নগরে ভোট কেমন হল? রাজেকুজ্জামান রতন

নগরে ভোট কেমন হল? রাজেকুজ্জামান রতন

বহুল আলোচিত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শেষ হল তবে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শেষ হবে না, চলবে আরও অনেকদিন। বরং বলা চলে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ নতুন মাত্রা অর্জন করলো। ছোট বেলায় এই গল্প পড়েছেন নিশ্চয়ই অনেকেই। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেন মোল্লা দো পিয়াজা কে, মোল্লা, এই শহরে কাক কত আছে, বলতে পারবে ? উত্তর দিতে পারবে না এমন কোন প্রশ্ন নেই অথবা উত্তর জানা নেই এমন কোন প্রশ্ন নেই মোল্লা দো পিয়াজার কাছে। ফলে মোল্লা স্মার্ট ভঙ্গীতে উত্তর দিল, জী জনাব, এই নগরে ৯ হাজার ৯ শত ৯৯ টি। এই দ্রুত ও দ্বিধাহীন উত্তরে বাদশাহ নিজেই হতচকিত হয়ে পড়লেন। জানতে চাইলেন হিসেবের সত্যতা আর হুমকি দিলেন, মোল্লা, তোমার এই হিসেব যদি সত্যি না হয় তাহলে কপালে কিন্তু দুঃখ আছে। মোল্লা তখন হেসে বলল, জাহাঁপনা, এটা একদম সত্যি হিসেব। সন্দেহ থাকলে আপনি গুনে দেখুন ! তবে একটা কথা আছে, যদি কাকের সংখ্যা বেশি হয় তাহলে জানবেন কিছু কাক অন্য শহর থেকে এসেছে। আর যদি কম হয় তাহলে মনে করবেন কিছু কাক অন্য শহরে বেড়াতে গেছে। সিটি নির্বাচন নিয়ে পাল্টা পালটি অভিযোগের কারনে এই গল্পটির কথাই মনে পড়ছিল বার বার। প্রশ্ন জাগছিল, নির্বাচনের সময় ভোটার কি বাড়বে না কমবে ? এক পক্ষ বলছিলেন, প্রতিপক্ষ কর্তৃক বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে নগর ভরে ফেলা হচ্ছে। অন্য পক্ষ বলেছিলেন, প্রতি কেন্দ্রে ৫০০ জন করে সন্ত্রাসী মোতায়েন করার আশংকা করছেন তাঁরা। এই অভিযোগ সত্যি ধরলে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, নগরে ভোটার না বাড়লেও বেড়াতে আশা কাকের মত মানুষের সংখ্যা নিশ্চয়ই বেড়ে গিয়েছিল নির্বাচনের সময়।

অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্যে নির্বাচন তো হল। কেমন হল সেটা ? প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সি ই সি বলেছেন, ভোট ভাল হয়েছে তবে ভোট ৩০ শতাংশের কম পড়েছে। প্রার্থীদের এজেন্ট মাঠে নেই কেন এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বললেন, মাঠে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। একজন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, এক পক্ষকে মাঠে দেখা যায় নি। এতো গেল নির্বাচন কমিশনের কর্তা ব্যাক্তিদের কথা। এত প্রস্তুতি এত হাক ডাক ভোটার এলো না কেন? এ দেখি সেই বিরহ বেদনার গানের মত, দীপ ছিল শিখা ছিল শুধু তুমি ছিলে না বলে আলো জ্বললো না । তেমন করে বলা যাবে কি ! ভোটার এলো না বলে ভোট জমলো না। আবার ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং মতামতগুলো খুবই প্রণিধান যোগ্য। একজন বললেন, গত ১০০ বছরে এতটা স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে কারো জানা নেই। কথার ঝোঁকে অতীতের সব নির্বাচনের চাইতে এই নির্বাচনকে বড় করতে গিয়ে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে যে তিনি ছোট করে দিলেন তা কি ভেবেছেন ? অবশ্য এসব ভাবাভাবির কিই বা গুরুত্ব আছে? প্রার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বললেন, দেশ উন্নত হচ্ছে তো তাই ! কারণ উন্নত দেশের মানুষের ভোটের প্রতি আকর্ষণ কম, আমাদের দেশেও তাই কমে যাচ্ছে ভোটের প্রতি আগ্রহ। আরও অনেক কারন উল্লেখ করা হল, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন বলে ভোটার উপস্থিতি কম বা শীত বলে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে অনেকের। আর ছুটির দিন বলে ভোটাররা বেড়াতে গিয়েছেন অনেকেই কাকের অন্য শহরে যাওয়ার মত।

স্বচ্ছ নির্বাচন হয়েছে বলে দাবী করাকে কমিশনার মাহবুব তালুকদার একটু অন্য ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি যা বলেছেন তার অর্থ দাঁড়ায় , স্বচ্ছ কথাটা বানান করে পড়া সহজ কিন্তু অর্থ বুঝাটা অত সহজ নয়। আমরা সবাই বোধ হয় তেমনি হয়ে গেছি। অনেক শব্দের বানান জানি কিন্তু অর্থ কি বুঝি ? চোখ দিয়ে অনেক কিছু দেখলেও যেমন তার কারন বুঝি না, তেমনি বুঝলেও তা বলতে পারি না। আঙ্গুলের ছাপ বিড়ম্বনা নিয়েও নানা ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। অনেকের আঙ্গুলের ছাপ মেলেনি এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ক্ষেত্রেও এই ঘটনা ঘটেছে। এর অনেক সম্ভাব্য উত্তর দেয়া হচ্ছে। বয়স হয়ে গিয়েছে, হাতে ক্রিম বা তেল লেগে আছে বা ঘাম লেগে আছে, হাত দিয়ে পরিশ্রমের কাজ করেন বলে রেখা মুছে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ কেউ আবার এটাকে কৌতুকের বিষয় মনে করে বলছেন, বেশি হাত কচলালেও মনে হয় হাতের রেখা মুছে যেতে পারে। ভোটে আগ্রহ কম বলে না হয় ভোটার কম এলো কিন্তু যারা এলো তাদের হাতের রেখা কেন হারিয়ে গেল ? বহু সমালোচিত নির্বাচন কমিশন এবং আস্থা ফেরানোর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন কি শেষ পর্যন্ত আস্থা ফুরানোর নির্বাচনে পরিণত হল? নির্বাচনের একেবারে আগের দিন সিইসি যে বলেছিলেন, ভোট শান্তিপূর্ণ হবে নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যান। তিনি তার প্রতিশ্রুতি এবং অভয়বাণী কি রক্ষা করতে পারলেন? তার এই অভয়বাণী ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে কতটুকু কার্যকর হল তা বিবেচনা করার প্রয়োজন আছে। কেন ভোট কেন্দ্রে ভোটাররা এত কম গেলেন, সিইসির কথায় তাহলে কি তাঁরা আশ্বস্ত হতে পারেন নি? ভোটার এবং এজেন্টদের সক্ষমতাই যদি প্রধান বিবেচ্য হয় তাহলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির প্রয়োজন কি? সারা দিনে নির্বাচন কমিশনের ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে কি ভোটাররা কোথাও দেখেছেন? এ বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি ভোটারদের আস্থা বেড়েছে না কমেছে তা বিচার না করে ভোট সুষ্ঠু বা ভাল হয়েছে কিনা সে বিষয়ে মতামত দেয়া যুক্তিসঙ্গত হবে না।

ইভিএম নিয়ে আশংকা ও আশাবাদ দুটোই ছিল। ক্ষমতাসীন দল এবং নির্বাচন কমিশন জোরের সাথে বলেছেন ইভিএম আধুনিক পদ্ধতি। এতে দিনের ভোট রাতে দেয়া যাবে না। কারচুপির কোন সুযোগ নেই। দ্রুত ফলাফল জানা যাবে ইত্যাদি। কিন্তু যখন সংকট দেখা দেয় আস্থার তখন যন্ত্রের চাইতে যন্ত্রের পিছনের মানুষের ভুমিকা প্রধান হয়ে উঠে। অনেকে আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেসিন যেন ইলেকট্রনিক ভোট ম্যানেজমেন্ট বা এফিসিয়েনট ভোট মানিপুলেসন এর যন্ত্রে পরিণত না হয়ে যায়। ইভিএম এ জটিলতা, সময়ক্ষেপণ, বুথে ভোট সহায়তাকারীদের উপস্থিতি (যারা অনেকের ভোট দিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে) এই আশংকাকে অনেক অংশে সত্য প্রমানিত করেছে। দিনের ভোট রাতে দেয়া না হলেও দিনের ভোট দিনে দেয়া গেল কিনা এ প্রশ্ন বহুদিন তাড়িয়ে বেড়াবে নির্বাচন কমিশনকে।

একটি গ্লাসে অর্ধেক পানি নিয়ে দুই ধরনের ব্যাখ্যা হতে পারে। আশাবাদীরা বলেন, গ্লাসের অর্ধেক পূর্ণ বাকিটাও একদিন ভর্তি হয়ে যাবে। আর হতাশবাদীরা বলেন, হায় হায় গ্লাসের অর্ধেকই তো খালি ! বাকিটাও তো শেষ হয়ে যাবে। ৫০ শতাংশ পানি শূন্য বা পানি পূর্ণ তা নিয়ে এ ধরনের বিভক্ত মতামত থাকলেও সিইসি যখন বলেন ভোট যা পড়েছে তা ৩০ শতাংশের কম হবে তখন কি আশাবাদী আর নৈরাশ্যবাদীর মধ্যে বিতর্ক জমবে? নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত আগ্রহের একটি বিষয়। সেই রকম একটি নির্বাচনপ্রিয় দেশের রাজধানীতে যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করে, যেখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি এবং ভোটার ৫৪ লাখের বেশি, এত ঘন বসতি পূর্ণ শহরে যেখানে বাসার কাছেই ভোট কেন্দ্র সেখানে ৩০ শতাংশের কম ভোট পড়া কীসের ইংগিত বহন করে? দেশের সচেতন জনসংখ্যার বিপুল অংশ যেখানে বাস করে সেখানকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে না গেলে সে ভোটের নৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু থাকে তা ভাবার সময় এসেছে।

নির্বাচনকে অনেকেই বলে থাকেন, এটা একটা খেলার মত। তাই লেভেল প্লেইং ফিল্ড লাগবে। যে কোন খেলায় হার জিত থাকে। একজন ভাল খেলোয়াড় সবসময় চায় ভাল খেলে জিততে। কারণ জেতার সাথে শুধু আনন্দ নয় সম্মান ও মর্যাদা থাকে। তাই যে কোন ভাবে জিততে গিয়ে প্রতিপক্ষকে মাঠ থেকে বের করে দিলে প্রতিপক্ষকে হারানো যায় কিন্তু নিজের জেতার গৌরবটা থাকে না এবং দর্শকদের খেলা উপভোগ করার আগ্রহ হারিয়ে যায়। আবার কেউ বলেন, নির্বাচন একটা যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধেরও তো একটা নিয়ম আছে। যুদ্ধরত পক্ষও তো যুদ্ধের সময় জেনেভা কনভেনশন মেনে চলে। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সকল মতের যাচাই বাছাই করার অংশ হিসেবে নির্বাচনকে গনতন্ত্রের চর্চা ভাবলে টাকা ও পেশীর জোর, প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার এবং প্রতিপক্ষকে সবরকম উপায়ে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে । তা না হলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মৃত্যু ঘটে। আবার নির্বাচন যদি হয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ তাহলেনির্বাচনী ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক না করে শুধু নির্বাচন আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব হলে সেই নির্বাচনটা হয়ে পড়বে প্রানহীন দেহের অঙ্গের মত। এ অঙ্গ কাজে তো লাগবেই না বরং পচে দুর্গন্ধ ছড়াবে। বিজয়ীর গলার জোরের কাছে হেরে যাওয়া গণতন্ত্রের ক্ষীণ কণ্ঠ শোনা যাবে না। বাংলাদেশের নির্বাচনগুলো বিশেষ করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এর কোনটা ঘটানো হল নাকি সবগুলোর সম্মিলিত রুপের প্রকাশ ঘটলো সেটাই বিবেচনার বিষয়। তবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্বালে গনতন্ত্রের এতটা বিবর্ণ চেহারা কি কারোই কাম্য ছিল?

রাজেকুজ্জামান রতন; কেন্দ্রীয় সদস্য, বাসদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য