বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৬

কাপেং ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৬ এর সারাংশ দেওয়া হলঃ

বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও ৫৪ টির অধিক আদিবাসী জাতিসমূহ শত শত বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী, বাংলাদেশে আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় ১,৫৮৭,০০০ যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ১.৮০ ভাগ। যদিও সমতলে বসবাসরত আদিবাসীরা দাবি করেন, তাদের জনসংখ্যা ২০ লক্ষের অধিক। তবে আদিবাসীদের জন্য পৃথক পরিসংখ্যান না থাকায় আদিবাসী জাতি ভিত্তিক সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সরকারী তথ্যের লভ্যতা এখনো একটি উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের আদিবাসী জতিসমূহকে এখনো সংবিধানে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি। ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার আদিবাসীদেরকে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সমপ্রদায়” (অনুচ্ছেদ ২৩ক) হিসেবে অভিহিত করেছে। সেই সাথে বাংলাদেশের জনগণকে জাতি হিসেবে বাঙালী পরিচিতি প্রদান করার ফলে এসব আদিবাসী জাতিসমূহকেও ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে [অনুচ্ছেদ ৬(২)]। যদিও ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুস্বাক্ষর করেছে তথাপি অদ্যবধি বাংলাদেশের আদিবাসীদের অবস্থার তেমন কোন ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশ সরকার ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১. আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জতিসংঘ ঘোষণাপত্র ২০০৭ বাস্তবায়ন ও আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুস্বাক্ষর; ২. আদবাসীদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ভূমি নীতিমালা প্রণয়ন এবং পরিশেষে ৩. প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে আদিবাসীদের আইনী সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করলেও এখনও সেসব বাস্তবে রূপায়িত হয়নি।
২০১৬ সালের অক্টোবরে পাশ হওয়া ফরেন ডোনেশনস (ভলেন্টারি অ্যাক্টিভিটিস) রেগুলেশন অ্যাক্ট এবং প্রস্তাবিত প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট সংশোধনীকে এমনভাবে করা হয়েছে যা বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) মত প্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার অধিকারকে খর্ব করবে এবং সেই সাথে সংবাদপত্রের কন্ঠ রুদ্ধ করবে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে ইস্যুকৃত সরকারী নির্দেশনায় ব্যক্তি, দেশী ও বিদেশী সংগঠনের উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের সাথে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করতে চাইলে প্রশাসন, সেনাবাহিনী/বিজিবি এর উপস্থিতি বাধ্যতামূলককরণসহ অনেক বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে যা বৈষম্যমূলক ও অগণতান্ত্রিক।
এবছরও এর আগের বছরগুলোর ন্যায় বাংলাদেশের আদিবাসীরা বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। আদিবাসীদের তাদের পিতৃপুরুষের ভূমি থেকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। আদিবাসীরা ক্রমাগত তাদের ভূমি হারাচ্ছে, ভূমি দস্যুরা আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন জায়গা-জমি জাল দলিল, ভূয়া কাগজপত্র, হুমকি, আক্রমণের মাধ্যমে জবরদখল ও হরণ করে নিচ্ছে। দেশের আইন ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে ভূমি দস্যু ও সুবিধাবাদীরা এসব অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এমন কোনো উদাহরণ নেই যে যেখানে আদিবাসীরা সুবিচার পেয়েছে বা সুষ্ঠ বিচারের মাধ্যমে নিজ জমি ফেরত পেয়েছে।
বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে তার কোন প্রতিফলন এখনও আদিবাসীদের জীবনে আসেনি। অধিকার বঞ্চনা ও প্রন্তিকতা থেকে বের হয়ে আদিবাসীরা এখনও উন্নয়নের ধারায় যুক্ত হতে পারেনি। আদিবাসীদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতিকে অস্বীকার করার কারণে আদিবাসীদের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে রয়েছে। যখন দেশের জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা সংকীর্ণ হয়ে আছে, তখন দেশের সকলের সাথে আদিবাসীরাও দুঃখ-দুর্দশায় পতিত হয়। তবে এটা আশ্বাদায়ক এই যে, দেশের সুশীল সমাজ ও মিডিয়া আদিবাসীদের অধিকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করছে এবং এসব ইস্যুতে সোচ্চার রয়েছে। আদিবাসীদের সম্পর্কে দেশের মূলধারার জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেকের ভুল ধারণা থাকা সত্ত্বেও, তাদের অনেক সমর্থনকারী নেটওয়ার্ক এগিয়ে আসা শুরু করেছে যদিও তাদের কার্যক্রম এখনো সেরূপ আকাঙ্ক্ষিত গতি লাভ করেনি।

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের পরিস্থিতি
আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আদিবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ খুবই প্রয়োজন। ব্যাপক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিকরণ আদিবাসীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মূল চালিকা শক্তি। জাতীয় ও স্থানীয় উভয় পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার কারণে আদিবাসীদের উপর বৈষম্য-বঞ্চনা আরো ব্যাপক মাত্রায় লক্ষ্য করা যায়। আদিবাসীদের প্রতি এরূপ আচরণ সরকারের আধিপত্যবাদী ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রতিফলিত করে।
সারাদেশে ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ জুন অনুষ্ঠিত গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সমতলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে কেউ চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেননি, যদিও দেশের আদিবাসী জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশী সেখানে বসবাস করেন। সমতলের বিপরীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় ১১৫টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৮৩টি ইউনিয়ন পরিষদে আদিবাসী চেয়ারম্যান প্রার্থীরা নির্বাচনে জয় লাভ করেছেন। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল, তবুও ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামের ৭ টি পৌরসভার নির্বাচনে আদিবাসীদের মধ্যে থেকে কোন মেয়র প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেননি।
সুপ্রীম কোর্টের এক আদেশে আইন প্রয়োগাকারী সংস্থা কর্তৃক সন্দেহের ভিত্তিতে নির্বিচারে গ্রেফতার রহিত করা হয়েছে। তবুও এদেশে নির্বিচারে গ্রেফতার, আটক, গুম এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটে চলছে। এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সদস্যরাও এ ধরনের অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপরন্তু তাদেরকে বিচারের আওতায় না এনে তাদের দায় ক্রমাগতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ দ্বারা আদিবাসী মানবাধিকার রক্ষাকর্মী ও আদিবাসী সংগঠনসমূহের সদস্যদের উপর দমন, নিপীড়ন, নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলে নির্বিচারে গ্রেফতার আটক এবং হুমকি অব্যাহত রয়েছে। ২০১৬ সালে অন্তত ১৯১ জন আদিবাসী মানবাধিকার কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দায়ের করা হয়েছে। তার মধ্যে সমতলের ৪২ জন নিরীহ আদিবাসী গ্রামবাসী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জন জনপ্রতিনিধিসহ ৮০ জন আদিবাসী মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সমতলের ৪ জনসহ মোট ৮১ জনকে আটক করা হয়।
২০১৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতল অঞ্চল মিলে কমপক্ষে ২৩ জন আদিবাসীকে (৬ আদিবাসী নারীসহ অধ্যায় ৪ দ্রষ্টব্য) হত্যা করা হয়েছে। দেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে বিধি-নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ২০১৬ সালে বেশ কিছু আদিবাসীকে হত্যা করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সবচেয়ে ভয়ানক ও নৃশংস ঘটনা হচ্ছে গাইবান্ধায় পুলিশের গুলিতে ৩ আদিবাসী সাঁওতালের হত্যাকান্ডের ঘটনা।
অন্তত ৯৯ জন আদিবাসী শারীরিকভাবে নির্যাতন এবং হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং তল্লাশি অভিযানের নামে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দ্বারা একটি বৌদ্ধ বিহারসহ ২৯৭ টি বাড়িঘর তল্লাসী ও তছনছ করা হয়। ধর্মান্ধ, ভূমিদস্যু ও সেটেলারদের দ্বারা আদিবাসীদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৩ টি সামপ্রদায়িক হামলার চালানো হয়, যেখানে আদিবাসীদের বাড়িঘর ও সম্পত্তির ভাংচুর, লুটপাট ও ক্ষতিসাধন করা হয়। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধা জেলায় আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর উপসি’তিতে আদিবাসী সাঁওতালদের কমপক্ষে ২০০ বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ঘটনার একটি ভিডিওতে পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যদের আদিবাসী সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দিতে দেখা যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদিবাসী সংগঠনসমূহের আয়োজিত বিভিন্ন র‍্যালী এবং সমাবেশে বাধা প্রদানের অভিযোগ পাওযা গেছে। উদাহরণ স্বরূপ, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বেশ কিছু অনুষ্ঠানে বাধা প্রদান করেছে বলে খবর পাওয়া যায়। আদিবাসী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনসমূহের আয়োজিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ, দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বান্তবায়ন এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনের দাবিতে ২০১৬ সালের ৯ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধনসহ বেশ কিছু কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বাধা প্রদান করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১৬ ও ২০১৫ সালের আদিবাসীদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের চিত্র
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধরণ ২০১৫ ২০১৬
সিএইচটি সমতল মোট সিএইচটি সমতল মোট
গ্রেফতার ও আটক ৫২ ২২ ৭৪ ১৫২ ৯ ১৬১
হত্যা ৭ ৩ ১০ ১১ ৬ ১৭
অত্যাচার, নির্যাতন ও হুমকি ১০১ ৩৮ ১৩৯ ৭৯ ১৭ ৯৬
সাম্প্রদায়িক হামলা ৪ ১ ৫ ২ ১ ৩
বাড়িঘর ও সম্পত্তি লুণ্ঠন এবং ভাংচুর – ৮৪ ৮৪ ৯৭ – ৯৭
বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ৩ ৩২ ৩৫ ৫ ২০০ ২০৭
মিথ্যা মামলা দায়ের ১২৮ ৩১ ১৫৯ ১৪৯ ৪২ ১৯১

ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের পরিসি’তি
২০১৬ সাল আদিবাসীদের জন্য, বিশেষ করে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল আদিবাসীদের জন্য একটি কঠিন বছর। গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ সালে বাগদা ফার্মের জমি উদ্ধারের নামে স্থানীয় প্রশাসন পুলিশের সহায়তায় এবং ভাড়াটে গুন্ডাদের মাধ্যমে সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম এলাকার সাঁওতাল ও গরীব বাঙালি কৃষকদের তাদের নিজ পৈতৃক ভূমি থেকে জোর করে উচ্ছেদের অভিযান চালায়। এই নৃশংস উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় তিনজন সাঁওতাল আদিবাসীকে হত্যা করা হয় এবং আরো অনেকে মারাত্মকভাবে আহত হন। সেই সাথে আরো ১২০০ আদিবাসী পরিবারের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়, যার ফলে তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের এই ঘটনা আদিবাসীদের অসহায়ত্ব ও নিকৃষ্টতম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জ্বলন্ত উদাহরণ।
আদিবাসীদের মাঝে গভীর হতাশা থাকলেও ২০১৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের একটি সাহসী পদক্ষেপ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে এই আইন বাস্তবায়নের অন্যান্য অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এটা আশা করা যায় এই সংশোধনী পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ন্যায়সঙ্গত মালিকদের জমি ফেরত দিতে সহায়তা করবে। বিপরীতক্রমে ২০১৬ সালে ভূমি দখল, উচ্ছেদ এবং আদিবাসীদের উপর হামলা, পর্যটন কেন্দ্র ও বিওপি স্থাপনের নামে ভূমি অধিগ্রহণ, রাবার চাষের নামে অস্থানীয়দের কাছে জমির ইজারা প্রদান আশংকাজনকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়ে গেছে। ২০১৬ সালে আদিবাসীদের ভূমি অধিকারের অবস্থা খুবই উদ্বেগজনক।
এই বছর ভূমি সংক্রান্ত হামলায় ৬ জন আদিবাসীকে হত্যা করা হয়েছে যার মধ্যে সমতলের ৫ জন ও পাহাড়ের ১ জন এবং ৮৪ জনকে জখম করা হয়েছে। ক্রমাগত জমি দখলের কারণে ৩১,৬৯৯ পরিবারের জীবন ও জীবিকা হুমকির মধ্যে রয়েছে যার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৬০৬ টি পরিবার এবং সমতলের ৩১,০৯৩ টি পরিবার। এছাড়াও সমতলের আদিবাসীদের ১,২০৮ টি বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাছাড়া আদিবাসীদের ১৫,৪২৯.৯৮ একরের অধিক জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে যাদের বেশির ভাগই বিশেষ অর্থনৈতিক জোন, বিশেষ পর্যটন জোন এবং সংরক্ষিত বন প্রতিষ্ঠার জন্য। সমতলের ১,২১৬ পরিবার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ১,০৩৫ পরিবার তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের হুমকির মধ্যে রয়েছে। অধিকন্তু বছরব্যাপী আদিবাসীদের ১৭ টি বাড়িঘরে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে এবং পাহাড় ও সমতলে ভূমিকে কেন্দ্র করে ৩৭ জন আদিবাসী নারী শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন। খুবই দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বেশির ভাগ অপরাধীর কোন শাস্তি হয় নি।
বিগত ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে ভূমি দস্যুদের ভূমি আগ্রাসন বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূমি জবরদখল, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যা মামলা দায়ের ও হয়রানি, শারীরিক হামলা, আদিবাসী নারীর উপর যৌন হয়রানি এবং নিহতের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উচ্ছেদের হুমকির সম্মুখীন পরিবারের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় একই রয়ে গেছে। কিন্তু বছর শেষে নভেম্বরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সংঘটিত পূর্বপরিকল্পিত হামলা আদিবাসীদের ভূমি বিষয়ক মানবাধিকার পরিস্থিতিতে এক উদ্বেগজনক মাত্রা যোগ করেছে।
২০১৬ সালে সংগঠিত আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ভূমি বিযয়ক মানবাধিকার লঙ্ঘন
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধরণ সিএইচটি সমতল মোট
বাড়ীঘরে অগ্নিসংযোগ – ১২০৮ ১২০৮
ভাংচুর, লুটপাট ৭ ১০ ১৭
আহত ২ ৮২ ৮৪
নিহত ১ ৫ ৬
ধর্ষণ/ যৌন হয়রানি ৮ ২৯ ৩৭
জীবন ও জীবিকা হুমকির সম্মুখীন ৬০৬ ৩১০৯৩ ৩১৬৯৯
উচ্ছেদ ১২১৬ ১২১৬
উচ্ছেদের আশংকা ৩১ ১০০৪ ১০৩৫
ভূমি দখল ২৩৩৩.৯৮ ১৩০৯৬ ১৫৪২৯.৯৮
মিথ্যা ও সাজানো মামলা ৫৮ ৪০০ ৪৫৮
গ্রেফতার ৯ ৪ ১৩
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দখল/ দখলের আশংকা ১ ৪ ৫

আদিবাসী নারী ও শিশুদের অধিকারের অবস্থা:
২০১৬ সালে সারাদেশে আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি ৫৩টি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটেছে। সংঘটিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৮টি পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং ২৫টি সমতলে সংগঠিত হয়েছে। পুরো বছর জুড়ে ৫৩টি ঘটনায় ৫৮ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যার মধ্যে ৬ জন আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুকে হত্যা ও ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুসারে জানা যায়, ১৭ জন আদিবাসী নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার, ৯ জন গণধর্ষণের শিকার এবং ১০ জন নারী ও কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়াও ৮ জন শারীরিক লাঞ্ছনা, ২ জন যৌন হয়রানি এবং ৬ জন আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশু অপহরণ ও অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। সংঘটিত ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ৮৫% ঘটনা অআদিবাসী কর্তৃক এবং ১৩% আদিবাসী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। তবে এটা উদ্বেগজনক যে, ২% ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। ঘটনার শিকার নারী ও শিশুদের বয়স ৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সের মধ্যে। ঘটনার শিকার বেশির ভাগ ভিকটিম হচ্ছে শিশু এবং যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। সংগঠিত ৫৩ টি ঘটনায় ৩০ জন ভিকটিম পার্বত্য চট্টগ্রামের এবং ২৮ জন সমতলের।
তবে এটা ঠিক যে, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কিছুটা কমেছে। ২০১৫ সালে সারাদেশে ৬৯ টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে যেখানে ৮৫ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন’ ২০১৬ সালে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৫৩ যেখানে ৫৮ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আদিবাসীদের মানবাধিকার বিষয়ে মূলধারার জনগোষ্ঠীদের সচেতনতা এবং আদিবাসী নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সূচনা হওয়ার কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা হ্রাস পেয়েছে বলে ধরা যায়।
মানবাধিকার সংগঠন “অধিকার”-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৬ সালে সারা দেশে প্রায় ১,০২৮ জন নারী ও শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হন তার মধ্যে ৭৫৭ জন ধর্ষণ এবং ২৭১ জন শারীরিক ও যৌন হয়রানির শিকার হন। যদি ১,০২৮ জন ভিকটিমকে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর ধরা হয় তাহলে অধিকার ও কাপেং ফাউন্ডেশনের মোট ভিকটিমদের মধ্যে ৫.৭% হচ্ছে আদিবাসী নারী যেখানে বাংলাদেশের আদিবাসীরা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.৮%। অন্যদিকে অবশিষ্ট ৯৪.৩% ভিকটিম হচ্ছে বাঙালি নারী যারা দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৮.২%। এ পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার যে, বাঙালি নারীদের চেয়ে আদিবাসী নারীদের যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার অনুপাত বেশি। জাতিগত ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণেই আদিবাসী নারীরা যৌন সহিংসতার সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে বলে বলা যায়।

আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সহিংসতার চিত্র (২০০৭-২০১৬)
গাল ধর্ষণ/ গণ ধর্ষণ ধর্ষণের পর হত্যা শারীরিক নির্যাতন ধর্ষণ চেষ্টা অপহরণ যৌন হয়রানি পাচার মোট
২০০৭ ৫ – – ৩ ১ – ৯
২০০৮ ৩ ১ – – – – ৪
২০০৯ ২ ৪ ৬ ৩ ১ – ১৬
২০১০ ৭ ৫ ৬ ৫ ২ – ২৫
২০১১ ১১ ৭ – ৮ ৫ – ৩১
২০১২ ১৭ ৭ ৩৬ ১৩ ২ – ৭৫
২০১৩ ১৫ ৪ ১৬ ৯ ৫ ১০ ৮ ৬৭
২০১৪ ২১ ৭ ৫৮ ২২ ১০ ৪ ০ ১২২
২০১৫ ২৮ ৩ ২১ ১৭ ৫ ৯ ২ ৮৫
২০১৬ ২৬ ৬ ৮ ১০ ৬ ২ ০ ৫৮
মোট ১৩৫ ৪৪ ১৫১ ৯০ ৩৭ ২৫ ১০ ৪৯২

২০১৬ সালের রিপোর্টে এটা স্পষ্ট যে, সমতলের আদিবাসী নারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নারীদের অপেক্ষা বেশি সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তারা সহিংসতার শিকার হিসেবে সহজেই টার্গেটে পরিণত হন। সরাসরি শারীরিক ও যৌন নিপীড়ন ছাড়াও সহিংসতার অন্য ক্ষেত্র হচ্ছে মানসিক নির্যাতন/সহিংসতা, আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুর বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ, পারিবারিক নির্যাতন/সহিংসতা ইত্যাদি, যেগুলো খুব একটা প্রকাশিত হয় না বা আলোচিত হয় না। আলোচিত হলেও ব্যাপক আকারে হয় না।
২০১৬ সালের আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এটা উঠে এসেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নারীদের মাতৃ মৃত্যুহার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীরা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। পাহাড়ে অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ না থাকার কারণে প্রতি বছর অনেক আদিবাসী নারী মারা যাচ্ছে।

যুব, শিশু এবং শিক্ষার অধিকারের বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশের আদিবাসীদের সামগ্রিক পরিস্থিতি যে পরিমাণে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে, তার চেয়েও আদিবাসী শিশু, যুব ও তাদের শিক্ষার অধিকারের চিত্র খুবই নাজুক। আদিবাসী যুব এবং শিশুদের শিক্ষার অধিকারের ইস্যুটি প্রায় উপেক্ষিত। এ নিয়ে খুব বেশী আলোচনাও করা হয় না এবং এই বিষয়ে পৃথক ও বস্তুনিষ্ঠ তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এ কারণে দেশের আদিবাসী শিশুদের মানবাধিকার পরিসি’তি বিশ্লেষণ করা কষ্টসাধ্য। তবে পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের আদিবাসী শিশুরা দুই ধরনের অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়- প্রথমত আদিবাসী হিসেবে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হয়, দ্বিতীয়ত শিশু হিসেবে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার সনদের অনুস্বাক্ষরকারী হলেও প্রতিনিয়ত আদিবাসী শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন করা হয়। জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটির বাংলাদেশের উপর নিয়মিত পর্যালোচনায় পরিস্থিতির চিত্র করুণভাবে ফুটে উঠেছে। শিশু অধিকার সনদের (ঈজঈ) অনুচ্ছেদ ৩০ অনুসারে “যেসব দেশে জাতিগত, ধর্মীয় কিংবা ভাষাগত সংখ্যালঘু কিংবা আদিবাসী সমপ্রদায়ের জনগণ রয়েছে সমাজের অন্যান্যদের সাথে নিজ সংস্কৃতি বজায় রেখে, ধর্মের অভিব্যক্তি প্রকাশ এবং চর্চা করা অথবা নিজ ভাষা ব্যবহারের প্রয়োগে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।” এই অনুচ্ছেদে সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ভাষার অধিকারকে নিশ্চয়তা দেয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে আদিবাসী শিশুরা প্রায়ই এই ইস্যূতে বৈষম্যের শিকার হয়।
শিশুদের ন্যায় আদিবাসী যুবরাও বয়সভিত্তিক নির্দিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয় প্রথমত আদিবাসী হিসেবে এবং দ্বিতীয়ত যুব হিসাবে। আদিবাসী যুবরা সামগ্রিকভাবে আদিবাসী বিষয়ক বিভিন্ন ইস্যুতে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে বিধায় তাদের মানবাধিকার প্রায়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বিশেষ করে আদিবাসীদের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে যুবরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৬ সালে আদিবাসী যুবরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে যা মানবাধিকার রিপোর্টের অন্য অধ্যায়ে (অধ্যায় ৪: আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুর মানবাধিকার পরিস্থিতি) দেখানো হয়েছে।
আদিবাসী শিশু ও যুবদের অধিকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিশ্র উন্নয়ন হলেও তাদের শিক্ষা অধিকার বছর জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সরকার বার বার এ বিষয়ে পরিবর্তন আনার জন্য তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সরকারি প্রতিনিধিদের অনেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় মাতৃভাষা ভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু এবং এই বিষযে উদ্যোগ গ্রহণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। যদিও এই ধরনের ইতিবাচক উন্নয়ন বছরব্যাপী সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু সরকারের কিছু উদ্যোগ শিশু ও যুবদের শিক্ষা অধিকারকে লঙ্ঘন করে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ ঃ বর্তমান অবস্থা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ
রাজনৈতিক ও শান্তির্পূণ উপায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট সমাধান করার লক্ষ্যে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারগুলোর সঙ্গে একযুগ ধরে সংলাপের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর র্পাবত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওযার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতির কার্যত এখনো তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং কিছু বাস্তবায়নও করেছে যেমন- পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ১৯৯৮ প্রণয়ন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ যা ১৩ দফা সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়েছে; অন্তর্বর্তীকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন; ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে জুম্ম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন; প্রায় ১০০ টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার (সরকারের দাবি প্রায় ২০০ টি ক্যাম্প); পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স গঠন ইত্যাদি অন্যতম।
তবে চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য কোন কার্যকর উদ্যোগ চুক্তির ১৯ বছর পরেও গ্রহণ করা হয়নি। মূল বিষয়গুলো এখনও অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে, যেগুলোর মধ্যে উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করার জন্য আইনি ও প্রশাসনিক রক্ষাকবচ গ্রহণ করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে ক্ষমতা ও কার্যাবলী হস্তান্তর ও কার্যকর করা, তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা বিধিমালা এবং নির্বাচন বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবংতিন পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা, সময় সীমা নির্ধারনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সব অস্থায়ী ক্যাম্প এবং “অপরেশন উত্তরণ” প্রত্যাহার করা, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু জুম্মদের জমি ও বসতবাড়ি প্রত্যর্পনসহ পুনর্বাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য পুলিশ আইন, পুলিশ রেগুলেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য সকল আইন সংশোধন করা অন্যতম।
র্দীঘ সময় আলাপ আলোচনার পর ২০১৬ সালের আগস্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারাগুলো সংশোধন করা হয়েছে। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কাজ শুরু করেছে কিন্তু ভূমি সম্যসা সমাধানে ভূমি কমিশনের যথাযথ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের সীমিত উদ্যোগ এ কমিশনের কাজ কতটুকু এগুতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ভূমি কমিশনের সীমিত তহবিল, লজিস্টিক এবং মানব সম্পদ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। নভেম্বর ২০১৬ সালে ভূমি কমিশন কার্যালয় থেকে ভূমি কমিশনের সচিব বদলী করার পর এখন মাত্র দুজন কর্মী নিয়ে অফিসের কার্যক্রম চলছে। এমনকি কমিশনের দৈনন্দিন কাজের জন্য কোনো তহবিল ও বাজেট নেই। সরকার এখনো পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার দুটি শাখা অফিস স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কমিশনের কার্যবিধিমালা এখনো প্রণয়ন করা হয়নি। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একটি খসড়া বিধিমালা জমা দিলেও খসড়া বিধিমালা অনুমোদন ও চূড়ান্তকরণে তেমন অগ্রগতি লাভ করেনি। কার্য বিধিমালা ছাড়া ভূমি বিরোধ শুনানি এবং সেইসাথে কমিশনের বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা ভূমি কমিশনের জন্য কঠিন হবে।
উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ও পরামর্শ না করে সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় সরকার কর্তৃক গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওযার আগে, যেমন গুইমারা উপজেলা, সাজেক থানা এবং বটতলী ইউনিয়ন গঠন ও স্থাপনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। জনসাধারণের স্বার্থ পরিপন্থী বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম যেমন, তিন পার্বত্য জেলায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, থেগামুখে স্থলবন্দর, স্থানীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং পর্যটন কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে বিলাসবহুল পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ, সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা রির্জাভ ফরেস্ট ঘোষণা, বিজিবি বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি) স্থাপন ইত্যাদি পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
টাস্কফোর্স গঠনের পর বর্তমান মহাজোট সরকারের (২০০৯-২০১৬) ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস’ জুম্ম পরিবার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্যদের পুনর্বাসন ও উন্নয়নের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। সরকার এখনও আগের নীতি বজায় রেখে সেটেলার বাঙালিদের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের নীতি অব্যাহত রেখেছে যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী ও বিরোধাত্মক। ফলস্বরূপ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ১৯ বছর পরেও আদিবাসী জুম্মদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়ে আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য