ফিদেল তোমায় লাল সালামঃ ইমতিয়াজ মাহমুদ

ফিদেল তোমায় লাল সালামঃ ইমতিয়াজ মাহমুদ

(১)
আমি আজকে যার জন্যে শোক করছি তিনি ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ। আমরা তাঁকে ফিদেল ক্যাস্ট্রো নামেই চিনি। কিউবা বিপ্লবের নেতা ছিলেন তিনি। গতকাল তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সময় ওঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। আমি তাঁর মৃত্যুতে শোক করছি বটে, কিন্তু এই পৃথিবীতেই অনেকে আছে যারা ওঁর মৃত্যুতে আনন্দও প্রকাশ করছে, উল্লাস করছে, বা স্বস্তি প্রকাশ করছে। এদের সংখ্যাও কিন্তু নেহায়েত কম না। আমেরিকার ফ্লোরিডা রাজ্যে বাস করছে এরকম লোকজন, যারা কিউবা থেকে এসে আমেরিকায় বাস করছে, ওদেরকে দেখলাম প্রকাশ্যেই কিউবার পতাকা নিয়েই উল্লাস করছে। আমেরিকার নয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাহেব তো টুইট করে স্বস্তি প্রকাশ করেছে।

অনেকেই আছেন, যারা নিতান্ত রাজনৈতিক ভদ্রতার জন্যে একটা শোকবানী দিচ্ছেন- সেটা বোধগম্য। কিন্তু যেসব লোক স্পষ্ট করেই সমাজতন্ত্রের পথকে ভ্রান্ত মনে করেন ওরা যখন ‘কমরেড ক্যাস্ট্রোর’ মৃত্যুতে শোক করে শেষে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক বলে পোস্ট মারছেন ওদের জোশ দেখে একটু খটকা লাগে বটে। বিপ্লব ব্যাপারটা কি তবে টিশার্ট প্রিন্টের ইয়েতে পরিণত হয়েছে? থাক, হোক। হাজার ছেলেমেয়ে এইরকম পপুলার ইয়ে মনে রকে বলতে থাকলে বলা যায়না, ওদের মধ্যে দুই চারজন ‘বিপ্লব ব্যাপারটা কি’ এই খোঁজে নামতেও পারে।

যারা নিতান্ত দক্ষিনপন্থি মন আর চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল চেতনা নিয়েও ‘কমরেড ক্যাস্ট্রো’ বলছেন, বলুক। পুঁজিবাদের উচ্ছিষ্টভোগী যারা ‘কমরেড ক্যাস্ট্রো’ বলছে, এইরকম বলারও নানাপ্রকার সুফল আছে। বলুক। রাগ করবেন না।

(২)
আরও বড় রাগারাগি লেগেছে আমার বন্ধুদের মধ্যে। একাধিক বন্ধু, যাদেরকে আমি বিশেষভাবে পছন্দ করি, ওরা একে অপরের বিরুদ্ধে বেশ কড়া কড়া পোস্ট মারছেন ফেসবুকে আমার কথা। একদল বলছেন দিনশেষে ক্যাস্ট্রো একজন স্বৈরাচারী শাসকই ছিলেন- যিনি তাঁর নিজের দেশের মানুষের কণ্ঠ রোধ করেছেন, নিজের দেশে ভিন্নমতকে দমন করেছেন। এরা হচ্ছেন লিবার্টি পন্থী। আর ক্যাস্ট্রোর সমর্থনে বাম বা বিপ্লবপন্থী একজনকে দেখলাম এইরকম লিবার্টি পন্থীদের একজনকে ভয়ংকর গালি দিয়ে পোস্ট দিয়েছেন।

আগে বলে রাখি, যারা গালি দিচ্ছেন, আপনারা অন্যায় করছেন। কারণ যাই হোক গালি দেওয়া কখনোই বৈধ না, কখনোই সমর্থনযোগ্য না। গালি দেওয়া মন্দ কাজ। মন্দ কাজ তো বটেই, গালি দেওয়া একধরনের অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরাচারী আচরণও বটে। কমরেড ক্যাস্ট্রোকে একজন স্বৈরশাসক বললো বলে আপনি যদি তাঁকে শূয়র বলে গালি দিতে থাকেন তাইলে তো আপনি ওর কথাকেই একরকম যথার্থ প্রমাণ করে দিলেন আরকি।

দেখেন, কমরেড ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে আমি শোকাহত। কেননা ক্যাস্ট্রোর মৃত্যু আমার কাছে আপনজনের মৃত্যু। আমি যে বিপ্লবের স্বপ্ন বাংলাদেশে দেখি ক্যাস্ট্রো সেই বিপ্লব তাঁর দেশে করেছেন সেই ১৯৫৯ সনে। কেবল যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী করেছেন তা নয়, সেই বিল্পবকে রক্ষা করেছেন। আমেরিকা সহ সকল বড় বড় শক্তির বিরুদ্ধে কিউবায় সমাজতন্ত্র বহাল আছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর যখন দুনিয়ায় অন্যান্য সকল দেশেই সমাজতান্ত্রিক ব্যাবস্থা ভেঙে পড়েছে তখনো কিউবা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এটা নেহায়েত ছোটখাটো ব্যাপার না।

আর কেবল স্বৈরাচারী আচরণ দিয়েই এইরকম একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা যায়না। জনগণ সাথে থাকতে হয়। আপনি যদি বলেন ক্যাস্ট্রো কেবল স্বৈরাচারী আচরণ, গুপ্ত পুলিশ আর শক্ত মিলিটারি দিয়েই তাঁর দেশে সমাজতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছেন, ভুল করবেন। ক্যাস্ট্রোর সাথে ওঁর দেশের মানুষ ছিল বলেই তিনি সেটা করতে পেরেছেন।

(৩)
সমাজতন্ত্র কি? সমাজতন্ত্র হচ্ছে একটা অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্র ব্যাবস্থা। সমাজতন্ত্র যে সাম্যবাদ বা কমিউনিজম না সে কথা তো আপনি জানেনই। কমিউনিজম হচ্ছে বিকাশের সেই স্তর যেখানে রাষ্ট্র থাকবে না, আইন থাকবে না, শ্রেণী তো নয়ই। কিন্তু একটা দেশে বা একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে তো আর আপনি আলাদা করে রাষ্ট্র বিলোপ করে দিতে পারবেন না- আপনার চারপাশে সব পুঁজিবাদী ধরনের রাষ্ট্র আইন মিলিটারি ইত্যাদি থাকবে আর আপনি রাষ্ট্র বিলোপ করে দিবেন সে তো হবার নয়। এইজন্যে সমাজতন্ত্র।

সমাজতন্ত্র হচ্ছে মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। সর্বোত্তম রাষ্ট্রব্যাবস্থা। সোভিয়েত ইউনিয়ন পড়ে গেছে, গণচীন সংস্কার করছে, পূর্ব ইউরোপ ভেঙে গেছে সেইব কথা বলতে পারেন- এইগুলি তো পপুলার কথা। কিন্তু আপনি চারপাশে চোখ খুলে দেখেন- সমাজতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য যে রাষ্ট্রে যত প্রবল সে রাষ্ট্র ততোই মানবিক। সমাজতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য মানে কি? রাষ্ট্র নাগরিকদের শিক্ষার দায়িত্ব নিবে, শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য থাকবে না। রাষ্ট্র নাগরিকদের খানাপিনার নিশ্চয়তা করবে, কাজ কর্মের ব্যবস্থা করবে। রাষ্ট্র নাগরিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে, বাড়িঘরের ব্যাবস্থা করবে। চারপাশে চোখ খুলে দেখেন- কেন্দ্রিয়ভাবে পরিকল্পিত অর্থনীতি আর আগে যেসব বললাম- এইসব সমাজতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য কি সকলেই কমবেশি চালু করছে না?

এই যে আমরা সমাজতন্ত্র বলছি- এই ব্যাপারটা তো আমরা খুব বেশীদিন আগে থেকে জানিনা। ১৯১৭ সনে রাশিয়াতে বিপ্লব হয়েছে, বিপ্লবের পর- ঐ যে বললাম কমিউনিজম তো আর সম্ভব না- ওরা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে একটা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বানিয়েছে। এটাই সমাজতন্ত্রের সাথে আমাদের প্রথম পরিচয় আর সমাজতন্ত্রের প্রথম অভিজ্ঞতা। এইরকম সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা তো আর আগে ছিল না। এটা একটা নয়া সমাজ গড়ার পরীক্ষা ছিল।

এই নতুন সমাজটা কিভাবে গড়া হবে? বিপ্লব নামক এই কাণ্ডটা যেহেতু কমিউনিস্টরাই করেছে, এটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা আলাপ আলোচনা সেও তো কমিউনিস্টরাই করবে। নাকি? সেসময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্টরা তো নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে তর্ক বিতর্ক করেছে, আলাপ আলোচনা করেছে। অন্যান্য দেশের কমিউনিস্টরাও চিন্তা করেছে। এরকম একজন ছিলেন জার্মানির কমিউনিস্ট নেতা রোজা লুক্সেমবার্গ।

(৪)
এই রোজা লুক্সেমবার্গের কথা আমি আগেও বহুবার বলেছি। ঐ যে কথাটা- freedom is always and exclusively freedom for the one who thinks differently বা freedom is always the freedom of dissenters, এইগুলি ওঁরই কথা। ১৯১৭ সনে রাশিয়ায় বিপ্লব হলো,আর তার একবছর পরে তিনি একটা ছোট পুস্তিকা লিখলেন রাশিয়ার বিপ্লবের উপর। সেই পুস্তিকাতে রাশিয়ার বিপ্লবের পর বলশেভিক পার্টি কি কর্মসূচী নিচ্ছে, কি ভাবছে সেইসব নিয়ে আলোচনা।

এই পুস্তিকাটার ষষ্ঠ অধ্যায়ের লিবার্টি প্রসঙ্গটা আলোচনা করেছেন কমরেড লুক্সেমবার্গ। এই অধ্যায়ের শিরোনামই হচ্ছে দ্য প্রোবলেম অফ ডিক্টেটরশিপ। রোজা লুক্সেমবার্গ বলছেন, এই যে কমরেড লেনিন আর কমরেড ট্রটস্কি সারা দেশে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে সোভিয়েত ব্যবস্থা চালু করেছেন তাতে করে তো মানুষের রাজনৈতিক জীবন পঙ্গু হয়ে যাবে। দুর্নীতি হবে আর একধরনের ব্যুরোক্রেসির জন্ম হবে। জনগণের রাজনৈতিক জীবন ঝিমিয়ে পড়বে আর সর্বহারার একনায়কত্বের পরিবর্তে একদল রাজনীতিবিদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেছিলেন এই যে আপনারা একটা নতুন সমাজ গঠন করতে যাচ্ছেন, একটা নতুন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন পুরনোটার পরিবর্তে সেটা তো জনগণের চাইতে হবে। আর জনগণকেই যদি সেটা চাইতে হয় তাইলে আপনার ধারনা নিয়ে জনগণের কাছে যেতে হবে, কাজ ও কথায় জনগণ যেন বুঝতে পারে আপনার ধারনাটাই সঠিক। আর জনগণকে যদি বুঝতে হয় তাইলে তো জনগণকে আপনার ধারনা নিয়ে প্রশ্ন করার আর বিরোধ করার সুযোগ থাকতে হবে।

ঐ যে কথাটা আমরা সবসময়ই বলি- যে কথা সত্যি সে কথাকে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে দিতে হয়। নাইলে আর বুঝবেন কিভাবে যে আপনার কথাটা সত্যি? সোভিয়েত ইউনিয়নে সেই কাজটা হয়নি। অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক সমাজেও হয়নি। রোজা লুক্সেমবার্গ যে ঠিকই বলেছিলেন সেকথা তো প্রমাণ হয়ে গেছে। গণতন্ত্রের অভাব বিশেষ করে মানুষের কথা বলার অধিকারটা না থাকার ফলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির জন্যে কাল হয়েছে।

(৫)
ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে কথা হচ্ছিল। তাঁর নেতৃত্ব ১৯৫৯ সনে বিপ্লব হলো, এর আগে কিউবার অবস্থা কি ছিল। বিপ্লবের আগে বাতিস্তার সরকার ছিল, তখন কিউবার পরিচয় ছিল ‘আমেরিকার বেশ্যালয়’ (Brothel of the Ameicas)। বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা। আর কিউবার জমিজমার মালিক ছিল অনেকগুলি বড় বড় আমেরিকান ফার্মের। শ্রমজীবী কৃষক শ্রমিকের জীবনমান ছিল করুন। বিপ্লবের পর সেইসব ফার্ম জাতীয়করণ করা হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। কিউবার অর্থনিতি শক্ত হয়েছে।

কিন্তু কিউবাতে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা আর চালু হয়নি। সোভিয়েত আদলে পার্টির শাসন আছে সেখানে এখনো। মানুষের কথা বলার অধিকার প্রসঙ্গে ক্যাস্ট্রোর সমালোচনাও জায়েজ আছে। এইখানে আমি আমার লিবার্টিপন্থী বন্ধুদের সাথে অনেকাংশেই একমত- মানুষের বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করা অন্যায়। সেটা যদি কমিউনিস্ট পার্টি করে তাইলেও অন্যায়, যদি ফিদেল ক্যাস্ট্রো করেন তাইলেও অন্যায়।

ক্যাস্ট্রো একটা সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্যে একটা মানবিক সমাজ গঠনের জন্যে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বিপ্লব করেছেন। তাঁর জন্যে যেটুকু কৃতিত্বের তিনি হকদার, সেটা তো নেহায়েত হেলাফেলার বিষয় না। লিবার্টি প্রসঙ্গে তাঁর যেটুকু সমালোচনা, সেইটুকু সহই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আমার কোন সমস্যা হয়না।
12647529_10208798918998711_1370058662016669444_n

ইমতিয়াজ মাহমুদঃ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য