সাহেবগঞ্জ হামলার দোষীদের বিচার, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও ভূমি ফিরিয়ে দেবার দাবিতে মানববন্ধন

সাহেবগঞ্জ হামলার দোষীদের বিচার, ক্ষতিগ্রস্তদের  ক্ষতিপূরণ  ও ভূমি ফিরিয়ে দেবার দাবিতে মানববন্ধন

২০ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ সকাল ১১ টায় ঢাকার শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে দেশের বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, কাপেং ফাউন্ডেশনসহ আদিবাসী ও মানবাধিকার সংগঠন সমূহের উদ্যোগে গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ও আদিবাসী গ্রামে হামলা চালিয়ে হত্যা,লুটপাট,অগ্নি সংযোগ, উচ্ছেদসহ ভয়াবহ মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় জড়িতদের বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও ভূমি ফিরিয়ে দেবার দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধন আয়োজন করা হয়। উক্ত মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন পংকজ ভট্রচার্য, সভাপতি ঐক্য ন্যাপ, ফজলে হোসেন বাদশা এম পি, সভাপতি ,আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস ;উষাতন তালুকাদার,এমপি, খুশি কবীর,বিশিষ্ট নারী নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী,মামনুর রশীদ,বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব,কাজল দেবনাথ, হিন্দু ,বৌদ্ধ,খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ব্যারিস্টার জোতির্ময় বড়ুয়া, রবীন্দ্র নাথ সরেন, সভাপতি; জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, রুহীন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি কেন্দ্রীয় নেতা, অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রমুখ।
খুশি কবীর বলেন, স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার অটুট থাকার কথা। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও নাগরিকদের অধিকার লংঘিত হচ্ছে। যার কারণে আমাদেরকে হামলার বিচার চাওয়ার জন্য মানবন্ধন করতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন মানবাধিকারের সবগুলো সনদ লংঘন করে গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালদের উপর বর্বরোচিত হামলা, হত্যা, উচ্ছেদ, ভাংচুর, লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
পুনর্বাসন নয়, বাগদা ফার্মের আদিবাসী ও গরীব বাঙালিদের নিজ জমি ফেরত দেয়ার আহ্বান জানান। বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির দাবি এবং বাগদা ফার্মের কাটাতারের বেড়া তুলে দেওয়ার জোড় দাবি জানান।
ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, কোনরূপ নোটিশ না দিয়ে উচ্ছেদ করা কোনভাবে কাম্য নয় এর জন্য তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন দোষীদের অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। ভূমি কমিশন গঠন করে সমতলের আদিবাসীদের ভূমির ন্যায় সংগত অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার উপর গুরুত্বরোপ করেন।
অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন আমাদের দুর্ভাগ্য যে বিজয়ের মাসে আমাদের আদিবাসী ভাই বোনদের দুঃখ ভরা। বাঙালীদের মত বাংলাদেশে আদিবাসীরা ও এই দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন। অথচ আদিবাসীরা কোন নিরাপত্তা পাচ্ছে না। পুলিশ, এমপি এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দ্বারা সাঁওতাল আদিবাসীদের উপর ইচ্ছাকৃত ভাবেই ঘটনা ঘটেছে। জোড়পূর্বক জমি দখল করা হয়েছে। স্বাধীন দেশের এইসব আদিবাসীদের উপর নির্যাতন।তা মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশে আদিবাসীদের উপড় এই সব নির্যাতন বন্ধ করা উচিৎ।মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আবেদন করছি সাঁওতাল আদিবাসীদের জমি ফিরিয়ে দিতে,যারা মারা গেছে তাদের সুষ্ঠ বিচার,তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবী জানান।
পংকজ ভট্টাচার্য বলেন আজকে দেড়মাস হয়ে গেল সাঁওতাল আদিবাসীরা এখনো খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। সরকার এখনো কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই। এভাবে কতদিন চলবে। আপনারা দেখেছেন সাঁওতালদের জমি জোড়পূর্বক দখল,ঘর বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, অনেক ক্ষতি হয়েছে। এইসব ঘটনা ইচ্ছে করেই ঘটানো হয়েছে।যতদিন এদের জমি ফিরিয়ে দেওয়া হবে না ততদিন সংগ্রাম করে যাব। সরকারের প্রতি আহবান জানাই অতি দ্রুত সাঁওতাল আদিবাসীদের জমি ফিরিয়ে দিতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ৫নং সাপমারা ইউনিয়নের রামপুর, সাপমারা, মাদারপুর, নরেঙ্গাবাদ ও চক রহিমাপুর মৌজার ১,৮৪২.৩০ একর ভূমি ‘রংপুর (মহিমাগঞ্জ) সুগার মিলের’ জন্য অধিগ্রহণ করে তৎকালিন পূর্ব-পাকিস্তান সরকার। এলাকাটি সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম নামে পরিচিত। অধিগ্রহণের ফলে ১৫টি আদিবাসী গ্রাম ও ৫টি বাঙালি গ্রাম উচ্ছেদ হয়। কথা ছিল অধিগ্রহণকৃত জমিতে আখ চাষ করা হবে। আখ চাষ না হলে এসব জমি আবারো যে সব মূল মালিকদের থেকে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল সেসব ভূমি মালিকদের ফিরিয়ে দেয়া হবে। এটি ছিল চুক্তি। অধিগ্রহণের পর বেশ কিছু জমিতে আখ চাষ হয় এবং আখ ব্যবহার করে চিনি উৎপাদন করা হয়। কিন্তু চিনিকল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনার দরুণ ৩১ মার্চ ২০০৪ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে নানা সময় একবার চালু হয়, আবার বন্ধ হয় এভাবেই চলতে থাকে। চিনিকল কর্তৃপক্ষ নানাভাবে অধিগ্রহণকৃত জমি বহিরাগত প্রভাবশালীদের কাছে ইজারা দিতে শুরু করে। অধিগ্রহণের চুক্তি লংঘন করে কেবলমাত্র আখচাষের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে ধান, গম, সরিষা ও আলু, তামাক ও ভূট্টা চাষ শুরু হয়। আদিবাসী ও বাঙালী জনগণ পুরো ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে আনে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সনের ৩০ মার্চ গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম এলাকা সরেজমিন তদন্ত করেন। তদন্তকালে তারা উল্লিখিত জমিতে ধান, তামাক ও মিষ্টি কুমড়ার আবাদ দেখতে পান। কিন্তু গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন ১০ মে ২০১৬ তারিখে উক্ত ভূমিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন সরকার বরাবর। বাপ-দাদার জমিতে অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিতে আদিবাসী-বাঙালি ভূমিহীনদের তৈরি হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন। আন্দোলন দমাতে চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন ভূমিহীনদের উপরে অনেক হয়রানি করেছে, মামলা দিয়েছে। ১৯৬২ থেকে ২০১৬, দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে চিনি উৎপাদনের অজুহাতে রাষ্ট্র সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের ভূমি উদ্বাস্তু হাজারো মানুষের সাথে অন্যায় করে চলেছে, করে চলেছে স্পষ্ট অবিচার। ঘটনাটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান পরিপন্থী, ঘটনাটি যে কোনো মানদন্ডেই মানবিকতা পরিপন্থী, নৈতিকতা পরিপন্থী, সম্পত্তির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা নিশ্চিতকরণের বিধান পরিপন্থী। দ্রুত এর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার জরুরি।

সর্বশেষে মানববন্ধনোত্তর সমাবেশে নিম্নোক্ত দাবি উত্থাপন করা হয়

১. সাঁওতাল আদিবাসী হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এর সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে;
২. নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত সকল পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পূর্ণ নিরাপত্তাসহ আবারো তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে বসবাসের পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে হবে;
৩. আদিবাসীদের বাপ-দাদার ভূমি ফিরিয়ে দিতে হবে এবং এখানেই সরকারি খরচে তাদের আবাসভূমি গড়ে তুলতে হবে;
৪. সকল মিথ্যা মামলা অনতিবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে;

আয়োজক সংগঠনসমূহ:

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ● জাতীয় আদিবাসী পরিষদ● বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ● কাপেং ফাউন্ডেশন●মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন●বাপা● ব্লাস্ট●এএলআরডি●আসক●নিজেরা করি●ব্রতী ●আইইডি●জন উদ্যোগ●আরডিসি● জয়েনশাহী আদিবাসী পরিষদ●জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ●নকমান্দি● বাংলাদেশ বানাই উন্নয়ন সংগঠন●আচিক মিচিক সোসাইটি● আদিবাসী যুব পরিষদ●আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ●পিসিপি●গাসু●বাগাছাস●আদিবাসী ছাত্র পরিষদ● খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন●উরাও ছাত্র সংগঠন●মাহাতো ছাত্র সংগঠন●সাসু●বর্মন ছাত্র পরিষদ●হাজং ছাত্র সংগঠন● মাদল●আইপিডিএস●বাংলাদেশ উরাও ছাত্র সংগঠন●কুবরাজ ●বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য মানবাধিকারকামী সংগঠন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য