প্রসঙ্গ: করোনাভাইরাস এবং একটি অন্যরকম বিশ্লেষণ

প্রসঙ্গ: করোনাভাইরাস এবং একটি অন্যরকম বিশ্লেষণ

১) করোনাভাইরাসের প্রভাবে পুরোবিশ্বের রাষ্ট্রগুলো এখন ভেতরে ভেতরে টিকে থাকার কঠিন যুদ্ধে দিন অতিবাহিত করছে। প্রতিটি দেশে মিডিয়ার প্রধান শিরোনাম বা আলোচনায় এই ভাইরাস। মনে পড়ে- খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস সতর্ক করে বলেছিলেন, পানির স্বল্পতা বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। এছাড়া আরো অনেকে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ বাঁধবে পানি’কে কেন্দ্র করে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাস আক্রান্তের ফলে সত্যি পানি দিয়ে একটি চরম যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে কিনা বিশ্ব বা মানুষ প্রশ্ন থেকে যায়? কারণ দেশে দেশে এই ভাইরাসের প্রভাবমুক্ত হতে মানুষকে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড বা তার বেশি সময় ধরে প্রবাহিত ধারার পানি দিয়ে হাত ধৌঁত করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। অপচয়প্রবণ বেশির ভাগ মানুষ, এভাবে যদি পুরো বিশ্বে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত হাত ধোয়া শুরু করে তবে পানির উৎস বা মজুদ শেষ হতে বেশিদিন সময় লাগবে বলে মনে হয় না। আর সবার আগে এর প্রভাব পড়বে আরব বিশ্বে এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। মরুভূমির দেশ আরব সেখানে পানির সংকট এমনিতেই লেগে থাকে। এছাড়া তৃতীয় বিশ্বে জলবায়ুর খারাপ প্রভাব বেশি থাকায় পানির উৎস ধারা দিনদিন সংকীর্ণ হয়ে আসছে।

২) পানির সংকট একটি বৈশ্বিক সংকট। যতোই দিন যাচ্ছে এ সংকট আরো তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে এ সংকট। বিশ্বের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী পানি সংকটের মধ্যে রয়েছে। আর সুপেয় পানির সংকটে রয়েছে ৭৬ কোটিরও বেশি মানুষ। মনে আছে নিশ্চয় এইতো কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়া তার দক্ষিনাঞ্চলে পানির সংকটে হয় বলে ১০ হাজার উট হত্যা করেছে। কারন বলা হয়েছে সেখানে উটগুলো বেশি পরিমানে পানি খায়। সুপেয় পানির সবচাইতে মজুদ সমৃদ্ধ দেশ হচ্ছে ক্রমান্বয়ে ব্রাজিল, রাশিয়া, আমেরিকা; এরপরে রয়েছে কানাডা, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

৩) পানির অপর নাম জীবন। জীবনের অধিকার মানে পানির অধিকার। পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায়না। এক পরিসংখ্যান বলছে, সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে বিশ্বে প্রতিদিন পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৪০০ শিশুর মৃত্যু ঘটছে। অন্য পরিসংখ্যান বলছে, এ সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার হবে। তার মানে শিশুরা পানি সংকটের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। সুপেয় পানির প্রাপ্তির সুযোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘ পানি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হলেও এখনো এ অধিকার থেকে বঞ্চিত ৭৬ কোটিরও বেশি মানুষ। নিরাপদ পানির অধিকারবঞ্চিত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই আবার চরম দরিদ্র। প্রান্তিক এ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বাস করে গ্রামে। সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে নারী ও শিশুরা। দিনে দিনে এশিয়া ও আফ্রিকার পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারন করছে।

৩) ইউনিসেফের এক জড়িপ বলছে, চীনের ১০ কোটি ৮০ লাখ; ভারতের ৯ কোটি ৯০ লাখ ও নাইজেরিয়ার ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে ইথিওপিয়ায় ৪ কোটি ৩০ লাখ; ইন্দোনেশিয়ায় ৩ কোটি ৯০ লাখ ও পাকিস্তানে ১ কোটি ৬০ লাখ সুপেয় পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত। আমাদের দেশেও আছে চরম পানি সংকট। এখানে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ জনগোষ্ঠী পানি সংকটের মধ্যে জীবন যাপন করে। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে সুপেয় পানির সুযোগবঞ্চিত জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম।

৪) পৃথিবীতে যতো মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার চেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারায় বিশুদ্ধ পানির অভাবে। পানিবাহিত রোগের প্রভাবে মৃত্যুর পরিমান এখনো বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ পর্যাপ্ত পানি পায় না। জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন ও পানি সংকটের কারনে বিপর্যস্ত জীবনের পাশাপাশি বিশ্ব জুড়ে ঘটছে অনেক অদ্ভুত ঘটনা। গতবছরের শেষে পৃথিবীর অক্সিজেন খ্যাত ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলে ভয়াবহ দাবানল এবং অস্ট্রেলিয়ায় বনাঞ্চলে দাবানল (স্থানীয়গণ বলে বুশফায়ার) তারমধ্যে অন্যতম। এসকল ঘটনা সত্যিকার অর্থে বেশ মর্মান্তিক। আরো লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ইউরোপের লোকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমেরিকা, আর ভারত সব ভিসা প্রদান বন্ধ করেছে এবং সৌদিআরব তাদের দেশের নাগরিকদের ফেরত আসার জন্য সময় বেঁধে দিয়েছে। অন্যদিকে চীন ও ইসরাঈল অন্য যেকোন দেশ থেকে তাদের দেশে প্রবেশ করলে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করেছে। সত্যি সময়টা পুরোবিশ্বে এখন খুব বেগতিক। এমতাবস্থায় বিশ্বে করোনা ভাইরাস যদি অতিশ্রীঘ্রই মোকাবেলা করা না যায়, তবে অনুমান করা যায় করোনাভাইরাস প্রভাবে অবশ্যম্ভাবী পানির সংকটে পড়ে বিশ্ব একটি অনাকাঙ্খিত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।

লেখক: মেকসুয়েল চাকমা, আইনজীবি ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য