সমতায় বিশ্বাসী প্রজন্ম : লড়বে আদিবাসী নারী অধিকার সুরক্ষায়

সমতায় বিশ্বাসী প্রজন্ম : লড়বে আদিবাসী নারী অধিকার সুরক্ষায়

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক এর পক্ষ থেকে সবাইকে জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন। আপনারা জানেন যে, সমাজে শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে নারী সমাজের জাগরণ ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের গতিধারায় এবং বিশ্বব্যাপী নির্যাতন, নিপীড়ন, বঞ্চনা, বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার নারীর নিরাপত্তা, সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তথা নারী মুক্তি আন্দোলনসহ মানবসমাজের প্রগতির ক্ষেত্রে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক একটি দিন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯১০ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে বিশ্বের সংগ্রামী ও সমাজতান্ত্রিক নারীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নারী মুক্তি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা নেত্রী ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাব অনুসারেই ৮ মার্চ তারিখে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ উদযাপনের সূত্রপাত ঘটে। মূলত ১৯০৮ সালে নিউইয়র্ক শহরে কাজের অমানবিক অবস্থা ও বৈষম্যমূলক মজুরীর প্রতিবাদে পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটের স্মরণে এই দিবসটিকে বেছে নেয়া হয়। পরবর্তীতে বিশ্বের দেশে দেশে অব্যাহতভাবে নারী সমাজের জাগরণ ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘও ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৭৬ হতে ১৯৮৫ সময়কালকে নারী দশক হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে এই আন্তর্জাতিক নারী দিবস আরও ব্যাপকতা লাভ করে এবং বিশ্বব্যাপী নারী সমাজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ ও গভীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে থাকে।

বলাবাহুল্য, ইতোমধ্যে নারীর অনেক জাগরণ, উল্লেখযোগ্য অর্জন ও অগ্রগতি সম্ভব হলেও এবং পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদার বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও বাস্তবে গুণগত ও সামগ্রিকভাবে বিশ্বের দেশে দেশে নারীরা এখনও শোষণ, বঞ্চনা, অবহেলা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে চলেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু, স্বতন্ত্র ও আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নারীরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতা ও মানবাধিকার লংঘন এবং জাতিগত আগ্রাসন, সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হতে বাধ্য হচ্ছে। সমাজের অর্ধেক অংশ এবং মানব প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষা ও বিকাশধারার সমান অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় যে কোন উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় এবং সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নীতি নির্ধাণের ক্ষেত্রে হয় নারীরা আজও অনুপস্থিত নয়তো তারা উপেক্ষিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত। অথচ এটা আজ সর্বজনস্বীকৃত ও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, আদিম সমাজে ও আদিম সমাজ হতে আধুনিক সভ্যতা বিনির্মাণে নারীদের অবদান সবচেয়ে বেশি এবং যে কোন সমাজবিপ্লবে নারীদের অনন্য অবদান অনস্বীকার্য। কাজেই নারী সমাজকে পশ্চাতে রেখে এবং অক্ষম ও অধঃস্তন জ্ঞান করে উপেক্ষিত রেখে কোন সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার পূর্ণাঙ্গ ও সুষমভাবে অগ্রগতি লাভ করতে পারে না।

আদিবাসী নারীরা জাতিগত, লিঙ্গগত, ভাষাগত, ধর্মীয়গত এবং শ্রেণীগত কারণে বৈষম্যের শিকার হয়। ফলে এসব কারণে বাংলাদেশের আদিবাসী নারীরা বিভিন্ন ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়। সামগ্রিকভাবে সমাজে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও নারীরা বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাই আমরা জাতিসংঘের এবছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়কে ঠিক করেছিÑ ‘সমতায় বিশ্বাসী প্রজন্ম: লড়বে আদিবাসী নারীর অধিকার সুরক্ষায়’। উল্লেখ্য যে, সমাজ থেকে নারী নির্যাতন ও বৈষম্য দূর করতে উদার, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইনের শাসন এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন প্রজন্মের বিকল্প নেই। পাশাপাশি সমাজে নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংকল্পবদ্ধ একটি প্রজন্মের লড়াই প্রয়োজন এবং এরকম একটি প্রজন্ম গড়ে ওঠা সময়ের দাবি। সময়ের পরিক্রমায় এভাবেই নারী মুক্তি সম্ভব।

বস্তুত আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতার পেছনে অন্যতম একটি লক্ষ্য হল পাশবিক লালসার পাশাপাশি আদিবাসীদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করা, আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের জায়গা জমি থেকে বিতাড়ন করা এবং চূড়ান্তভাবে তাদের জায়গাজমি দখল করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রায় ২৩ বছর পার হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেটেলার বাঙালী কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীর উপর সহিংসতাসহ ভূমিকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের উপর প্রতিনিয়ত হামলা, হত্যা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে। আদিবাসী নারীর উপর সংঘটিত যৌন হয়রানি, ধর্ষণ হত্যা ও অপহরণের বিরুদ্ধে যতগুলো মামলা হয়েছে তার কোন উদাহরণ নেই যে দোষী ব্যক্তিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছে। দেশের সমতল অঞ্চলে দু/একটি মামলায় আদালত অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত ও শাস্তির রায় দিলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ঘটনায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলশ্রুতিতে অপরাধীরা সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্তি পেয়ে থাকে। ফলে সহিংসতার শিকার আদিবাসী নারীরা ন্যায় ও সুবিচার থেকে বরাবরই বঞ্চিত হয়ে আসছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪৫ শতাংশেরও বেশি নারী কর্মক্ষেত্রে বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বহু ধরণের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ৬১ শতাংশ জানিয়েছেন যে তারা বাজার এলাকায়, ৪৫ শতাংশ মাঠে, ৬ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ৩ শতাংশ কর্মস্থলে সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছেন। আবার, ৩৩ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতন, ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতন, ১৯ শতাংশ অর্থনৈতিক নিপীড়ণ এবং ৫ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে, ২০১৯ সালে গণপরিবহনে ৫২টি ঘটনায় ৫৯ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রকাশিত যাত্রী কল্যাণ সমিতির এ প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক পথে ৪৪টি, রেলপথে ৪টি ও নৌপথে ৪টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ১৬টি ধর্ষণ, ১২টি গণধর্ষণ, ৯টি ধর্ষণের চেষ্টা ও ১৫াট যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে, কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে জানা যায়Ñ ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২৬টি আদিবাসী নারীর উপর সহিংস ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে ১৪টি সমতল অঞ্চলে এবং বাকী ১২টি পার্বত্য অঞ্চলে। যৌন বা শারীরিক নির্যাতনমূলক ৩৩টি ঘটনার মধ্যে ১২টি পাহাড়ে এবং ২১টি সমতল অঞ্চলে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ৭ জন আদিবাসী নারীকে ধর্ষণ এবং ৫ জন আদিবাসী নারী ও কিশোরীকে হত্যা বা ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আর ৭ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যান্যের মধ্যে ৩ জনকে গণধর্ষন ও ৬ জনকে শারীরিক নির্যাতন এবং ২ জনকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। আর ২০১৮ সালে প্রায় ৫৩ জন আদিবাসী নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। তন্মধ্যে সমতলে ২২ জন আর ৩১ জন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় (২০১৩) দেখা গেছে, আদিবাসী নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক নীতি, দোষীদের দায়মুক্তি অর্থাৎ শাস্তির আওতায় না আনা, বিচার বিভাগের প্রলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া ও বিরূপ পরিবেশ, বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে আদিবাসীদের সচেতনতার অভাব ও অনভিজ্ঞতা, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতি ও অনিয়ম, আদিবাসীদের দুর্বল প্রথাগত প্রতিষ্ঠান, ভূমি জবরদখল ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া, সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি ও বস্তগত সহায়তার অভাব, ঘটনার অব্যাহত অনুগামী কর্মসূচী ও পরিবীক্ষণের অভাব, ঘটনার শিকার পরিবারের নিরাপত্তার অভাব, জাতীয় মানবাধিকার ও নারী সংগঠনের বলিষ্ঠ ভূমিকার অভাব ইত্যাদি।

এমডিজি থেকে দেশের আদিবাসীরা সুফল লাভ করেনি। তাদের কাছে পৌঁছেনি এমডিজির সেই কাক্সিক্ষত উন্নয়নের ছোঁয়া। তাই তারা এসডিজি বাস্তবায়নে তাদের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে চায়। তারা পিছিয়ে থাকতে চায় না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০১৫/১৬-২০১৯-২০) বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলা হলেও তা খুব যথেষ্ট নয় বলেই আদিবাসীরা মনে করে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মাধ্যমিক পরবর্তী বা তৃতীয় পর্যায় শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা সূচক ০.৭০ থেকে ১.০ উন্নীত করা, ২০-২৪ বয়সের শিক্ষিত নারী পুরুষ অনুপাত ৮৬% থেকে ১০০% এ বৃদ্ধি করা, ২০২০ সালের মধ্যে সরকারী খাতে ২৫% নারী কর্মকর্তা (গ্রেড করা এবং তার উপরে) বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে আদিবাসী নারী সমতা ও ক্ষমতায়নের ব্যাপারে তেমন কোন উদ্যোগ নেই। তার উপর যেটুকু উন্নয়ন নারীরা নিজেদের সাহসিকতা ও দক্ষতায় করছে তার চেয়েও বেড়ে চলেছে আদিবাসী নারীর প্রতি চলমান সহিংসতা। আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুরা বহুমুখী বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার। তারা দেশের জনসংখ্যার মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তাদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে স্ষ্ঠুু বিচারের অভাব পরিলক্ষিত হয়।

নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষার জন্য জাতীয় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা থাকলেও আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য নির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই। সংবিধানে নারীর জন্য জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের জন্য আইন পাশ হয়। এতে জাতীয় স্তরে ও স্থানীয় প্রশাসনে নজিরবিহীনভাবে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু আদিবাসী নারীদের জন্য জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকার পরিষদগুলোতে কোন আসন সংরক্ষিত নেই। ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় ও উন্নয়নে বিশেষ করে সমতলের আদিবাসী নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেটেও আদিবাসী নারীদের জন্য পৃথক কোন বরাদ্দ নেই। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ কার্যাদি বিভাগ থেকেও আদিবাসী নারীদের ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক কাজে ও আদিবাসী নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিশেষ বরাদ্দ নেই। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ সেখানেও আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য বিশেষ কোনো কিছু উল্লেখ নেই।আদিবাসীদের অনিশ্চিত ও নাজুক পরিস্থিতিতে আদিবাসী নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা যেমনি প্রতিনিয়ত ভূলুন্ঠিত হয়ে চলেছে, তেমনি তাদের নিরাপত্তাহীন জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া এবং উল্টো চুক্তি বিরোধী ষড়যন্ত্র জোরদার হওয়ার কারণে চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও বিশেষত সেটেলার বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা বহু জুম্ম নারী যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। সমতল অঞ্চলেও এধরণের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলমান থাকায় তাদের জীবন ও জীবিকা চরম হুমকীতে নিপতিত হতে হচ্ছে।

সমাজের অর্ধেক অংশ নারীদের অবহেলিত, অবদমিত ও বঞ্চিত রেখে যেমনি কোন সমাজের প্রগতি অর্জন সম্ভব নয়, তেমনি নারীর উপর রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, জাতিগত-সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নিপীড়ন ও বঞ্চনা জিইয়ে রেখে কোন দেশে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণ সম্ভব হতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ আদিবাসী জাতিসমূহের উপর যে জাতিগত নিপীড়ন ও সহিংসতা, তা থেকে আদিবাসী নারীর মুক্তি ও নিরাপত্তা, সর্বোপরি আদিবাসী নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং সমতলে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা বন্ধসহ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই।

সুপারিশমালা:
১. আদিবাসী নারীর সকল মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
২. আদিবাসী নারী ও শিশুর উপর সহিংসতা বন্ধে দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিরাপত্তা জোরদার করা।
৩. আদিবাসী নারী ও শিশুর উপর সহিংসতার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।
৪. সহিংসতার শিকার আদিবাসী নারী ও শিশুদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা প্রদান করা।
৫. নারী উন্নয়ন নীতিমালায় আদিবাসী নারীদের জন্য আলাদা একটা অধ্যায় রাখা এবং সকল ধরনের নীতিমালা গ্রহনের পূর্বে আদিবাসী নারী নেতৃবৃন্দের পরামর্শ গ্রহণ করা।
৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করা এবং এলক্ষ্যে সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা।
৭. আদিবাসী নারীদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৮. আদিবাসী মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৯. ভূমি ও সম্পত্তির উপর আদিবাসী নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বন, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করা।
১০. শিক্ষা কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীদের জন্য কোটা নিশ্চিত করা এবং বিধবা ও বয়স্ক ভাতা নিশ্চিত করা।
১১. জাতীয় সংসদে অঞ্চলভিত্তিক এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আদিবাসী নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
১২. পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের অধীনে পার্বত্য নারীদের সকল ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যে একটি বিশেষ সেল গঠন করতে হবে।

…………………………………………………………………………….
বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২০ উপলক্ষে ৯ মার্চ ২০২০, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য