বাংলাদেশের আদিবাসী বর্ণমালা: পাভেল পার্থ

বাংলাদেশের আদিবাসী বর্ণমালা: পাভেল পার্থ

বাংলাদেশে সকল আদিবাসী জাতিরই নিজস্ব মাতৃভাষা চলমান থাকলেও অনেকেরই লেখ্য লিপি নেই। চাকমা, মারমা, রাখাইন, ত্রিপুরা, মৈতৈ মণিপুরী, সাঁওতাল, ম্রো, বর্মণ-ক্ষত্রিয় আদিবাসীদের নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। এছাড়া মান্দি, লেঙাম, কোচ আদিবাসীদের ভেতর বেশকিছু বর্ণমালা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তাবিত হয়ে আছে। খাসি, মান্দি, মাহালী, বম, খুমী এবং সাঁওতালদের খৃষ্টীয় মিশন প্রভাবিত পক্ষ রোমান হরফকে নিজেদের মত পরিবর্তন করে ব্যবহার করছেন কেউ কেউ। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, কোল, হাজং, সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও আদিবাসীরা বাংলা হরফেই মাতৃভাষার চর্চা করছেন। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৫ বছরেও রাষ্ট্র বাংলা ভাষা ও বর্ণমালা ভিন্ন দেশের অপরাপর মাতৃভাষা ও বর্ণমালার প্রতি কোনো সম্মান ও স্বীকৃতি দেখায়নি। এটি রাষ্ট্রের এক অনিবার্য বর্ণাভিমানী চরিত্র। এটি পাল্টানো জরুরি। রাষ্ট্রে সকল ভাষা ও বর্ণমালারই সমান মর্যাদা ও স্বীকৃতি পাওয়ার ন্যায্যহিস্যা আছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষার অধিকারের বিষয়টি প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ সকল আদিবাসী জাতির ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা স্বীকার করেছে। উক্ত আইনের ৯নং অনুচ্ছেদে ‘সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বসবাসরত প্রত্যেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের ইতিহাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তথা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, কারুশিল্প, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণা কর্মসূচী পরিচালনা করা’ উল্লেখ রয়েছে। ২০১২ সনে চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, মান্দি, ত্রিপুরা ও ওঁরাও আদিবাসীদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ তৈরি হয়। চাকমাদের জন্য চাঙমা বর্ণমালা, মারমাদের জন্য মারমা, ত্রিপুরা ও মান্দিদের জন্য পরিবর্তিত রোমান এবং মুন্ডা-ওঁরাওসহ সাদ্রীভাষী আদিবাসীদের জন্য বাংলা হরফ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। দু:খজনকভাবে বাংলা না রোমান এ বিতর্কে সাঁওতালি ভাষা বিষয়ে সিদ্ধান্তটি থমকে যায়। আমরা চলতি লেখায় খুব সংক্ষেপে দেশের আদিবাসী ভাষাসমূহের বর্ণমালা সমূহের চর্চাগত পরিস্থিতিটি বোঝার চেষ্টা করবো।

চাকমা
চাকমা জাতির চাঙমা বর্ণমালা নিজেদের ভেতরে কিছুটা প্রচলিত। বেশকিছু বইপুস্তক প্রকাশিত। বর্ণমালা শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী চাকমা চিকিৎসাশাস্ত্র ‘চাকমা তালিক’ সম্পূর্ণই চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালায় লিখিত। এছাড়া এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালায় চাকমা সাহিত্য রচিত ও চর্চা হয়ে আসছে। চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালায় দেবাশীষ চাকমার ‘ফেবো’ নামে উপন্যাস প্রকাশিত।

মারমা(ম্রাইনমা)
জনগোষ্ঠীর ভেতরে কিছুটা প্রচলিত। বেশকিছু বইপুস্তক প্রকাশিত। বর্ণমালা শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়েছে। মারমা বৈদ্যরা মারমা বর্ণমালায় রচিত পুস্তক ব্যবহার করেন। খ্যাং(বৌদ্ধ মন্দির) গুলোতে অনেকেই ব্যবহার করেন। এছাড়া এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালায় মারমা সাহিত্য রচিত হয়ে আসছে।

রাখাইন
রাখাইন ভাষার বর্ণমালার নাম রাখাইন এ্যাক্ষারা। জনগোষ্ঠীর ভেতরে প্রচলিত। বেশকিছু বইপুস্তক প্রকাশিত। বর্ণমালা শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালায় রাখাইন সাহিত্য রচিত হয়ে আসছে।

ত্রিপুরা
ত্রিপুরাদের ককবরক ভাষার বর্ণমালা ককবরকনি বাথাই জনগোষ্ঠীর ভেতরে খুব বেশী প্রচলিত নয়। বর্ণমালা শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালায় ত্রিপুরা সাহিত্য রচিত হয়ে আসছে।

মান্দি (গারো)
মান্দিদের আ.চিক ভাষার বর্ণমালা ‘আ.চিক থোকবিরিম’ এই পর্যন্ত মোট চারটি বর্ণমালা প্রস্তাবিত এবং প্রকাশিত হয়েছে। জনগোষ্ঠীর ভেতর এখনও পর্যন্ত প্রচলিত নয়। তবে কেউ কেউ বর্ণমালা ব্যবহার করে সাহিত্য রচনা করছেন। কিন্তু মান্দিদের ভেতর রোমান হরফ নিজেদের মত পরিবর্তন করে কিছু ব্যবহার করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রভাব রয়েছে খৃস্টান ধর্মীয় মিশনারীগুলোর। বাইবেল, উপাসনাগ্রন্থ, প্রার্থনা সংগীতের বই সেই পরিবর্তিত রোমান হরফে প্রকাশিত। এছাড়া এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালায় মান্দি সাহিত্য চর্চা ও রচিত হয়ে আসছে।

মৈতৈ মণিপুরী
মৈতৈ মণিপুরীদের মৈতৈ লোন (মৈতৈ মণিপুরীদের ভাষা) এর বর্ণমালা মৈতৈ মেয়েক জনগোষ্ঠীর ভেতরে অল্প বিস্তর প্রচলিত। বেশকিছু বইপুস্তক প্রকাশিত। বর্ণমালা শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালায় মৈতৈা সাহিত্য রচিত হয়ে আসছে।

লেঙাম
লেঙাম জাতির লেঙাম থপিরসইট নামে একটি বর্ণমালা প্রস্তাবিত হয়েছে এবং প্রকাশিত হয়েছে। জনগোষ্ঠীর ভেতরে অনেকই বর্ণমালা ব্যবহার করে সাহিত্য ও গান রচনা করছেন। বেশকিছু লেঙাম শিশু এই প্রস্তাবিত বর্ণমালা আয়ত্ত্ব করেছে। এছাড়া এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালায় লেঙাম সাহিত্য রচিত হয়ে আসছে।

ম্রো
ক্রামা ধর্মের প্রবর্তক মেনলে ম্রো ম্রোচেট নামের ম্রো ভাষার বর্ণমালা উদ্ভাবন করেছেন। জনগোষ্ঠীর ভেতরে প্রচলিত হচ্ছে। ক্রামা ধর্মের বইপুস্তক প্রকাশিত। বর্ণমালা শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়েছে।

বর্মণ-ক্ষত্রিয়
বর্মণদের ঠার ভাষার নাগরী বর্ণমালা জনগোষ্ঠীর ভেতর পূর্বে প্রচলিত থাকলেও এখন আর তেমন প্রচলন দেখা যায় না। পুরনো বেশকিছু হাতে লেখা নথিপত্র রয়েছে এই বর্ণমালায় লেখা। এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালাতেই বর্মণ সাহিত্য রচিত হয়ে আসেছে।

অলচিকি
১৯২৫ সনে পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু কর্তৃক উদ্ভাবিত সাঁওতালি ভাষার বর্ণমালা অলচিকি ভারতে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন পেলেও বাংলাদেশে এখনও প্রচলিত হয়নি অলচিকি। অলচিকি বর্ণমালায় বেশকিছু পুস্তক ও বর্ণমালার বই প্রকাশিত। বাংলাদেশে রোমান, বাংলা নাকি অলচিকি হরফ ব্যবহার করা হবে এই নিয়ে বিতর্ক চলমান। এ পর্যন্ত বাংলা বর্ণমালায় সাঁওতালি সাহিত্য চর্চা ও রচিত হয়ে আসেছে। বাংলাদেশে বাংলা হরফ ব্যবহার করে প্রাথমিক পর্যায়ে সাঁওতালি ভাষার বেশকিছু বইপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া পরিবর্তিত রোমান হরফেও কিছু প্রকাশনা রয়েছে। রয়েছে খৃষ্ট ধর্ম সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু পুস্তক।

মাহালী
২০০৬ সনে মাহালী ভাষার জন্য রোমান হরফের সমন্বয়ে পরিবর্তিত এক বর্ণমালা মাহালে প্রকাশিত হয়েছে। বর্ণমালা শিক্ষার পুস্তক প্রকাশিত এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর কথা জানা যায়।

বম
রোমান হরফ নিজেদের মত পরিবর্তন করে ব্যবহার করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রভাব রয়েছে খৃস্টান ধর্মীয় মিশনারীগুলোর। উপাসনাগ্রন্থ, প্রার্থনা সংগীতের বই ও পরিবর্তিত বর্ণমালার বই সেই পরিবর্তিত রোমান হরফে প্রকাশিত।

খাসি
রোমান হরফ নিজেদের মত পরিবর্তন করে ‘আ-বি-কে’ নামের বর্ণমালাটি নিজেদের ভেতর ব্যবহার করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রভাব রয়েছে খৃস্টান ধর্মীয় মিশনারীগুলোর। বাইবেল, উপাসনাগ্রন্থ, প্রার্থনা সংগীতের বই ও পরিবর্তিত বর্ণমালার বই সেই পরিবর্তিত রোমান হরফে প্রকাশিত। ভারতের মেঘালয়ে পরিবর্তিত রোমান বর্ণমালায় ‘মাওফর’ নামে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

কোচ
বাংলা হরফ ব্যবহার করে মাতৃভাষা শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্য ও সংগীত চর্চা চলছে বাংলা হরফেই। উচ্চারনের সুবিধার্থে ভারতে বাংলা হরফে আরো কিছু সংযোজন ঘটেছে।

হাজং
আসাম ও বাংলাদেশ উভয়প্রানে- বাংলা হরফকে ব্যবহার করেই বেশ কিছু হাজং প্রকাশনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই সাহিত্য চর্চা ও লেখালেখি চলছে বাংলা বর্ণমালায়।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী
বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করেই দীর্ঘ সময়ের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন চলছে। ভারতের আসাম রাজ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য শহীদ হয়েছেন সুদেষ্ণা সিংহ।

কোল
বাংলা হরফ ব্যবহার করে রাজশাহী অঞ্চলে ছোট পরিসরে কোলদের ভেতর প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে কোল ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম বেসরকারি উদ্যোগে কিছুটা চলছে।

বাংলাদেশকে স্মরণে রাখা জরুরী বাংলা ভাষার জন্যে কেবল বাঙালি নয়, দেশের আদিবাসী জনগণেরও রক্ত-ঘাম ঝরেছে। ভিন্ন ভিন্ন আদিবাসী ভাষাসমূহের অজস্র শব্দ ও ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজার বছর ধরে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেছে বাংলা ভাষা। কেবল বাংলা নয়, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার জন্য ১৯৯৬ সনের ১৬ মার্চ শহীদ হয়েছেন সুদেষ্ণা সিংহ। সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকি বর্ণমালার সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য ভারতে সংগঠিত হয়েছে দীর্ঘ গণসংগ্রাম। আদিবাসী জনগণের বর্ণমালার স্বীকৃতির প্রশ্নে আজ জেগে ওঠুক বাংলাদেশের সব গ্রাম, ঘুমিয়ে থাকা বইয়ের পাতা কি প্রস্তাবিত বর্ণমালার যাদুবিভা, গল্পের ভাঁজ, কাহিনীর গতি, দুবির্নীত আলাম, বিদ্রোহী কারাম, উজ্জীবিত জাহেরথান, যুক্তির গ্রীকা কি প্রবীণ তালিক। এখানে নিশ্চুপতা মানে মাতৃভাষা দ্রোহের সাথে অবিচার।

পাভেল পার্থ। গবেষক ও লেখক। [email protected]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য