বরগুনা-পটুয়াখালী রাখাইন জনপদ সরেজমিন পরিদর্শনোত্তর নাগরিক প্রতিনিধি দলের সংবাদ সম্মেলন

বরগুনা-পটুয়াখালী রাখাইন জনপদ সরেজমিন পরিদর্শনোত্তর নাগরিক প্রতিনিধি দলের সংবাদ সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ২৯ মার্চ ২০১৭ নাগরিক প্রতিনিধি দলের উদ্যোগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বরগুনা-পটুয়াখালী রাখাইন জনপদ সরেজমিন পরিদর্শনোত্তর নাগরিক প্রতিনিধি দলের এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাগরিক প্রতিনিধিদলের সদস্য রোবায়েত ফেরদৌস এর সঞ্চালনা ও ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক ও কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ও জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে বরগুনা পটুয়াখালির রাখাইন জনপদ সরেজমিন পরিদর্শনোত্তর প্রতিবেদন পাঠ করেন নাগরিক প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ও আইইডির নির্বাহী পরিচালক নুমান আহমেদ খান।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, রাখাইনরা সভ্যতার একটি অংশ। যদি এদেশ থেকে রাখাইনরা বিলুপ্তি হয়ে যায় তবে এদেশের একটি সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। তিনি রাখাইনদের বিলুপ্তির প্রসঙ্গে বলেন, মূলধারার জনগোষ্ঠী যে হারে বেড়েছে রাখাইনরা সেহারে বাড়ে নাই। আদিবাসীদের উপর নির্যাতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের উপর যে হারে নির্যাতন হচ্ছে,সেই নির্যাতনের মাত্রা ও ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। ফলে রাখাইনরা নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়ে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আদিবাসী অধ্যুষিত জেলাগুলোতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট মর্যাদাসম্পন্ন একজন আদিবাসী বিষয়ক কর্মকর্তা নিয়োগের প্রস্তাব দেন যার কাজ হবে উক্ত জেলার আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের দুঃখ -দুদর্শার কথা শুনে পরবর্তীতে প্রতিবেদন তৈরি করবেনএবং এর প্রতিকারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। এটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি আদিবাসী সেল হিসেবে কাজ করবে।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, এদেশে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জনসংখ্যা সবকিছুই বিলুপ্তির পথে। আদিবাসীদের জনশূন্য করে দেওয়ার যে লক্ষণগুলো দেখতে পাচ্ছি,সেজন্য আমাদের ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া উচিত। তিনি নাগরিক প্রতিনিধিদের উত্থাপিত দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশনের দাবি জানান।
শামসুল হুদা বলেন, ১৯৫০ সালের প্রজাসত্ব আইনটি মূলত সমতলের আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের ভূমি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। অর্পিত সম্পত্তির খ তালিকাও ২ বছর আগে সরকার বাতিল করে। কিন্তু প্রশাসনের বিভিন্ন দুনীর্তির কারণে রাখাইনরা ভূমি হারাচ্ছে। তিনি অতিসত্বর রাখাইনদের ভূমি বেদখল রোধকল্পে ১৯৫০ সালের জমিদারী অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব ৯৭ ধারা যথাযথভাবে কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সঞ্জীব দ্রং বলেন, প্রতিবেদনে রাখাইন জনপদের যে চিত্র দেখলাম এটাই যদি বাংলাদেশের চিত্র হয়ে তাকে তাহলে এটি কখনোই গণতান্ত্রিক দেশের চিত্র হতে পারে না। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে, সরকারও ব্যাপক উন্নয়নের কথা বলছে। সেখানে একটি দেশের জনগণ ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়ার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। বিলুপ্তপ্রায় জনগোষ্ঠী বাঁচাতে এবং সমতলের আদিবাসীদের মানবাধিকার রক্ষার্থে তিনি সরকারকে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক একটি কমিশন ও ভূমি কমিশন গঠনের আহ্বান জানান।
সর্বশেষে সংবাদ সম্মেলনে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ জানানো হয়-
১. রাখাইনসহ দেশের সমতল অঞ্চলের সকল আদিবাসীদের বেহাত হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি পৃথক ভূমি কমিশন করা এবং সেই সাথে রাখাইনদের ভূমি বেদখল রোধকল্পে জেলা পর্যায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা।
২. রাখাইনদের ভূমি বেদখল রোধকল্পে ১৯৫০ সালের জমিদারী অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা যথাযথভাবে কার্যকর করা।
৩. বেদখলকৃত বৌদ্ধ বিহার, শ্মশান ও রিজার্ভ পুকুরসহ ও অর্পিত শত্রু সম্পত্তির নামে দখলকৃত জমি মুক্ত করে রাখাইন কর্তৃপক্ষের নিকট ফিরিয়ে দেয়া এবং অবৈধদখলদারীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা।
৪. বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুস্বাক্ষরিত আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী বিষয়ক আইএলও’র ১০৭ নং কনভেনশন অনুসারে রাখাইন ঐতিহ্যগতভাবে অধিকৃত ভূমির উপর ব্যক্তিগত ও প্রথাগত ভূমি অধিকার সুনিশ্চিত করা।
৫. বিকৃত করা রাখাইন পাড়ার নাম রাখাইনদের স্ব স্ব ঐতিহ্যগত নামে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা এবং রাখাইনদের ঐতিহাসিক স্থানসমুহ সহ নিজস্ব সংরক্ষিত এলাকা কোনভাবেই অধিগ্রহণ না করা। বিশেষ করে ছ’আনী পাড়া গ্রাম লাগোয়া বর্তমান পায়রা পোর্টের চলমান কর্মযজ্ঞের গ্রাস থেকে এই শত বছরের পুরনো রাখাইন গ্রাম টি রক্ষা করা।
৬. রাখাইন জনগোষ্ঠীর ভূমি সমস্যা নিরসনকল্পে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রাখাইন জনগোষ্ঠীর সাথে নিয়মিত মতবিনিময় সভার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৭. রাখাইনদের জীবন ও সম্পত্তির পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা এবং এই অঞ্চল থেকে যেন রাখাইন মানুষেরা চিরতরে হারিয়ে না যান তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৮. বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে (পটুয়াখালী, বরগুণা) বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো হল, সড়ক, সেতু বা বৃহৎ স্থাপনা বা কুয়াকাটায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রর নাম ভাষাসৈনিক উস্যুয়ের নামে করা।
বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে নাগরিক প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা, আইইডি’র নির্বাহী পরিচালক নুমান আহমেদ খান, দৈনিক সমকালের প্রতিবেদক রাজীর নূর, গবেষক ও প্রাণবৈচিত্র্য কর্মী পাভেল পার্থ, দৈনিক ভোরের কাগজের প্রতিবেদক তানভীর আহমেদ, নিউ এইজের প্রতিবেদক ইমরান হোসেন ইমন, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সহ সভাপতি সোনা রাণী চাকমা, মানবাধিকার কর্মী রওশন মাসুদা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, ফিল্ম মেকার লতা আহমেদ প্রমুখ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য