কীভাবে এসব শেখাতে হয়।
এ বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের কথার আলোকে জানা যায়, জেলা পরিষদগুলোর অসচ্ছ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি, দলীয় পরিচয় এবং দুর্নীতিগ্রস্থ নিয়োগ বানিজ্য, সুষ্ঠু মনিটরিং এর অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতর্েিদর গাফিলতির কারণে পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পাহাড়ী শিশুদের তেমন কোনো পথ দেখাতে পারছে না। যার ফলে শিক্ষা গ্রহনের কোনো এক প্রান্ত থেকে ঝরে পড়ছে পাহাড়ের অসংখ্য আদিবাসী শিক্ষার্থী।তাই পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষাকে আরো টেকসই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো উদ্যোগী হওয়া আবশ্যক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য