কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব ও হাজংদের চাইতে না পারা স্বভাব – সোহেল হাজং

কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব ও হাজংদের চাইতে না পারা স্বভাব – সোহেল হাজং

কোনো আদিবাসী জাতির মানুষের সাথে একেবারে না মিশলে তাদের সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায় না। সাদাচোখে শুধু মনে হবে এরা পাহাড়ের আদিবাসী, ওরা উত্তরবঙ্গের আদিবাসী কিংবা তারা সিলেটের খাসিপুঞ্জির আদিবাসী ইত্যাদি।

বৃহত্তর ময়মনসিংহে যারা বসবাস করে হাজংদের সম্পর্কে তাদের জানার কথা। অন্য এলাকার লোকজন কিংবা একই এলাকার যারা এই হাজং, বানাই, কোচ, ডালু এদের কাছাকাছি আসে নাই, তাদের সাথে ওঠাবসা করে নাই তারা মনে করে থাকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসীরা সবাই গারো। কারণ গারো বা মান্দি হলো এ অঞ্চলের একটি বৃহত্তম আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। এছাড়াও যে অন্য আরো ৫টি আদিবাসী জাতিসত্তা রয়েছে তারা সংখ্যায় কম হওয়ার কারণে কম আলোচনায় আসে।

কোভিড-১৯ মহামারীতে এদেশের হাজংরা এখনো কিভাবে টিকে আছে বা এই প্রাদুর্ভাবের সাথে কিভাবে লড়াই করছে সে কথা বলার জন্যই তাদের প্রসঙ্গ তোলে ধরা। একসময় শতকরা ৯০ ভাগ হাজং পরিবারের অধিক পরিমাণে আবাদী জমি ছিল। তাদের গোয়াল ভরা গরু ছিল। পুকুর ভরা মাছ ছিল। হাজং ছাড়াও অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ যারা হাজংদের সাথে চলেছেন সেই বয়স্ক ব্যক্তিরা আজো এসব গল্প শোনান। নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে হাজংরা ছিল কট্টর। ১৯৬৪ সালের পূর্বে এদের লোকসংখ্যা ছিল ৪৫ হাজারের ওপরে।

একসময় অঢেল সম্পত্তিতে ভরপুর হাজং পরিবারগুলোর কৃষিকাজই ছিল প্রধান ও একমাত্র পেশা। এছাড়া বাইরে গিয়ে অন্য কাজ করাটাকে তারা ছোট মনে করত। অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের আস্থাশীল ও পবিত্র মনে না করে তেমন কাছেও ভিড়তে দিত না! তবুও, কোনক্রমে কেউ তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়লে সেসময় পুরো ঘরকে তারা আবার ধুয়ে মুছে পরিস্কার করত।

কিন্তু হাজংদের সে অবস্থা আজ আর নেই। এখন ৯০ শতাংশ হাজং পরিবার ভূমিহীন। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে টংক আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধ এসব ঝড়ের কবলে পড়ে নিজভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে অসংখ্য হাজং পরিবার। কিছু পরিবার জীবনের ভয় নাকরে ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে ছিল। আজ সেই টিকে থাকা হাজংদের সংখ্যা হবে প্রায় ১৮ হাজার। কিন্তু বিভিন্ন হামলা, মামলা, ষড়যন্ত্রে পড়ে আজ তারাও ভূমিহীন ও প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।

এখন হাজংদের মধ্যে ৭০-৮০ ভাগ পরিবার হবে দরিদ্র, হত-দরিদ্র কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। বেশির ভাগ মানুষ শ্রমজীবী। দিন আনে দিন খায়। একদিন বসে থাকলে কারও কারও বাড়ির চুলোয় আগুন জ্বলে না! তাই, কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব যেভাবে এগিয়ে আসছে তা অন্যান্যদের মতো হাজংদের মাঝেও বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সারাদেশে লকডাউন শুরু হলে তারা কি করবে কোথায় যাবে এ নিয়ে বড় ভাবনা!

‘আভিজাত্য’ বলে একটি কথা আছে। একসময় হাজংদের যখন অঢেল সম্পত্তি ছিল তখন এই আভিজাত্যটিও ছিল। এখন তারা ভূমিহীন, সম্পদহীন পরিবারে পরিণত হয়েছে কিন্তু কোন কোন দিক দিয়ে মনের আভিজাত্য এখনো যেন ধরে রেখেছে। না খেতে পেরে মারা গেলেও কখনো ভিক্ষা করবে না! আভিজাত্য নষ্ট হয়ে যাবে! তবে, হাজংদের মধ্যে কেউ ভিক্ষা করে এমন আজও দেখিনি।

কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবে দীর্ঘদিন লকডাউন পরিস্থিতিতে দেশের মধ্যবিত্ত মূলধারার পরিবারগুলো পর্যন্ত হাত পাতা শুরু করেছে। সেখানে চাইতে না পারা দরিদ্র হাজং পরিবারগুলোর কি হবে!

এ পরিস্থিতিতে এ মানুষগুলোকে বাঁচাতে গত ৪ঠা এপ্রিল জাতীয় হাজং সংগঠনের উদ্যোগে একটি নেটওয়ার্ক বা সমন্বয়করী কমিটি সৃষ্টি হয়। কমিটির নাম দেয়া হলো, “কোভিড-১৯ মহামারীতে হাজং পরিবারের জন্য সহায়তা”। ফেসবুকে এ নামে একটি প্রাইভেট গ্রুপ পেজও খোলা হয়। ২০০ জনের কাছাকাছি যার সদস্য সংখ্যা। সকলে হাজং। প্রায় প্রতিটি গ্রাম থেকে হাজং সদস্য যুক্ত করা হয়েছে। দেশের সংকটে পড়া হাজংদের খবর দ্রুত শেয়ার করার জন্য রয়েছে একটি ম্যাসেন্জার গ্রুপ। সাপ্তাহিক অনলাইন মিটিং ছাড়াও প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আপডেট তথ্য চলে আসে এ গ্রুপে। সংকটে পড়া হাজং পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে যায় কেউ না কেউ। এভাবেই কোভিড-১৯ দূর্যোগকে মোকাবেলা করে আসছে অবহেলিত হাজং সমাজ।

শত অভাবের মাঝেও চেয়ে খাওয়ার অভ্যাস কম এ হাজং পরিবারগুলোকে রক্ষার জন্য নেটওয়ার্কটি অভিনব পন্হা গ্রহণ করেছে। নেটওয়ার্কের সদস্য দ্বারা গ্রামভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চরম সংকটে পড়া ও ঝুঁকিতে থাকা হাজং পরিবারদের খোঁজে বের করা হয়। খাদ্য সংকটে পড়া হাজং পরিবারগুলোকে চাওয়ার আগেই তাদের মাঝে বিভিন্ন মাধ্যমে সাহায্য পৌঁছে দেয়া বা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়! শর্ত থাকে, সাহায্য গ্রহণের সময় সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তির কোন ছবি তোলা যাবে না। কোন ছবি বা কারো নাম সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ দূর্যোগের সুযোগ নিয়ে এ মানুষগুলোকে ক্যামেরার সামনে দেখানোটা বড়ই অমানবিক মনে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, দেশের প্রায় ৭ কোটি মানুষ ত্রাণ পাচ্ছে এ কোভিড-১৯ মহামারী সময়ে। ৭ কোটি মানুষ মানে ৭ কোটি পরিবার এই ত্রাণের আওতায় চলে আসছে। সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হলে তো এই ৪ হাজার হাজং পরিবারের প্রায় সকলেই ত্রাণের আওতায় আসার কথা। কিন্তু হাজংদের মধ্যে সেভাবে ত্রাণ পৌঁছেনি। কলমাকান্দা, তাহিরপুর, ধরমপাশা, নালিতাবাড়ি, ধোবাউড়া ও ঝিনাইগাতী উপজেলার হাজং পরিবরেগুলো ত্রাণ পেয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কম। অনেক দরিদ্র হাজং পরিবারের নাম সরকারের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়নি। তারা অন্যদের মতো চাইতেও জানে না। ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে না, এটি ত্রাণ না পাওয়ার একটি অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করে।

এসময় হাজংদের সমন্বয়কারী নেটওয়ার্কটি দরিদ্র হাজং পরিবারকে সহযোগিতা করছে তিনভাবে। ১. অ্যাডভোকেসী করার মাধ্যমে: সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ বা সহায়তা কিভাবে দরিদ্র হাজং পরিবারের মাঝে পৌঁছে দেয়া যায় সে চেষ্টা করা, ২. জরুরি খাদ্য সহায়তা করা: যখন দেখা যায়, কোন দরিদ্র হাজং পরিবার সরকারি বা বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ত্রাণলাভে ব্যর্থ হচ্ছে এবং খাদ্য সংকটে রয়েছে তখন সে পরিবারকে তার গ্রাম অথবা পাশ্ববর্তী গ্রামের কোন সচ্ছল হাজং পরিবারকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানানো হয়। সেটাও কোনকারণে সম্ভব না হলে নেটওয়ার্কের নিজস্ব তহবিল থেকে দরিদ্র পরিবারে সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়। ৩. সচেতনতা সৃষ্টি করা: করোনা ভাইরাস এবং এর প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং আসন্ন ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় গ্রাম সমাজ, পূজা কমিটি ও অন্যান্যদের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা।

হাজং নেটওয়ার্কের উদ্যোগটি এখনো অব্যাহত রয়েছে। কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা এ কাজ চালিয়ে যাবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। তা’নাহলে এ জাতির দরিদ্র পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। এ নেটওয়ার্কের মূল চালিকা শক্তি হাজং ছাত্র ও যুব সমাজ। বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। সকলের প্রচেষ্টায় নেটওয়ার্কটি এ পর্যন্ত প্রায় এক লক্ষ টাকা কোভিড-১৯ তহবিলে সংগ্রহ করতে পেরেছে। যার প্রায় ৯০% টাকা জমা পড়েছে এই দরিদ্র হাজংদের মধ্য থেকেই। ১০০ টাকা, ৫০০ টাকা করে শুরু করে যে যেভাবে পেরেছে তহবিলে জমা দিয়েছে। সে তহবিল দিয়েই এ পর্যন্ত ৬০টি গ্রামে খাদ্য সংকটে পড়া প্রায় ৩৫০ হাজং পরিবারকে সহায়তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু প্রাদুর্ভাবের দেড় মাস অতিবাহিত হতে চলল। এ থেকে কবে মুক্ত হওয়া যাবে কেউ জানে না। দেশের ১০৪ টি হাজং গ্রামের এক হাজারের অধিক পরিবার এখন খাদ্য সংকটের মধ্যে রয়েছে। চাইতে না পারা এ হাজং জাতিকে রক্ষা করতে অন্যান্যদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

সোহেল হাজং
সাংগঠনিক সম্পাদক;জাতীয় হাজং সংগঠন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য