‘আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা: পরামর্শ ও প্রস্তাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন

‘আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা: পরামর্শ ও প্রস্তাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতি, বাংলাদেশ সারি সারনা গাঁওতা, জাগকে উঠুক মুন্ডা ও আদিবাসী সাংস্কৃতিক পরিষদ ‘আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা: পরামর্শ ও প্রস্তাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন আজ বিকাল ৩টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সম্প্রসারিত মিলনায়তন, সেগুন বাগিচা, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, জাগকে উঠুক মুন্ডার সবিন চন্দ্র মুন্ডা, নরেন পাহান, আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি এডভোকেট গনেশ সরেন, বাংলাদেশ সারি সারনা গাঁওতার রবীন্দ্রনাথ হেমব্রম, গনেশ মার্ডি, নরেশ হেমব্রম, আদিবাসী ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের খোকন সুইটেন মুরমু, মানিক সরেন, হুরেন মুরমুসহ সমতলের আদিবাসী নেতৃবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে সংহতি জানান বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা খালেকুজ্জামান রতন; সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক রুহীন হোসেন প্রিন্স; সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক প্রমুখ।

রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, আদিবাসীদের মাতৃভাষায় সরকারীভাবে শিক্ষাদানে প্রচুর জটিলতা দেখা যাচ্ছে। এখানে সাঁওতালদের ক্ষেত্রে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা যারা করছে না বরং বিরোধিতা করছে তারাই আজকে রোমান বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছে। অপরদিকে প্রকৃত আদি সাঁওতালরা সরকারীভাবে বাদ পড়ে যাচ্ছে। তিনি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সাঁওতালি ভাষায় প্রথমত বাংলা হরফে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সাঁওতালদের নিজস্ব হরফ অলচিকির মাধ্যমে শিক্ষাদান চালুর দাবি জানান।

খালেকুজ্জামান রতন বলেন, মুন্ডা সাঁওতাল থেকে আজকের বাঙ্গালি জাতি। বাংলার সাথে এদের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। তাই বাংলা হরফে তাদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নটাই ন্যায়সঙ্গত হবে। তবে পাশাপাশি যাদের নিজস্ব লিপি আছে তাদের ঐ লিপিতেই পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ণ করা উচিত।

রুহীন হোসেন প্রিন্স বলেন, যেকোন জাতিকে উন্নয়নের সাথে এগিয়ে যেতে হলে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প নেই। সুতরাং যে বর্নমালার সাথে আদিবাসীদের নিজস্ব সংষ্কৃতি ঐতিহ্য রীতি নীতির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে সেই লিপিতেই আদিবাসীদের ভাষায় বই ছাপানো হোক। শুধু প্রাক প্রাথমিক শিক্ষাই নয় গবেষণা এবং উচ্চতর শিক্ষায় আদিবাসী ভাষায় করার দাবি জানান।

এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সাঁওতালি ভাষা কোন লিপি বা হরফে লেখা হবে তা নিয়ে বাংলাদেশে এখনো বিতর্ক বিদ্যমান। যার ফলে সাঁওতাল শিশুদের জন্য আজও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ সম্ভব হয়নি। যা এদেশের সবচেয়ে সংখ্যাধিক্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিশুকে নিজ মাতৃভাষায় পড়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। পাশাপাশি সাদরি ভাষাভাষী শিশুদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের কথা গত বছরের শেষের দিকে সংবাদপত্র মারফত জানলেও কোথাও এই পর্যন্ত কোন বই বিতরণ এর খবর আমরা শুনিনি। এদিকে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন মুন্ডা, উরাও, মাহাতো, মালো, সিং, রাজোয়াড়, তুরী ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীরা সকলেই সাদরি দিয়ে কথা বললেও তাদের প্রত্যেকের সাদরি ব্যবহারে বেশ কিছু সূক্ষ প্রার্থক্য রয়েছে। ফলে সাদরি ভাষায় একটি বই দিয়ে এসব জাতিগোষ্ঠীর সকল শিশুকে পড়ানো সম্ভব হবে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নিলে আদিবাসীদের মধ্যে আশার আলো জেগে উঠেও সঠিক বাস্তবায়নের অভাবের কারনে সেই আলো প্রায় নিভু নিভু। বর্তমানে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগটি নিয়ে নানা হতাশা ও শঙ্কা বিরাজ করছে।

মুন্ডা, উরাও, মাহাতো, মালো, সিং, রাজোয়াড়, তুরী ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য সাদরি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে অনেক বেশী সাবধানতার প্রয়োজন আছে কেননা সাদরি একটি মিশ্র ভাষা বা লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্কা। সাদরি ভাষায় উর্দু, হিন্দি, মৈথিলী ও বাংলা ভাষার মিশ্রণ ঘটেছে। লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্কার সমার্থক শব্দ হলো বাহক ভাষা বা সংযোগকারী ভাষা, যা বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের মধ্যে যোগাযোগের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাহলে এখানে প্রশ্ন হচ্ছে ‘সাদরি’ ভাষায় মুন্ডা, উরাও, মাহাতো, মালো, সিং, রাজোয়াড়, তুরী ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের একই রকম বই ছাপালে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে। এখানে অনেক উরাও জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা দাবি করেছেন তাদের নিজেদের মাতৃভাষা কুড়–খ ও সেই ভাষার লিখিত রূপ তলং সিকি থাকার পরেও সরকার কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই তাদের জন্যও সাদরি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

সুপারিশসমূহ:

১. বাংলা বর্ণমালায় লিখতে-পড়তে অভ্যস্ত সাঁওতাল কিষাণ-কিষানী, দিনমজুর, শিক্ষার্থী সমাজের দিকে তাকিয়ে ও রোমান বর্ণমালার আগ্রাসন থেকে সাঁওতালি ভাষাকে রক্ষার্থে সাঁওতালি ভাষার জন্য শুরুতে বাংলা বর্ণমালা ও পাশাপাশি অলচিকি বর্ণমালায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান চালু করতে হবে;
২. মুন্ডা, উরাও, মাহাতো, মালো, সিং, রাজোয়াড়, তুরী ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীদের জন্য রচিত সাদরি ভাষার বই সতর্কতরা সাথে প্রণয়ন এবং তা যথাযথভাবে বিতরণ করতে হবে;
৩. আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ ও প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোতে (পিটিআই) মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা বিষয়ে বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক পদায়ন করতে হবে;
৪. আদিবাসীদের মাতৃভাষার বইগুলো আদিবাসী সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতি, নীতি, মূল্যবোধের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে;
৫. জাতীয় বাজেটে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা খাতে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করতে হবে;
৬. মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্ব স্ব আদিবাসী জাতির ভাষায় উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি গঠনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে;
৭. জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন ও আদিবাসীদের ভাষাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাষা বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে;
৮. আদিবাসী ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা বিষয়ে অব্যাহত গবেষণা পরিচালনার জন্য সরকার কর্তৃক প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা এবং সম্ভব হলে এই কার্য সম্পাদনের জন্য একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান/ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে;
৯. পার্শ্ববর্তী ভারত, নেপালের মতো আদিবাসী অধ্যুষিত দেশসমূহে বহুভাষিক শিক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এর জন্য প্রতিনিধি প্রেরণ করতে হবে;
১০. সরকারিভাবে শুরু করার ক্ষেত্রে কোন জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রিতার সম্ভাবনা (আর্থিক, জনবল ইত্যাদি) থাকলে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে পাইলটিং শুরু করা। পরে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারিভাবে তা শুরু করা যাবে।
১১. সমতলের আদিবাসীদের ভূমি রক্ষার্থে একটি স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে;
১২. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।

এদিকে, আজ সকাল ১১টায় ঢাকা মহানগরীর মিরপুর-২ এ অবস্থিত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাল্টি পারপাস হলরুমে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে সাঁওতালদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ সম্পর্কীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে খুব সাঁওতালদের মধ্যে ১১ জন প্রতিনিধিকে চিঠি দিয়ে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। যার মধ্যে মাত্র ২ জন ছিলেন সারি সারনা (প্রকৃতির উপাসক) সাঁওতাল এবং ৯ জনই ছিলেন খ্রিস্টান সাঁওতাল (সংযুক্তি ১)। এখানে খ্রিস্টান সাঁওতালরা রোমান হরফে এবং সারি সারনা সাঁওতালরা বাংলা ও অলচিকি হরফে সাঁওতালি ভাষায় শিক্ষা চালুর দাবি জানিয়েছে।

1 comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

1 Comment

  • মাইকেল মধুসূদন মুরমু
    অক্টোবর ৩১, ২০১৯, ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ

    মিথ্যাচার করার একটা সীমা আছে । মন্ত্রনালয়ে কে সান্তাল সংস্কৃতি লালন করে আর কে করেনা সেটা তো সবাই দেখলো , রবীন্দ্রনাথ সরেন আর মানিক সরেন রা স্বীকার করে নিয়েছেন , তারা সান্তালি সূরের মাদল বাজাতে পারদর্শী নয় । তারা সান্তালি সুরের গান গাইতে পারদর্শী নয় । অথচ সেখানে রোমান পক্ষের গৌরবের সাথে আর বেশ সুন্দর সূরের সাথে সান্তালি সংস্কৃতি লালনের কথা বলে গেল । একজন তো শিক্ষা নিয়ে একটা সুন্দর সান্তালি গান সকলকে শুনিয়ে দিল । যেখানে বাংলা অলচিকি রা পারেনি । তাহলে তারা কিভাবে সংবাদ সম্মেলন করে , এমন ভূলে ভরা বক্তব্য দিল। কেন তারা দেশের জনগনকে বিভ্রান্তি করছে । কেন তারা সংবাদ মাধ্যম গুলোকে মিথ্যাচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে । এতে করে তো সাংবাদিক দের ইমেজটাই বরং নষ্ট হচ্ছে ।

    REPLY

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য