ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) সুপারিশসমূহের আলোকে বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার- বাবলু চাকমা ও মানিক সরেন

ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) সুপারিশসমূহের আলোকে বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার- বাবলু চাকমা ও মানিক সরেন

১. ভূমিকা: ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের একটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া যা জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রক্রিয়ার অধীনে বর্তমানে পাঁচ বছর অন্তর অন্তর জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ নিজ নিজ রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার সুযোগ পায় এবং সেটির আলোকে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নতিকরণে এবং নাগরিকদের প্রতি মানবাধিকারের দায়দায়িত্ব পরিপূরণে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ ঘোষণার সুযোগ পায়। ইউপিআর তুলনামুলকভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের একটি নতুন এবং অধিক কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে মানবাধিকার পরিস্থিতিকে উন্নীত করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে ইউপিআর বা সার্বজনীন পুনর্বীক্ষণ পদ্ধতি এর আওতায় ২০০৯ সালে এবং ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা করা হয়। দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে আদিবাসী প্রতিনিধিরাও ইউপিআর ব্যবস্থার দুটি অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে এবং ছায়া প্রতিবেদন পেশ করে। আগামী ২০১৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর তৃতীয় চক্রের যে রিভিউ হবে সেখানেও দেশের বিভিন্ন সুশীল সামাজিক সংগঠনের ছায়া প্রতিবেদনে আদিবাসীদের মানবাধিবারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি কাপেং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গঠিত ৩০টি আদিবাসী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ইউপিআর কোয়ালিশন এর মাধ্যমে আদিবাসীদের পক্ষ থেকে ইউপিআর ফোরামে প্রতিবেদন পাঠানোর কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
২. বাংলাদেশের প্রথম রিভিউ (২০০৯)
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনার জন্য ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ ইউপিআর চালু করে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের মানাবধিকার পরিস্থিতি রিভিউ সময়সূচি নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের প্রথম রিভিউ কালীন সময়ে (৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সরকারকে মোট ৪৫টি সুপারিশ প্রদান করা হয়। এরপর জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের একাদশ অধিবেশনের (১০ জুন ২০০৯ এ অনুষ্ঠিত, agenda item 6, A/HRC/11/18/Add.1) পর বাংলাদেশ ৩৫টি সুপারিশ গ্রহণ করে, ৪টি সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে এবং ৬টি সুপারিশের কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান থেকে বিরত থাকে। গৃহীত সুপারিশসমূহের মধ্যে দুইটি সুপারিশ সরাসরি আদিবাসী বিষয়ের সাথে যুক্ত ছিল। সেগুলো হলো:
আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠী সংক্রান্ত ‘আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯’ অনুস্বাক্ষর অথবা সম্মতি জ্ঞাপন (সুপারিশ ২, মেক্সিকো)।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়সূচি নির্ধারণ (সুপারিশ ৩৪, নরওয়ে এবং অস্ট্রেলিয়া)
এখানে উল্লেখ্য যে আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ অনুস্বাক্ষরের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমণি বলেন- আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ বাংলাদেশের সংবিধানের বিধানাবলী বিবেচনা করে অনুস্বাক্ষর করার বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। যদিও আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ এখনো স্বাক্ষরিত হয়নি, তবে আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে।
৩. বাংলাদেশের দ্বিতীয় রিভিউ (২০১৩)
২০১৩ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় পুনর্বীক্ষণকালীন সময়ে (২৯ এপ্রিল) জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ষোড়শ (১৬তম) অধিবেশনে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশ সরকারকে ১৯৬টি সুপারিশ দেয়। এরমধ্যে মোট ১৭১টি সুপারিশ সরকার গ্রহণ করে, ৬টি সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে এবং ১৯টি সুপারিশের কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান থেকে বিরত থাকে। যার মধ্যে সরাসরি আদিবাসীদের মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট সুপারিশগুলো ছিল:

ক. আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠী সংক্রান্ত ‘আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯’ অনুস্বাক্ষর করা (সুপারিশ ১৩০.৫, মেক্সিকো)।
খ. আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি সংরক্ষণ এবং তাদের নিজেদের উন্নয়নের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম করে তোলার লক্ষ্যে প্রণীত ‘আইএলও কনভেনশন ১৬৯’ স্বাক্ষর করা (সুপারিশ ১৩০.৬, ডেনমার্ক)
ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা (সুপারিশ ১২৯.১৫১, জিবুতি)
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া (সুপারিশ ১২৯.১৫৩, অস্ট্রেলিয়া এবং ইকুয়েডর)
আদিবাসী নারী ও শিশুদের ওপর সকল ধরণের সহিংসতা ও বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে সঠিক এবং কার্যকর কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন (সুপারিশ ১৩০.২৪, স্লোভাকিয়া)
শিশু, নারী, দলিত, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, উদ্বাস্তু এবং অভিভাসীদের একটি বিশেষ অবস্থানে নিয়ে এসে উন্নয়নের চেষ্টা করা এবং তাদের সমস্যা দূর করা (সুপারিশ ১৩০.২৩, ভ্যাটিকান সিটি)।
আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে সংখ্যালঘু আদিবাসীসহ সংখ্যালঘুদের রক্ষা সুনিশ্চিত করা (সুপারিশ ১৩১.২২, সুইজারল্যান্ড)।

২০১৩ সালের অধিবেশনের পৌনঃপুনিক সংলাপে কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ এ অনুস্বাক্ষর করার সুপারিশ করলে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি এই দ্বিপাক্ষিক সংলাপ প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ এর অনুসমর্থন সংবিধানের ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বাংলাদেশ একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ইতিমধ্যে সরকার তার সহযোগীদের সাথে আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ এর বাধ্যবাধকতা সমূহের বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে।
এছাড়াও অদিবাসীদের মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালের প্রথম পুনর্বীক্ষণ ও ২০১৩ সালের দ্বিতীয় পুনর্বীক্ষণকালীন সময়ে যতগুলো সুপারিশ গ্রহণ করেছে তার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি সুপারিশ সরাসরি আদিবাসীদের সাথে সম্পৃক্ত হলেও অন্যান্য অনেক ক্রস কাটিং সুপারিশগুলোতেও আদিবাসীদের মানবাধিকার বিষয়টিকে যুক্ত করা যায়।
৪. আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইউপিআর চক্রে সরকারের প্রতিবেদন ও বাস্তব পরিস্থিতি
বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইউপিআর চক্রের সময় বাংলাদেশ সরকার যে রিপোর্ট পেশ করে সেখানে আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে যেগুলো উঠে এসেছে তার সারমর্ম ও সেটির আলোকে বর্তমানের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:
আদিবাসী শিশু: বাংলাদেশ সরকার ২০০৯-১২ সালে জাতীয় শিশুনীতি, ২০১১ গ্রহণ করেছে। পরবর্তীতে জাতীয় শিশু আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০ এ আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দানের ব্যাপারটি সরকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।
বাস্তব পরিস্তিতি: বাংলাদেশ সরকার জাতীয় শিশু আইন ২০১৩ প্রনয়ণ করলেও সেখানে আদিবাসী শিশুদের উন্নয়নের ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার কাজ শুরু করে এবং এইবছর (২০১৭) থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করে। যদিও মাঠ পর্যায় থেকে অভিযোগ আছে আদিবাসী অধ্যুষিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো বই পৌঁছায়নি। অনেকগুলি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সাদরি হওয়ায় এবং তাদের প্রত্যেকের কথা বলার ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য থাকায় সাদরি ভাষার বই পড়ানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশ করা হলেও সরকারি উদ্যোগের বড় ফাঁক হচ্ছে এসব আদিবাসী ভাষার বই পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান না করা এবং কোন স্কুলে কোন আদিবাসীর জাতির কত জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে তা জরিপ না করা। ফলে বইগুলি পড়ানোর ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইতিবাচক দিক হচ্ছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তিন পার্বত্য জেলায় ইউএনডিপিভুক্ত প্রত্যন্ত অ লের ২১০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেছে।
আদিবাসী নারী: নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নারীরা যাতে নির্বাচিত (সুপারিশ ৩৭, ইউপিআর ২০০৯) হতে পারে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাস্তব পরিস্থিতি: আদিবাসী নারীদের জন্য স্থানীয় সরকার পরিষদ, জাতীয় সংসদসহ কোথাও কোন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০১১ তে আদিবাসী নারীদের উন্নয়নের বিষয়ে খুবই সীমিতভাবে উল্লেখ আছে। আদিবাসী নারীদের প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ বাংলাদেশ গ্রহণ করলেও এখনো এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি। আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রথম শিকার হচ্ছেন আদিবাসী নারীরা। আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদসহ চলমান নির্যাতন নিপীড়ণের প্রথম টার্গেট হচ্ছেন নারী ও কন্যাশিশুরা। এখন পর্যন্ত আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় কোন দৃষ্টান্তমূলক বিচারের নজীর স্থাপন না হওয়ায় আদিবাসী নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতেই আছে। ইউপিআরসহ আন্তর্জাতিক নানা ফোরামে সরকার নারীসহ সকল ধরনের সহিংসতার ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে ঘোষনা দিলেও এর বাস্তবিক প্রয়োগ হচ্ছেনা।

ছক ১: আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি সহিংসতার চিত্র
এবছরের ১০ জুন ২০১৭ তারিখ পর্যন্ত কমপক্ষে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি নানা ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে রবিদাস সম্প্রদায়ের নারী সুখিয়া রবিদাসকে প্রকাশ্য দিবালোকে ধর্ষণের পরে হত্যার ঘটনা বেশ আলোচিত হয়েছে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষক ও হত্যাকারী শাইলু মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে ও বিচার প্রক্রিয়ার আওতাধীন আছে। তবে গত ৯ জুন ২০১৭ তারিখে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল-২ এর বিচারক অতরিক্তি জেলা ও দায়রা জজ মো. জিয়াউর রহমান আদিবাসী এক নারীকে অপহরণ ও র্ধষণের দায়ে আরিফুল ইসলাম (৩০) ও জিয়াউর (৩২) নামের দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং প্রত্যকেকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন। নারীদের প্রতি যেকোন ধরনের সহিংসতার ঘটনায় এইধরনের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে আদিবাসী নারীসহ সকল নারীর প্রতি সহিংসতা অনেকখানি রোধ করা সম্ভব হবে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সংখ্যালঘু নৃতাত্তিক গোষ্ঠী: সংবিধানের প দশ সংশোধনী ধর্মনিরপেক্ষতাকে একটি মূলনীতি হিসেবে ফিরিয়ে এনেছে এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্য ধর্মের মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। বর্তমান সরকার মনে করে, ‘প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার আছে, তবে উৎসব সবার জন্য’ (সুপারিশ ২৯, ইউপিআর ২০০৯)। বাংলাদেশ ২০১২ সালের নভেম্বরে কক্সবাজার জেলার রামু ও এর নিকটবর্তী এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর আত্রমণের বিরুদ্ধে কঠোরতম অবস্থান নিয়েছে। সরকার তাৎক্ষণিকভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠনসহ এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। সংবিধানের প দশ সংশোধনীতে ২৩ক অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে যাতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, উপজাতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যে আলাদা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে সেটাকে রক্ষা এবং উন্নয়নে রাষ্ট্র ভূমিকা পালন করবে। এর অংশ হিসেবে সরকার পাহাড় ও সমতলের সকল নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্মীয় আচার ও প্রচলিত জীবনাচরণ সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ আইএলও সনদের আদিবাসী এবং উপজাতি জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত কনভেনশন নং ১০৭ অনুস্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ ১৯৮৯ সালে আদিবাসী এবং উপজাতি জনগোষ্ঠী সম্পর্কিত আইএলও সনদ নং ১৬৯ এর উপর অনুষ্ঠিত পরামর্শ সভায় অংশ নিয়েছে।
বাস্তব পরিস্থিতি: ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার “বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আ লিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের” বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে ত্রুটিপূর্ণভাবে মাত্র ২৭টি জাতির নাম উল্লেখ রয়েছে। ইতিমধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আদিবাসী প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে বাদপড়া ২৪টি আদিবাসী জাতির নাম প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু এসব জাতিসমূহের নাম উক্ত আইনে এখনো পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে বাদপড়া জাতিসমূহ নানাভাবে হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এছাড়া সরকার আদিবাসীদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়নের বিধান প্রণয়ন করলেও এসব জাতিসমূহের জাতিসত্তা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূমি অধিকারসহ মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করেনি। প দশ সংশোধনীতে উল্লেখিত “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” আখ্যাগুলো আদিবাসী জনগণ গ্রহণ করেনি। অপরদিকে সংবিধানে ৬ (ক) ধারায় “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী” মর্মে উল্লেখের মাধ্যমে আদিবাসী জাতিসমূহকে ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের সহজাত অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে পদদলিত করা হয়েছে। অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, বাংলাদেশ সরকার ইউপিআরে এসব বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে গেছে। এছাড়া গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, ভাষাগত সংখ্যালঘু, দলিতদের প্রতি যে ধরনের অত্যাচার হয়েছে তাতে ইউপিআর সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে সরকারের স্বদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বিশেষত গত দু-এক বছরে ধর্মীয় উন্মাদনা ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা তৈরি করে সংখ্যালঘুদের প্রতি বেশ কয়েকটি হামলা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভূমি দখল, মারপিট, হত্যা, মিথ্যে মামলায় গ্রেফতার ইত্যাদি ঘটনা ঘটেছে।

চিত্র: ভূমি দখলের ঘটনায় আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র
সর্বশেষ গত ২ জুন ২০১৭ তারিখে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার লংগদু উপজেলা সদরের তিনটিলা এবং পার্শ্ববর্তী মানিকজোড়ছড়া ও বাত্যা পাড়ায় সেটেলার বাঙালিরা জুম্মদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলা চালায়। এ হামলায় তিনটিলায় জুম্মদের ৯টি দোকানসহ কমপক্ষে ১২২টি ঘরবাড়ি; মানিকজোড়ছড়ায় ৬টি দোকানসহ ৮৬টি ঘরবাড়ি এবং বাত্যা পাড়ায় ৪টি দোকানসহ অন্তত ২৮টি ঘরবাড়ি- সর্বমোট ২৩৬টি বাড়ি ও দোকান সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয় এবং ৮৭টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনটিলা এলাকায় গুণমালা চাকমা নামে ৭৫ বছরের এক অশীতিপর বৃদ্ধা সেটেলারদের দেওয়া আগুনে পুড়ে মারা যায় এবং হামলাকারীদের মারধরের শিকার হন অনেক জুম্ম গ্রামবাসী। সেটেলার বাঙালিরা ঘরবাড়ি ও দোকানের মূল্যবান জিনিষপত্র ও মালামাল, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগী লুট করে নিয়ে যায় এবং শুকরগুলো মেরে ফেলে দিয়ে যায়। পুড়ে যাওয়া তিনটিলা, মানিকজোড়ছড়া ও বাত্যা পাড়ার প্রায় তিন শতাধিক পরিবার কেউই কোন সহায় সম্পত্তি রক্ষা করতে পারেনি এবং এক কাপড়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে কোন রকমে জীবন রক্ষা করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ীদের তালিকা অনুযায়ী যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৪ কোটি টাকা। এই ঘটনার পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইন্ধন থাকার অভিযোগ সত্ত্বেও কাউকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়নি। এমনকি ক্ষতিগ্রস্থদের সরকারীভাবে পুনবার্সন ও যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরনও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। বরং তাদের উপরই বেশ কয়েকটি মিথ্যে মামলা করা হয়েছে।
এছাড়া গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মে চিনিকলের জায়গা নিয়ে বিরোধের জের ধরে বাঙ্গালি-সাঁওতালসহ অন্যান্য আদিবাসীদের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ ও ৩ জন সাঁওতালকে হত্যা করা হয়। ঘটনার সাত মাস অতিবাহিত হলেও ঐ ঘটনায় উদ্বাস্তু হওয়া অনেক পরিবারকে আশ্রয়হীন অবস্থায় দুর্বিষহ দিনযাপন করতে হচ্ছে। কিন্তু দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোচিত এ ঘটনাতেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ। এভাবে আদিবাসীসহ সংখ্যালঘুদের উপর সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন চলমান থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সরকার ২০০৯ সালে সাংসদ উপনেতা সাজেদা কে চৌধুরী কে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি পুনর্গঠন করে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এর সমন্বিত উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। এ পর্যন্ত শান্তি চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি বাস্তবায়িত হয়েছে, ১৫টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আছে। প্রস্তাবিত ৩২টি বিভাগের মধ্যে এখন পর্যন্ত তিন ভাগের দুই ভাগ (২৩টি পর্যন্ত) তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের স্থানাস্তরিত হয়েছে। ২৩৮টি সেনা ক্যাম্প ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সরকার ভূমি কমিশন আইন, ২০০১ পর্যালোচনা এবং সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাস্তব অবস্থা: বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত ইউপিআর সুপারিশসমূহের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সুপারিশ। ইউপিআর অধিবেশনে বাংলাদেশের গত দুইটি চক্রে সরকার এ সুপারিশটি গ্রহণ করে। বিভিন্ন সময় সরকার এই চুক্তির বিভিন্ন ধারাগুলো বাস্তবায়নের কথা বলে আসলেও এখনো চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতির কার্যত এখনো তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
ইউপিআর দ্বিতীয় চক্রের পর সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ২০১৪ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা, জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান, জুম চাষ, পর্যটন (স্থানীয়) ইত্যাদি হস্তান্তর করা। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ বিশেষ করে জেলার আইন-শৃঙ্খলা, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশ (স্থানীয়), বন ও পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়সমূহ এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। এছাড়া সরকার ২৩ নভেম্বর ২০১৪ অন্তর্বর্তী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আকার চেয়ারম্যানসহ ৫ সদস্য থেকে ১৫ সদস্যে বাড়িয়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০১৪ বিল জাতীয় সংসদে পাশ করেছে। জনমতকে উপেক্ষা করে এই আইন সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এসব পরিষদের নির্বাচনকে অব্যাহতভাবে পাশ কাটিয়ে পরিষদের চেয়ারম্যান-সদস্য হিসেবে দলীয় সদস্যদের মনোনয়ন দিয়ে অগণতান্ত্রিকভাবে পরিষদসমূহ পরিচালনা করা বলে আ লিক পরিষদ ও চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্যতম পক্ষ জনসংহতি সমিতি। অধিকন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬ এর স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০১৪’ প্রণীত হয়। এ আইন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদ আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে আ লিক পরিষদ অভিমত ব্যক্ত করেছে। সম্প্রতি ২০১৬ সালে আ লিক পরিষদের সুপারিশ মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর বিরোধাত্মক ধারাসমূহ সংশোধন করা হয়েছে যা পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে নি:সন্দেহে একটি প্রসংশনীয় উদ্যোগ বলা যেতে পারে।
তবে চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য কোন কার্যকর উদ্যোগ চুক্তির ১৯ বছর পরেও গ্রহণ করা হয়নি। মূল বিষয়গুলো এখনও অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে, যেগুলোর মধ্যে উপজাতীয় অধ্যুষিত অ লের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করার জন্য আইনি ও প্রশাসনিক রক্ষাকবচ গ্রহণ করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে ক্ষমতা ও কার্যাবলী হস্তান্তর ও কার্যকর করা, তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা বিধিমালা এবং নির্বাচন বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদ এবংতিন পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা, সময় সীমা নির্ধারনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সব অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প এবং “অপরেশন উত্তরণ” প্রত্যাহার করা, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু জুম্মদের জমি ও বসতবাড়ি প্রত্যর্পনসহ পুনর্বাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য পুলিশ আইন, পুলিশ রেগুলেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য সকল আইন সংশোধন করা অন্যতম।
র্দীঘ সময় আলাপ আলোচনার পর ২০১৬ সালের আগস্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারাগুলো সংশোধন করা হয়েছে। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কাজ শুরু করেছে কিন্তু ভূমি সম্যসা সমাধানে ভূমি কমিশনের যথাযথ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারের সীমিত উদ্যোগ এ কমিশনের কাজ কতটুকু এগুতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ভূমি কমিশনের সীমিত তহবিল, লজিস্টিক এবং মানব সম্পদ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। নভেম্বর ২০১৬ সালে ভূমি কমিশন কার্যালয় থেকে ভূমি কমিশনের সচিব বদলী করার পর এখন মাত্র দুজন কর্মী নিয়ে অফিসের কার্যক্রম চলছে। এমনকি কমিশনের দৈনন্দিন কাজের জন্য কোনো তহবিল ও বাজেট নেই। সরকার এখনো পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার দুটি শাখা অফিস স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কমিশনের কার্যবিধিমালা এখনো প্রণয়ন করা হয়নি। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একটি খসড়া বিধিমালা জমা দিলেও খসড়া বিধিমালা অনুমোদন ও চূড়ান্তকরণে তেমন অগ্রগতি লাভ করেনি। কার্য বিধিমালা ছাড়া ভূমি বিরোধ শুনানি এবং সেইসাথে কমিশনের বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা ভূমি কমিশনের জন্য কঠিন হবে।
উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ও পরামর্শ না করে সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় সরকার কর্তৃক গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওযার আগে, যেমন গুইমারা উপজেলা, সাজেক থানা এবং বটতলী ইউনিয়ন গঠন ও স্থাপনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। জনসাধারণের স্বার্থ পরিপন্থী বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম যেমন, তিন পার্বত্য জেলায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, থেগামুখে স্থলবন্দর, স্থানীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং পর্যটন কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে বিলাসবহুল পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণ, সংরক্ষিত বনা ল বা রির্জাভ ফরেস্ট ঘোষণা, বিজিবি বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি) স্থাপন ইত্যাদি পার্বত্য চট্টগ্রাম আ লিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
টাস্কফোর্স গঠনের পর বর্তমান মহাজোট সরকারের (২০০৯-২০১৬) ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু জুম্ম পরিবার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্যদের পুনর্বাসন ও উন্নয়নের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সরকার এখনও আগের নীতি বজায় রেখে সেটেলার বাঙালিদের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের নীতি অব্যাহত রেখেছে যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী ও বিরোধাত্মক। ফলস্বরূপ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ১৯ বছর পরেও আদিবাসী জুম্মদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়ে আছে।
৫. সুপারিশসমূহ:
সময়সূচি ভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষনা পূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন করা;
আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ অনুস্বাক্ষর করা;
সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি সুরক্ষায় স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করা ও পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা;
আদিবাসী নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা ও সহিংসতার শিকার নারী-শিশুদের আইনী সহায়তা প্রদান করা;
আদিবাসী নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা;
আদিবাসীদের সুরক্ষায় আদিবাসী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা;
৬. উপসংহার: মহাজোটের প্রধান শরীক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আদিবাসী’ শব্দটি উল্লেখ পূর্বক আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন; মানবাধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে। কিন্তু নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার আদিবাসী বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে ইউ-টার্ন দেয় বা উল্টো পথে হাঁটা শুরু করে। ২০১৪ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে শুধু আদিবাসী শব্দটির পরিবর্তে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি বা সম্প্রদায় ব্যবহার করে আবারো একই রকম প্রতিশ্রুতি দেয়। আবার ২০০৯ ও ২০১৩ সালে বাংলাদেশের ইউপিআর অধিবেশনেও অনেক প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছেন। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি শুধু প্রতিশ্রুতি হিসেবেই রয়ে গেছে। এক দুইটি ক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতি সরকার দেখালেও বেশীরভাগ বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি সাধনে সরকারের স্বদিচ্ছার অনেক অভার রয়েছে। আগামী ২০১৮ সালের ইউপিআর অধিবেশনেও কি আবারো আদিবাসীরা শুধু প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দেখবে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য