আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক গণশুনানী

আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক গণশুনানী

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ২৮ মার্চ ২০১৭, রাজধানীর সিবিসিবি মিলনায়তনে আইইডি’র উদ্যোগে “আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক গণশুনানী”র আয়োজন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় এবং অনুষ্ঠানের সভাপ্রধান আইইডির নির্বাহী পরিচালক নুমান আহম্মদ খানের স্বাগত বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন আইইডির অলি কুজুর। সহিংসতার শিকার হওয়া আদিবাসী নারী বিচিত্রা তির্কি, রবি সরেন, দ্বীজেন টুডু, অলিভিয়া হেমব্রম, উজ্জ্বল পাহান, শ্যামল পাহান, রবীন্দ্রনাথ হেমব্রম ও ললিতা বাস্কে তাদের সহিংসতার শিকার ও বর্তমান অবস্থার কথা জানান। সমস্যা ও ইস্যুভিত্তিক আলেচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, ও জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম। আইনজীবি হিসেবে মতামত রাখেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সৃজনী ত্রিপুরা। পর্যবেক্ষক হিসেবে বক্তব্য রাখেন দৈনিক সংবাদের সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য এবং অতিথি হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন এমপি নাজমুল হক প্রধান প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার মাত্র ৪৬ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি সাধন করলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ধারণ করে বাঙালী সহ অপরাপর ৫৪ টির মত আদিবাসী সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে উন্নিত হতে পারেনি। বহুত্ববাদী সমাজের পরিবর্তে ক্রমশ একত্ববাদী সমাজের দিকে ধাবিত হয়েছে । আদিবাসীদের ভূমি বেদখল করতে রাষ্ট্র, সরকার ও ধর্মকে ব্যবহার করে কতিপয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বর্তমান সরকারও রুপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সকল জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্র (এমডিজি) অর্জনের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ কর্তৃক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-২০৩০ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে দেশের জাতি, বর্ণ, ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। বক্তারা আদিবাসীদের মানবাধিকার রক্ষায় সরকারের নীতিনির্ধারক, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সামাজিক শক্তিসমূহের সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণ, সঠিক বিচার ও দোষীদের যথাযথ শাস্তিপ্রদানসহ বাঙালী জনগোষ্ঠীর মনোগঠণ, সংবেদনশীলতা ও মেলবন্ধনের প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন।

আইনজীবির মতামত জানাতে গিয়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সৃজনী ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসীদের উপড় ক্রমাগত নির্যাতন, নিপীড়নের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান করা হলে এই সহিংসতার পরিমাণ কিছুটা হলেও কমবে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বিচারবিভাগকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে। জনপ্রতিনিধিরা যদি রক্ষক হয়ে ভক্ষকের আসনে আসিন হয় তাহলে তাদেরকে জনপ্রতিনিধির আসন থেকে নামিয়ে বিচারের আওতায় নিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়াও তিনি আদিবাসীদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন বন্ধের নিমিত্তে আইনবিভাগের মাধ্যমে আইন প্রণয়নসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানান।

লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আদিবাসীরা সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, তারা দুর্বলের ভিতরেও দুর্বল। শান্তিপ্রিয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বহুজাতির, বহুবর্ণের এ দেশের জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে, সামগ্রিক কল্যাণের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে আদিবাসীদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আদিবাসীরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায মামলা বর্তমানে অত্যাচারের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আদিবাসীদের উপর চলমান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সকলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন।

নুমান আহমেদ খান বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের আদিবাসীদের উপড় বৈষম্যগুলো মিডিয়ায় নিয়ে আসা দরকার। পাহাড় ও সমতলে এমন কোন আদিবাসী পরিবার নেই যারা মিথ্যে মামলায় জর্জরিত নন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য জাতিগত, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যর সংরক্ষণে যথাযথ আইন প্রণয়ন করা জরুরী বলেও উল্লেখ করেন।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, শাসকগোষ্ঠী আদিবাসীদের মামলায় জর্জরিত করে ভূমি থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে দেশান্তরী করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে । দালালী, স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সৃষ্টির মাধ্যমে আদিবাসীদের মধ্যেকার ঐক্য বিনষ্ট করার পাঁয়তার চালাচ্ছে । তিনি এ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য। ধর্মকে নির্যাতন নিপীড়নের হাতিয়ার বানিয়ে আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব প্রতিনিয়ত ধ্বংসের মুখে ফেলে দিচ্ছে শাসক গোষ্ঠী। নব্য পাকিস্থানী মনোভাবের উত্থানে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা আজ ভুলন্থিত হওয়ার পথে। আদিবাসীরা তাদের সম্মান মর্যাদা রক্ষায় মরতে পারে, তারা বাঁচার জন্য মরতে জানে বলেও উল্লেখ করেন। তিনি অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণে গনজাগরণের আহ্বান জানান।

এমপি নাজমুল হক প্রধান বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় বিশ্বাসী তারা কখনো আদিবাসীদের উপর নির্যাতন করতে পারেনা। আদিবাসী-বাঙালীর সমন্বয়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি সুন্দর, প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য