এম এন লারমার স্বপ্নকে সামনে রেখে জুম্ম জনগণকে হতে হবে আরো সংগ্রামী ও প্রতিরোধীঃ জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা

এম এন লারমার স্বপ্নকে সামনে রেখে জুম্ম জনগণকে হতে হবে আরো সংগ্রামী ও প্রতিরোধীঃ জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা

গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ও মহান বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৭৮তম জন্মদিবস উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির উদ্যোগে রাঙ্গামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত আলোচনা সভায় অন্যতম আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। আলোচনা সভায় প্রদত্ত তাঁর বক্তব্য নিম্নে পত্রস্থ করা হলো – তথ্য ও প্রচার বিভাগ

আজ থেকে আটাত্তর বছর আগে রাঙ্গামাটি শহর থেকে অনতিদূরে মহাপূরম নামক গ্রামে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই দিনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মুহূর্ত, স্মরণীয় দিন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মত একজন বিপ্লবীর জন্ম এই দিনে। এই পার্বত্য অঞ্চলে তাঁর মত একজন ব্যক্তি জন্ম নিয়েছিল সেটা অনেকেই বিশ্বাস করতেন না। আমি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে, বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি, অনেকেই অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করতেন যে, সকল ক্ষেত্রে পশ্চাদপদ যে পার্বত্য অঞ্চল সেই পশ্চাদপদ সমাজ জীবনে এমন একজন বিপ্লবীর জন্ম, এটা তো সহজে বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে তাই হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বলা যেতে পারে যে, এটা নির্ভর করে ব্যক্তির উপর। ব্যক্তি যদি সমাজব্যবস্থার গভীরে গিয়ে তার অবস্থানকে, তার প্রতিবেশীদের, তার জনগণের বাস্তবতা অনুধাবন করতে সক্ষম হতে পারেন তাহলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মত একজন মহান বিপ্লবী জন্ম হতে পারে। আজকে সেই বাস্তবতা আমরা দেখি এবং এজন্য এটা নিঃসন্দেহে আমরা গর্বভরে বলতে পারি যে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মত বিপ্লবী আমাদের এই দেশে খুব কম ব্যক্তিই জন্মগ্রহণ করেছেন বা তাঁর জীবনকে বাস্তবে বৈপ্লবিক জীবনে রূপায়িত করতে সক্ষম হয়েছেন।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা শুধু এদেশের একজন বিপ্লবী নন, তিনি সারা বিশ্বের বিপ্লবী সমাজেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বলে আমি মনে করি। আজকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্ম নিয়ে এবং তাঁর সমগ্র কর্মজীবনের বিষয়গুলো আলোচনায় আনা যেতে পারে। কিন্তু আজকের এই সীমাবদ্ধ পরিসরে সেটা সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি। তাঁর জীবনের কয়েকটা দিক, বিশেষ করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে, আলোচনা করা যেতে পারে। আমার পূর্ববর্তী আলোচকরা যা বলে গেছেন এবং যেভাবে তারা স্ব স্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, তাদের নীতি-আদর্শের আলোকে যে বক্তব্যগুলো দিয়েছেন আমি মনে করি তারা যথার্থভাবে এম এন লারমার জন্ম এবং জীবনের উপর কিছু কথা বলার চেষ্টা করতে সক্ষম হয়েছেন।

সংগ্রামী সমাবেশ, আজকে আমি আমাদের মহান নেতা এম এন লারমার তাঁর জীবনের দুয়েকটি কথা বলে এবং সেই সাথে আমার অনুভুতি ব্যক্তি করে আমার এই আলোচনা শেষ করতে চাই। এম এন লারমার জীবন সম্পর্কে আমি যা প্রত্যক্ষ করেছি একটি পরিবারের একজন হিসেবে, একই পরিবারের একজন হিসেবে, আমি যা দেখেছি, তার মধ্যে হলো- পাহাড়-পর্বত ও অরণ্যে ঘেরা, অসংখ্য নদী-নালা, ঝর্ণা, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের সমাহারে ভরপুর এই পার্বত্য অঞ্চলে এম এন লারমা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই জন্যই তিনি ছোটবেলা থেকেই আমাদের এই পার্বত্য জুম্ম সমাজকে জানার এবং বুঝবার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর ছাত্র জীবন বা কৈশোর জীবন এবং তাঁর পরবর্তীকালের জীবন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মনোনিবেশ ইত্যাদি আমি যা প্রত্যক্ষ করেছি তাতে দেখেছি যে, তিনি যে কোন বিষয় ক্রমাগত গভীর থেকে গভীরভাবে ধারণ করতে চেষ্টা করেছিলেন। এজন্যই তিনি হতে পেরেছেন একজন মহান নেতা, একজন মহান বিপ্লবী।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় তিনি পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণের স্বাধিকার, অধিকার এবং বাস্তবতা নিয়ে যে দাবি উত্থাপন করেছিলেন সে দাবির ভিত্তিতে পরবর্তীকালে তাঁরই প্রদর্শিত নীতি-আদর্শের আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো এবং একটি পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। জনসংহতি সমিতির প্রদত্ত পাঁচ দফা দাবি এম এন লারমার সেই ৭২ এর চার দফা দাবিরই একটা বিস্তারিত প্রতিফলন। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে পার্বত্য অঞ্চলে যে বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটা প্রক্রিয়া চলছে, যদিও সেই প্রক্রিয়া আজকে বলা যেতে পারে সার্বিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে আছে, তা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ৭২-এ বলার চেষ্টা করেছিলেন, জুম্ম জনগণের স্বাধিকার-অধিকার নিয়ে গণপরিষদের ভিতরে এবং বাইরে বলার চেষ্টা করেছিলেন। ঠিক তেমনি তিনি ৭৩, ৭৪-এ জাতীয় সংসদেও সেভাবেই তিনি তার বক্তব্য উপস্থাপন করতে কোন সময় দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন না। অসীম সাহস নিয়ে, সীমাহীন দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, মানবতাবোধ এবং বিপ্লবী চেতনা নিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য এই দেশের জাতীয় সংসদের সামনে তুলে ধরে যে ইতিহাস রচনা করেছেন সেটা আমরা ভুলতে পারি না। আজকে সেই কারণেই এবং সেই চেতনারই ভিত্তিতে পার্বত্য অঞ্চলের বুকে ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

আজকে আমি স্মরণ করতে চাই, যে ব্যক্তির জন্ম পার্বত্য অঞ্চলের একটা প্রত্যন্ত এলাকায় সেই মানুষটির যে দর্শন যেটার ভিত্তিতে তিনি জীবনকে দেখেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজব্যবস্থাকে সেভাবেই বিনির্মাণ করার আশা করেছিলেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন। আজকে জুম্ম জনগণের স্বাধিকার-অধিকারের প্রশ্নেও তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন। এজন্য ’৭২-এর সংবিধানে জনগণের পক্ষে তাঁর যে দাবি উত্থাপন এবং তারই ধারাবাহিকতায় তাঁরই নেতৃত্বাধীন গঠিত জনসংহতি সমিতির যে আন্দোলন তার মধ্য দিয়ে তাঁর সেই স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটেছে বলে নি:সন্দেহে বলা যেতে পারে।

সংগ্রামী সমাবেশ, সুধী সমাজ, আজকের বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আমরা কী দেখতে পাই? এম এন লারমা স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ নিজেদের অধিকার নিয়ে, পরিচিতি নিয়ে, মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকবেন এবং বেঁচে থাকার জন্য একটা জীবনধারা প্রতিষ্ঠা করবেন। আমরা যদি বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকাই, তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, এম এন লারমার স্বপ্ন কি স্বপ্নই থেকে যাবে? আমরা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ যারা এম এন লারমার জীবনদর্শনের সাথে যুক্ত হয়ে আছি, এই পার্বত্য অঞ্চলে যারা তাদের স্বাধিকার, অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতন ও সংগ্রামী ভূমিকা পালন করে চলেছেন তারা কিন্তু সেখান থেকে সরে যেতে পারে না, এম এন লারমার স্বপ্নকে বৃথা যেতে দিতে পারে না। তাইতো এখনো পর্যন্ত, এমনকি আজকের আলোচনা সভায় আমার পূর্ববর্তী বক্তারা যে অনুভুতি ব্যক্ত করেছেন তাতে আমরা দেখেছি যে, এম এন লারমার সেই স্বপ্ন, সেই আকাক্সক্ষা, তাঁর কাঙ্ক্ষিত শ্রেণিহীন-শোষণহীন সমাজজীবন, যে সমাজজীবনে জাতিভেদ থাকবে না, সম্প্রদায়ভেদ থাকবে না, লিঙ্গভেদ থাকবে না, থাকবে না অর্থনৈতিকসহ সকল প্রকারের ভেদাভেদ, সেধরনের ভেদাভেদমুক্ত একটা সমাজজীবন শুধু পাহাড়ে নয়, পার্বত্য অঞ্চলে নয়, সমগ্র বাংলাদেশে, সমগ্র বিশ্বে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পোষণ করেছিলেন, তাঁদের বক্তব্যে তুলে ধরেছিলেন।

আজকে বাংলাদেশের সরকার তথা শাসকগোষ্ঠী এম এন লারমার সেই স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করে তথা পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত অধিকারকে নির্মমভাবে পদদলিত করে চলেছে। যে কারণে আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বাস্তবতা সেই বাস্তবতায় আমরা সুষ্ঠুভাবে জীবনধারণ করতে পারছি না। আজকে পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণের পায়ের নীচে মাটি নেই, মাথার উপর আকাশ নেই। তাদের জীবন আজকে জাতিগত, সম্প্রদায়গত, অর্থনীতিগত তথা সকল প্রকারের শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে চলছে। আজকে সেই বাস্তবতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের বিশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও আমাদের বলতে হচ্ছে যে, আমরা এখনো পর্যন্ত আমাদের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার ন্যূনতম বাস্তবতা অর্জন করতে পারিনি।

আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক বাস্তবতার দিকে যদি আমরা আলোকপাত করি, পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে আমরা কী দেখতে পাই? বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে এই পার্বত্য অঞ্চলের বুকে সেনাশাসন, সেনাকর্তৃত্ব চলে আসছে। এখনও পর্যন্ত ‘অপারেশন উত্তরণ’ এর মধ্য দিয়ে এই পার্বত্য অঞ্চলের বুকে সেনা কর্তৃত্ব, সেনাশাসন বিরাজমান। এখানে আজকে ৭ লক্ষ বহিরাগত বাঙালি মুসলমানের অবস্থান। যে কারণে আজকে জুম্ম জনগণ অতিদ্রুত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে। আজকে এখানকার শাসনব্যবস্থা ১৯০০ সালের শাসনবিধির বদৌলতে ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে প্রতিদিন লঙ্ঘন করে এখানকার মানুষের উপর ব্রিটিশের দেয়া ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ-নিপীড়ন অব্যাহত রেখে তারা তাদের সেই তথাকথিত দায়িত্ব পালন করে চলেছে। আজকে এখানে জুম্মদের ভূমি অধিকার নেই। পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী এখানে ভূমি অধিকার দেওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেই ভূমির অধিকার এখনও পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে জুম্ম জনগণের কাছে দিয়ে দেয়নি। যে কারণে আজকে জুম্ম জনগণের পায়ের তলায় মাটি নেই, তাদের বসতবাটি নেই। তাদের বেঁচে থাকার জন্য এই পার্বত্য অঞ্চলে যে সহায়-সম্পদ রয়েছে, সেটা এখনও জুম্ম জনগণের সীমা থেকে বহু বহু দূরে। সেজন্য আজকে এখানে ভূমি নিয়ে অহরহ নানা ধরনের জাতিবিরোধী, জুম্মস্বার্থ বিরোধী ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বিরাজমান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও আমরা দেখেছি এখানে পার্বত্য অঞ্চলের বুকে জুম্ম জনগণের উপর কমপক্ষে বিশটি সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে। তার সর্বশেষ হলো রাঙ্গামাটি জেলার লংগদুতে সংঘটিত নারকীয় হামলা ও অগ্নিসংযোগ। আজকে পার্বত্য অঞ্চলের বুকে অহরহ অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং এখানকার সামগ্রিক জীবনধারায় জুম্ম স্বার্থ-বিরোধী প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। আজকে এখানে রাজনৈতিকগতভাবে আমরা দেখি যে, বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলো যেগুলো পার্বত্য অঞ্চলের বুকে সক্রিয় রয়েছে, তন্মধ্যে বিশেষ করে যে দল ক্ষমতাসীন সেই দল এই পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের মৌলিক অধিকার, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে সেই মৌলিক অধিকার ভন্ডুল করার জন্য, নস্যাৎ করার জন্য ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার যে নীল নকশা ও ষড়যন্ত্র তা বাস্তবায়ন করে চলেছে।

আজকে তিন পার্বত্য জেলার পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো আওয়ামীলীগের, ক্ষমতাসীন দলের শাখা অফিসে পরিণত হয়েছে। সেই কারণে জুম্ম জনগণের তথা পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী মানুষের যে অধিকারটুকু পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনের মধ্যে স্বীকৃত আছে সেই অধিকারগুলো তারা ভোগ করতে পারে না, সেই অধিকার তারা তাদের জীবনে প্রয়োগ করতে পারে না। এই সরকার তথা শাসকগোষ্ঠীর নীল নকশা বাস্তবায়নে এই তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ তথাকথিত রাজনৈতিক ও গণপ্রতিনিধিত্বের ভূমিকা পালন করে চলেছে। যে ভূমিকা নিঃসন্দেহে আমাদের জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র। এখানে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের যে অবিচার, অত্যাচার, অনাচার চলছে, সেটার বিরুদ্ধে আমরা কিছুই করতে পারি না। এখানকার যে আইনকানুনগুলো আমাদের নিরাপত্তার জন্য রয়েছে সেই আইনগুলো আমাদের পক্ষে কাজে লাগানো হয় না। এখানে মিথ্যা ধারণা দিয়ে, মিথ্যা অভিযোগ এনে এবং এখানকার নানা দিক দিয়ে সমাজজীবনে বাধাগ্রস্ত করে পার্বত্য অঞ্চলের বুকে যে শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলার ব্যবস্থাপনা, সেটা সম্পূর্ণভাবে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব ও তাদের স্বার্থ রক্ষার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এজন্য পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক বাস্তবতায় আমরা বলতে পারি যে, আজকে আমরা জুম্ম জনগণ, চৌদ্দটি ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিসমূহ বর্তমানে ভাসমান জনগোষ্ঠীতে জীবনধারণ করতে বাধ্য হচ্ছি। এটাই হচ্ছে রূঢ় বাস্তবতা। এখানে প্রতিদিন অহরহ অনেক অমানবিক ঘটনা সংঘটিত হয়, যে ঘটনাগুলোর কোন বিচার নেই, যে ঘটনাগুলোর আমরা কোন প্রতিবিধান করতে পারি না। এই বাস্তবতার মুখোমুখী হয়েও আমরা আমাদের জীবনের খুঁজে সংগ্রামে আমরা যুক্ত আছি। আজকে যা কিছু করি, যা কিছু বলার চেষ্টা করি, সরকার-শাসকগোষ্ঠী তার বিপরীতে তার ক্ষমতাগুলো অপব্যবহার করে থাকে।

আজকে বাংলাদেশে আমাদের পরিচিতি কী? সেই পরিচিতির ব্যাপারে আমাদের মহান নেতা ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, আমার পরিচিতি নিতান্ত আমারই। এখানে আমাদের সার্বিক পরিচিতি জাতীয় সংসদে প্রণীত সংবিধানে একেবারে নির্লজ্জভাবে প্রদান করেছিল যে, বাংলাদেশে যারা বাস করে তারা সবাই বাঙালি নামে পরিচিত হবে। সেই কারণে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের যে নীল নকশা, সেই নীল নকশা আজকে অধিকতরভাবে বাস্তবায়িত হতে আমরা দেখি। পাকিস্তান শাসনামলে আমরা দেখেছি, ১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ হয়েছিল, সেই কাপ্তাই বাঁধের মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়ে এই পার্বত্য অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করা। সেই নীল নকশা ছিল দ্বিতীয় পদক্ষেপ। ১৯৫৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি অধিগ্রহণ আইন ছিল প্রথম পদক্ষেপ। আরো বলা যেতে পারে, ১৯৪৮ সালে বা ১৯৪৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন বহির্ভূত এলাকার যে অধিকার ছিলো সেটাকে খর্ব করে দিয়ে পাকিস্তান সরকার বাইরে থেকে এখানে মানুষ প্রবেশ করা, বসতি স্থাপন করা। পাকিস্তান সরকার সেটা করেছিল অন্য ভাষাভাষী জাতির স্বার্থে।

পাকিস্তানের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পদক্ষেপের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসন এলাকার যে অধিকারটুকু ছিল সেটার নির্লজ্জভাবে খর্ব করতে আমরা দেখেছি। যে কারণে আমরা দেখেছি, ১৯৭২-এর সংবিধানে জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাওয়া হয়েছিল। এদেশের সরকার-শাসকগোষ্ঠী তার ষড়যন্ত্রের নীল নকশা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। যে কারণে আমরা দেখেছি, ১৯৭৩ সালে রাতারাতি এখানে তিনটি সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তার পরবর্তী সময়ে এখানে বহু বহু সেনানিবাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে অসংখ্য অস্থায়ী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পূর্ণ একটা বৃহত্তম কারাগারে পরিণত হয়েছে। সারাবিশ্বে এত বড় কারাগার আমরা কোথাও দেখি না। এই পার্বত্য অঞ্চল আর সেই পার্বত্য চট্টগ্রাম নাই, এটা বাংলাদেশ সরকার তথা শাসকেগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠিত বৃহত্তম কারাগারে পরিণত হয়েছে। যেখানে আমরা যারা বসবাস করছি, সেখানে আমাদের বুক ফুলিয়ে হাঁটবার পরিবেশ নেই। আমরা আমাদের ইচ্ছা ও আশা-আকাক্সক্ষার কথা খুলে বলতে পারি না।

আজকে চতুর্দিকে এই রূঢ় বাস্তবতার নিষ্পেষণে আমরা প্রতিটি মুহূর্তে সুষ্ঠুভাবে শ্বাস গ্রহণ করতে পারি না, নিশ্বাস ফেলতে পারি না। এই শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতায় আমরা বসবাস করছি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে এদেশের সরকার-শাসকগোষ্ঠী যা করছে, এই এলাকা শাসনের নামে শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতন তথা জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব বিলুপ্তির জন্য যে ষড়যন্ত্র ও নীলনকশা বাস্তবায়িত করে চলেছে, আইন-শৃঙ্খলার নামে, উন্নয়নের নামে যা কিছু করছে সেটাকে আমরা দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি যে, এই শাসন, এই আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা, এই উন্নয়ন কার্যক্রম কোনটাই জুম্ম জনগণের স্বার্থের জন্য নয়, তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নয়। জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব চিরতরে বিলুপ্ত করার জন্য আজকে পার্বত্য অঞ্চলের বুকে সেই শাসনব্যবস্থায় সেনা কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার যে আইন সেই ১৯০০ সালের শাসনবিধিকে ধরে রেখে এখানকার ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয় এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয় আইন-শৃঙ্খলার নামে, শাসনের নামে জুম্মদের উপর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। তাই এই পর্যায়ে এই প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে, যেটা আমাদের মনে উদিত হওয়া দরকার, আমাদের মনে ভাবনা আসা দরকার, সেটা হলো যে, এই শাসনব্যবস্থা, এই আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা, তথাকথিত যে উন্নয়ন, এগুলো কি আমরা চোখ বুজে মেনে নিতে পারি? এই বাস্তবতাকে কি আমরা শুভেচ্ছা জানাতে পারি? আমি মনে করি, আমরা তা পারি না। সেজন্যই বাংলাদেশ সরকার তথা এদেশের শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য অঞ্চলকে নিয়ে যা কিছু করছে সেটা কি আমরা মেনে নিতে পারি কি পারি না- এটা ভেবে দেখার জন্য আমাদের এই বাস্তবতার গভীরে যেতে হবে।

আমাদের জুম্ম সমাজে, আমাদের শিক্ষিত সমাজের কথাই যদি ধরি, শিক্ষিত সমাজের যারা সরকারি বা বেসরকারি চাকরিজীবী তারা সবাই শিক্ষিত, আজকে যারা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত তারাও সবাই শিক্ষিত, আজকে ছাত্রসমাজ তারাও শিক্ষিত, এই শিক্ষিত সমাজ পার্বত্য অঞ্চলের বুকে এই যে বাস্তবতা বিরাজমান, যে শাসনব্যবস্থা বিরাজমান, যে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা বিদ্যমান সেটাকে তারা কীভাবে দেখেন? আমরা যদি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করি, বিষয়টি যদি আমরা নানা দিক থেকে পর্যালোচনা করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, আমাদের এই শিক্ষিত সমাজ যারা চাকরি করেন, যারা ব্যবসা-বাণিজ্যে আছেন, যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আছেন, তাদের শতকরা ৮০ ভাগ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যেতে প্রস্তুত নয় অথবা তারা নীরবতা পালন করে থাকেন। তাহলে আজকের এই যে নির্মম বাস্তবতা, পার্বত্য অঞ্চলের বুকে যে শোষণ-নিপীড়ন, যে অত্যাচার-অনাচার চলছে, জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব বিলুপ্তির যে ষড়যন্ত্র চলছে সেটা কি জুম্ম জনগণের অস্তিত্বের উপর নানা দিক থেকে ক্ষুণœ করছে না? অবশ্যই ক্ষুণœ করছে।

আপনারা নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। চাকরিজীবীদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই, আপনি আত্মজিজ্ঞাসা করুন। আপনি আপনার চাকরি এবং আপনার পরিবারের বাইরে কি কোন কিছু ভাবতে আপনি অভ্যস্ত? আজকে আপনার চতুর্দিকে যে অনাচার-অত্যাচার, যে নির্মমতা চলছে সেটা কি আপনি ভাবেন? আমি মনে করি, সেই আত্মজিজ্ঞাসা আপনি বা আপনারা করেন না। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলের যে বাস্তবতা এই বাস্তবতা দাবি রাখে যে, আপনাকে অবশ্যই ভাবতে হবে, আপনাকে সেটা বুঝতে হবে। কারণ আমরা যদি আজকের বাংলাদেশ সরকার-শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে যা কিছু করছে সেটা যদি আমরা মেনে নিই তাহলে আমাদের পরিণতি কী হবে তা খুবই সুস্পষ্ট। তার পরিণতি কি তা একেবারে জলের মত পরিষ্কার। সেটা হচ্ছে যে, সর্বস্বান্ত হয়ে আমাদের অস্তিত্ব বিলুপ্তিকে গ্রহণ করা। অস্তিত্ব বিলুপ্তির দিকে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। এই যে বাস্তবতা, সে বিষয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিদের ভাবা উচিত। আজকে তাদের মধ্যে যে উচ্চাভিলাষ, যে স্বার্থবাদিতা, যে আত্মমুখীনতা বিরাজমান সেটা তার পরিবারকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার পাশাপাশি জুম্ম সমাজের অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রামকেও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

এই সূত্র ধরে আমি বলতে চাই, আজকে জুম্ম সমাজের মধ্যে যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আছেন, হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন, সেই ছাত্রসমাজ তাদের অভিভাবকদের নির্দেশে লেখাপড়া শিখে গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কোন কারিগরী বিদ্যায় উচ্চ শিক্ষিত হয়ে তারা কী করবেন? তিনি হয়তো একটি চাকরির সন্ধানে থাকবেন। একটা পেশায় যুক্ত থেকে তিনি নিজের জীবনকেই শুধু দেখতে থাকবেন। একটা বিশেষ সংকীর্ণতার মধ্যে তিনি তাঁর জীবনকে নিয়ে ভাবতে থাকবেন। সেটা কি আমাদের জন্য মঙ্গলজনক? কোনদিন না। এজন্যই শিক্ষিত সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে, বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে সবচেয়ে প্রগতিশীল, সবচেয়ে সংগ্রামী, সবচেয়ে অগ্রণী অংশ হিসেবে এই ছাত্র সমাজকে ভাবতে হবে তার অবস্থানকে, তার পরিবারের অবস্থানকে, তার স্বজাতির অবস্থানকে তথা পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। আজকে আমরা দেখি যে, এখানে তাদের মধ্যে নানা ধরনের বক্তব্য, নানা ধরনের কথাবার্তা, নানা ধরনের আকাক্সক্ষা বিরাজমান। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত শিক্ষিত সমাজ, ছাত্রসমাজের মধ্যে জীবনের যে উচ্চাভিলাষ সেটাই বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু আপনার বা আপনাদের সেই উচ্চাভিলাষটাই যদি প্রাধান্য পেয়ে তাকে, তাহলে আপনার জীবন সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে না, আপনি আপনার অস্তিত্বকে হারাবেন, আপনি আপনার জীবনকে যেভাবে পেতে চাচ্ছেন সেভাবে আপনি পাবেন না।

এই বাস্তবতায় এই প্রশ্নটা আসছে যে, সরকার-শাসকগোষ্ঠী যেভাবে পার্বত্য অঞ্চলকে নিয়ে তার তথাকথিত শাসনব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা করছে সেটা কি আমরা মেনে নেবো নাকি মেনে নেব না? আমরা যদি মেনে নিই, এটা নিঃসন্দেহে আমরা বলতে পারি যে, আমাদের অস্তিত্ব আর থাকবে না। আমরা সর্বশ্বান্ত হয়ে আমাদের অস্তিত্বকে হারাবো। সেটা আমার প্রজন্মে না হলেও আমার সন্তান-সন্ততি বা বংশের ভবিষ্যত প্রজন্মে বা এই প্রজন্মে না হলেও পরবর্তী, পরবর্তী না হলেও তার পরবর্তী প্রজন্মে দেখা যাবে সেই জুম্ম জাতি তার অস্তিত্বকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সর্বস্বান্ত তো আমরা হতে পারি না! এই পার্বত্য অঞ্চল জুম্ম জনগণের পূর্ব পুরুষেরা হিং¯্র জন্তু-জানোয়ারের সাথে লড়াই করে আবাদ করেছিলো। আবাদ করে চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করেছিল। সেই পাহাড়, পর্বত, ঝর্ণা, অরণ্য, সবকিছু আজকে বলা যেতে পারে আমাদের হাতে থাকবে না, আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে এটা মেনে নেয়া যায় না।

আজকে আমরা শিল্পকলা একাডেমিতে বক্তব্য রাখছি, এই বক্তব্য রাখার পশ্চাতে যে ইচ্ছা আমাদের মধ্যে জাগ্রত করে সেই ইচ্ছা অর্জনের ক্ষেত্রে চতুর্দিকে আমরা তার প্রতিবন্ধকতা দেখি। এখানে মুখ খুলে, বুক ফুলে কিছু করার নাই। চতুর্দিকে আমাদের উপর চেপে বসে আছে সেই উগ্র জাতীয়তাবাদী, সাম্প্রদায়িকতাবাদী বাংলাদেশ সরকার-শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ-নিপীড়ন। আজকে সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হলে, সমাগত সংগ্রামী সমাবেশ, সংগ্রামী সুধীবৃন্দ, আমি বলতে চাই, তাহলে আজকে আমাদের করণীয় কী সেটা ভাবতে হবে। আমরা এই বাস্তবতা মেনে না নিতে পারি। যদি মেনে নিই তো তাহলে সর্বস্বান্ত হয়ে আমাদের অস্তিত্ব চিরতরে হারাবো। সেটা আমরা নিশ্চয় কেউই চাই না। বাংলাদেশের সরকার-শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বাস্তবতা এখানে সৃষ্টি করা হয়েছে তার ফলে আজকে আমরা সংখ্যালঘু হয়ে গেছি। যে পার্বত্য অঞ্চলে দেশভাগের সময় ২.৫০ ভাগ বাংলা ভাষাভাষী ছিল, বাকী ৯৮.৫ ভাগ আমরাই ছিলাম। আজকে সেই পার্বত্য অঞ্চলে আমরাই সংখ্যালঘু হয়ে গেছি। আর অনতিবিলম্বে আমাদেরকে খুঁজেও পাওয়া যাবে না।

এই বাস্তবতায় আমরা কীভাবে আমাদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকু রক্ষা করতে পারবো? সেজন্যই এই পার্বত্য অঞ্চলের বুকে আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ তারা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, সংগ্রাম করেছিল মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, উপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। এই পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ ধীরে ধীরে তাদের জীবনধারাকে পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করে এসেছে। পাকিস্তান আমলেও আমাদের সংগ্রাম ছিলো। আজকে বাংলাদেশের জন্মলগ্নে মুক্তিযুদ্ধে এই পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের বিরাট অবদান রয়েছে। এই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশে আজকে আমাদের অস্তিত্বের জন্য, অধিকারের জন্য আমাদের অব্যাহতভাবে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। দীর্ঘ ২০ বছরেরও অধিক দিন ধরে এখানে সশস্ত্র সংগ্রাম আমরা দেখেছি। যদিও সেটা এই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, বিশেষ অধিকার পাওয়ার জন্য সেই সংগ্রাম। সেই পরিণতিতে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। সেই চুক্তিতে যা কিছু বলা আছে বাংলাদেশ সরকার সেগুলো বাস্তবায়নে আজকে খুবই দ্বিধাগ্রস্ত। এজন্য আজকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে আছে।

বর্তমানে এই চুক্তির বিষয়টা বাংলাদেশ সরকার-শাসকগোষ্ঠীর কাছে অত্যন্ত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে সেটা হতে পারে না। সেটা হতে দেওয়া যায় না। এজন্য এই বাস্তবতাকে যদি আমরা মেনে না পারি তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই সংগ্রামী হতে হবে, আরও আরও অধিকতর আন্দোলন-সংগ্রামে সামিল হয়ে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে আরও আরও অধিকতরভাবে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং জীবনকে সংগ্রামে উজ্জীবিত করতে হবে। আজকে চাকরি করে যারা নিজের জীবনকে একটা সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে চান তাদের মতো হলে চলবে না। সেখানে থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের এই অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে সম্প্রসারিত করতে হবে, নিজেকে আরও আরও বেশি পরিমাণে উজ্জীবিত করতে হবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের সমাজ শ্রেণি বিভক্ত। সব শ্রেণির মানুষ এই আন্দোলন-সংগ্রামে আসতে পারে না, আসবেও না। যেমন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের যারা চেয়ারম্যান-সদস্য আছেন, তাদের ভূমিকাই যদি আমরা বলি, সেভাবেই যদি আমরা ভাবি, তাহলে তো আমাদের আর বেশি দিন লাগবে না আমাদের অস্তিত্বকে হারাতে। আমাদের অস্তিত্বের জন্য যতটুকু লড়াই করার বাস্তবতা আছে সেটাও থাকবে না। এখানে নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য অনেকেই আছেন আমাদের পাহাড়িদের মধ্যে, জুম্মদের মধ্যে যারা সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে তারা নিজের স্বার্থ পূরণ করে থাকে। সেই সংখ্যাটা যদিও নগণ্য বলে আমরা মনে করি, কিন্তু গোটা পার্বত্য অঞ্চলে জুম্ম সমাজে প্রতিটি জুম্ম জাতির মধ্যে একটা অংশ আছে যারা প্রতিক্রিয়াশীল, সুবিধাবাদী, সরকার-শাসকগোষ্ঠীর সাথে আঁতাত করে, দালালি করে নিজের স্বার্থ পূরণ করে। আজকে যেমন পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে যা কিছু কর্মকান্ড হয়ে থাকে সেখানে আমরা কী প্রত্যক্ষ করি? প্রত্যক্ষ করি যে, সবকিছুই আমাদের স্বার্থের পরিপন্থী। পার্বত্য জেলা পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যান হয়েও তারা আবার পার্বত্য জেলা পরিষদের বিরুদ্ধে কাজ করেন। এই বাস্তবতার আলোকে পার্বত্য জেলা পষিদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদেরকে প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, প্রতিবাদ করতেও আমরা দ্বিধাগ্রস্ত কেন? আমরা এই যে অবস্থায় আছি, এই যে স্থবিরতা ও নিষ্ক্রিয়তা, এখান থেকে যদি বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে পার্বত্য জেলা পরিষদ যেভাবে প্রতিদিন চুক্তি বিরোধী, জুম্ম স্বার্থ বিরোধী কাজগুলো করে যাচ্ছে, ডেপুটি কমিশনার ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় তথা গোটা পার্বত্য অঞ্চলের শাসনের ক্ষেত্রে যারা যুক্ত আছেন তাদের যে কার্যক্রম সেই ধ্বংসাত্মক কাজগুলো যদি আমরা মুখ বুজে সহ্য করে যাবো? সেগুলো যদি মেনে নিয়ে থাকি তাহলে কি হবে? তাহলে বেশি সময় লাগবে না যে, আমাদের যে অস্তিত্ব সেটা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আমাদের এখনও সময় আছে। আমাদের অধিকার আদায়ের, চুক্তি বাস্তবায়নের লড়াই-সংগ্রাম করার বাস্তবতা এখনও আমরা খুঁজে পাই। সেজন্য এই সমাবেশে সুধী সমাজের কাছে, পার্বত্য অঞ্চলের যুব সমাজের কাছে যে বিষয়টা তুলতে চাই সেটা হচ্ছে, সরকার বা শাসকগোষ্ঠী যা করে চলেছে সেটা কি আমরা মেনে নেবো নাকি মেনে নেবো না? যদি মেনে নিই তাহলে সর্বস্বান্ত হয়ে চিরতরে আমাদের অস্তিত্ব হারাতে হবে। এটাই বাস্তবতা। সুতরাং আমরা যদি আমাদের অধিকার নিয়ে, মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই, সমমর্যাদা-সমঅধিকার নিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা যদি বাঁচতে চাই, তাহলে আমাদের প্রতিবাদী এবং প্রতিরোধী হতে হবে। প্রতিবাদের জন্য, প্রতিরোধের জন্য আমাদের করণীয় কী তা গভীরভাবে দেখতে হবে, বুঝতে হবে। এই কারণেই আমাদের একটা ঐকমত্যের বাস্তবতার জন্ম দিতে হবে যে, আমরা জুম্ম স্বার্থ বিরোধী বাস্তবতা মানতে পারি না, আমরা মেনে নেব না।

সুতরাং পার্বত্য অঞ্চলের সংগ্রামী নাগরিক সমাজকে, সংগ্রামী ছাত্র-যুব সমাজকে, সংগ্রামী জনগণকে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করে চুক্তি বাস্তবায়ন তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামকে উজ্জীবিত করতে হবে, আরও জোরদার করতে হবে, যাতে এই চুক্তি বাস্তবায়ন তথা জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সরকার এগিয়ে আসতে বাধ্য হয়। সেই বাধ্যবাধকতা পর্যন্ত এই দেশের সরকার-শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে আমাদের বর্তমানে যে অবস্থা, প্রতিদিন যে আমরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি, বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছি, আমাদের যে দুর্বিষহ জীবন, বুকের যে কত যন্ত্রণা, কত জ্বালা, তা থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না। যারা এই অধিকারের ক্ষেত্রে, মর্যাদা বা সম্মান অর্জনের ক্ষেত্রে বা পাওয়ার ক্ষেত্রে যারা সচেতন আমরা সেটা বুঝি, আমরা অনুভব করি। এজন্যই আমি বলতে চাই, আমরা কেন নীরবে সবকিছু মেনে নেবো? আমরা মেনে নিতে পারি না, মেনে নেওয়া উচিত না। এজন্য আমি আজকের এই মহান নেতা এন এন লারমার জন্মদিবসে তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আকাক্সক্ষাকে সামনে রেখে আমি বলতে চাই যে, তিনি চেয়েছিলেন এই পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম সমাজ মাথা উঁচু করে, সমমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিয়ে বেঁচে থাকবে, পৃথিবীর বুকে মানসম্মান ও মর্যাদা নিয়ে নিজস্ব আসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। সেই স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন।

সেই বাহাত্তরের বা তারও আগে পার্বত্য অঞ্চলের বুকে কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে, যে বাঁধের মাধ্যমে আমাদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে গেছে, আমাদের সমস্ত জীবনধারাকে আঘাত করা হয়েছে এবং জুম্ম জনগণের জাতীয় জীবনে নতুন করে যে বিলুপ্তির ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ’৪৭-এর নীলনকশা বাস্তবায়ন আরও সহজতর হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যুব বয়সে প্রতিবাদ করেছিলেন, প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন। সেজন্য তিনি পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে তাঁকে জেলে অন্তরীণ হতে হয়েছে। সরকার তাঁর উপর যা যা আইনী উপায় আছে সেভাবে তাঁকে দমন-পীড়ন করতে চেয়েছিল। আজকে সেই এম এন লারমা, সেই মুক্তিকামী-অধিকারকামী এম এন লারমার যে স্বপ্ন তিনি নতুন করে দেখাতে চেয়েছিলেন ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন কালে এবং প্রথম জাতীয় সংসদে সেই আকাক্সক্ষা পোষণ করেছিলেন, প্রদর্শন করেছেন, উজ্জীবিত হতে জুম্ম জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। আজকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর প্রদর্শিত নীতি-আদর্শ, তাঁর প্রগতিশীল আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি, পার্বত্য অঞ্চলের বুকে জুম্ম জাতীয়তাবাদের চেতনা দেখিয়েছিলেন এবং যার পথ ধরে আজকে পার্বত্য অঞ্চলের বুকে এই অস্তিত্ব সংরক্ষণের লড়াই-সংগ্রাম এগিয়ে যাচ্ছে, এম এন লারমার সেই চেতনা আমাদের মাঝে রয়েছে। তাঁর সেই স্বপ্ন-আকাক্সক্ষাকে ঘিরেই আজকের এই সমাবেশে আমার এতটুকু কথা বলা।

আমি কাছে থেকে এম এন লারমাকে দেখেছি। তিনি আমার সহোদর ভাই হিসেবে যত না পেয়েছি, তার চেয়ে বেশি পেয়েছি একজন রাজনৈতিক বন্ধু হিসেবে। তাঁর জীবনদর্শন, তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রম, তাঁর জীবনধারা এবং সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আকাক্সক্ষা সেটা আমরা ভুলে যেতে পারি না। আমরা ভুলে যাইনি, ভুলে যাবো না। এজন্য আমি মনে করি, আজকে প্রতিটি জুম্ম নরনারীকে এম এন লারমার স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা, ইচ্ছা, তাঁর জুম্ম জনগণকে নিয়ে তথা সমগ্র মানবজাতি, নিপীড়িত-নির্যাতিত শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে, গরীব মানুষের স্বাধিকার-অধিকার নিয়ে তিনি যে স্বপ্ন দেখেছেন সেই স্বপ্নকে সামনে রেখে জুম্ম জনগণকে আরো আরো সংগ্রামী, প্রতিরোধী, প্রতিবাদী হতে হবে। সেই প্রতিবাদ, সেই প্রতিরোধ আমাদের অস্তিত্বকে সমুন্নত করবে, করতে পারেÑ এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আমাদের অধিকতর আন্দোলনে, উচ্চতর আন্দোলনে, আমাদের যখন যে আন্দোলন দরকার সেই আন্দোলনে সামিল হতে আমাদের এগিয়ে থাকতে হবে- এই বলে আমার বক্তব্য শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগের সৌজন্যে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য