চুনারুঘাটে চা শ্রমিকদের ভূমি রক্ষার সাংস্কৃতিক উৎসব

চুনারুঘাটে চা শ্রমিকদের ভূমি রক্ষার সাংস্কৃতিক উৎসব

চুনারুঘাটে অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের জন্য ৫১২ একর ফসলি জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার রক্ষায় দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সংগঠন ‘সর্বপ্রাণ সাংস্কৃতিক শক্তি’ গতকাল শুক্রবার এক অনন্য উৎসব ‘প্রানের পরব’ আয়োজন করেছিলেন। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চান্দপুর ও বেগমখান চা বাগানে বসেছিল মিলনমেলা। সর্বপ্রাণ সাংস্কৃতিক শক্তির এ উৎসবে ছিল নাচ, গান, ছবি আঁকা, নাটক পরিবেশনাসহ নানা আয়োজন।
প্রায় দেড় বছর আগে চুনারুঘাটের বেগমখান ও চান্দপুর চা বাগান এলাকায় এ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। চা শ্রমিকরা দাবি করে, এ জমি তাদের মায়ের মতো। প্রায় দেড় শ বছর ধরেই সামান্য আয়ের এসব চা শ্রমিক এ জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদ করে জীবিকা রক্ষা করে আসছে।
জমি অধিগ্রহণের পরেই তারা এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে।দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠন, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকসহ সংস্কৃতিকর্মীরা এ আন্দোলনে সংহতি জানায় ।এরই ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতিকর্মীদের সংগঠন সর্বপ্রাণ সাংস্কৃতিক শক্তির সহায়তায় চা বাগান ভূমি রক্ষা কমিটি ও চা জনগোষ্ঠী ভূমি অধিকার ছাত্র-যুব আন্দোলন দিনব্যাপী এ সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করে।
চান্দপুর চা বাগানের ফুটবল মাঠে সকাল ১০ টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনভর উৎসবের। বক্তব্য দিয়ে উদ্বোধনের সূচনা করেন কবি ও শিল্পী কফিল আহমেদ। চা শ্রমিক পরিবারের শিশুরা মাঠে মুক্তিযুদ্ধের উপর এবং তাদের ধানের জমি কেড়ে নেওয়া নিয়ে নাটিকা প্রদর্শন করে।
এরপর চা শ্রমিকদের আন্দোলনের ওপর মাহমুদা খাঁ, মোহন রবিদাস, সাইফুল ইসলাম রনি, শিরিন মাহমুদ, মেহেদী হাসান, ফায়হাম ইবনে শরীফ, খায়রুল ইসলাম, জুয়েল শেখ, মোহাম্মদ রফিক, আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি, মাহফুজ শাহরিয়ার ও সবুজ সরকারের তোলা ছবি নিয়ে চান্দপুর চা শ্রমিকদের নাচঘরে আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়।
নাটমন্দির চত্বরে ২০ বাই ১৩ ফুটের বিশাল ক্যানভাসে ছবি আঁকেন একদল শিল্পী। ছবিতে দেখা যায়, আকাশের তারাদের ভিড়ে এক ভয়ংকর প্রকৃতির টাই পরা লোকের দিকে তীর ছুড়ে মারছে চা শ্রমিকরা। চা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে প্রতীকী এ ছবি আঁকেন শিল্পী ধীমান, নাসির, লিসা, মনিরুজ্জামান শিপু, সামান্তা, জাহিদসহ ১৫-১৬ জন শিল্পী।
দুপুর ১টার দিকে প্রতিবাদী শোভাযাত্রা বের হয়। লস্করপুর ভ্যালির ২৩টি চা বাগানের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক ও শিশু এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সংস্কৃতিকর্মীদের এ শোভাযাত্রা চান্দপুর চা বাগান এলাকা থেকে প্রস্তাবিত স্পেশাল ইকোনমিক জোন এলাকায় গিয়ে থামে। চা শ্রামিকদের ঐতিহ্যবাহী তীর-ধনুক, নানা বাদ্যবাজনাসমেত এ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় সবাই ‘চান্দপুর বাজানে, ইকোনমিক জোনে, আমার মাটি কাইড়া নিছে ভূমিখেকোর দলে’ গান ধরে। ধরে স্লোগান ‘আমার মাটি আমার মা, কেড়ে নিতে দেব না’ প্রভৃতি।
বিকেলে রাধামাধব মন্দির মাঠে বসে মূল আসর। এখানেই হয় আলোচনা সভা, গান ও নাটক। নলুয়া চা বাগানের সাবেক শ্রমিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মনু তাঁতীকে শুরুতেই সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সাধন সাঁওতালের সঞ্চালনায় একে একে বক্তব্য দেন চা শ্রমিকদের নেতা অভিরত বাকতি, নৃপেন পাল, স্বপন সাঁওতাল, লক্ষ্মীচরণ বাকতি, সূর্য কুমার রায়, গীতা রানী কানু, মোহন রবিদাস, মুকেশ কর্মকার প্রমুখ। সর্বপ্রাণের পক্ষে বক্তব্য দেন অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, কবি ও সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ, মাহা মির্জা, আহমেদ মুনিরুদ্দিন তপু প্রমুখ।
মঞ্চে গান করেন কফিল আহমেদ। এ ছাড়া সমগীত, সহজিয়া, চিৎকার, মনোসরণী, মাদল ও বেতাল প্রতিবাদী গান পরিবেশন করে। নাটক পরিবেশন করে ঢাকার বটতলা, তীরন্দাজ, সিলেটের নগরনাট ও চা বাগানের প্রতীক থিয়েটার। এ ছাড়া চা জনগোষ্ঠীর সংগীত শিল্পীরাও সংগীত পরিবেশন করেন। কয়েক হাজার চা শ্রমিক দিনভর উৎসব উপভোগ করে।
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ মোহন রবিদাস এবং রাকিবুল জেমস

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য