ক্ষুধার্ত থানচি; জুম উন্নয়নই স্থায়ী নিবারণ সম্ভবঃ পপেন ত্রিপুরা

ক্ষুধার্ত থানচি; জুম উন্নয়নই স্থায়ী নিবারণ সম্ভবঃ পপেন ত্রিপুরা

(১)
এর আগে ২০১২ সালেও বান্দরবানের থানচি ও রুমাতে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। তখনও আপদকালীন মোকাবিলা করে সেখানকার মানুষের ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করেছিল সরকার ও এনজিও সংস্থা। তিন বছর পর আবারও থানচির মানুষের ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। আবার সেই একই চেষ্টা করছে সরকারসহ বিভিন্ন বেসরকারি ও সেচ্ছাসেবী সংগঠন-সংস্থাসমূহ। হয়তো সরকার তাদের জন্য স্বল্প প্যাকেজ খাদ্যশস্য বরাদ্দ করলেও করতে পারে। একমাস, দুইমাস, তিনমাস বা সর্বোচ্চ ছয়মাস। এবারও হয়তো সাময়িক ক্ষুধার জ্বালা মিটবে থানচির মানুষের। কিন্তু এর কোনো স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করছি কি আমরা?
(২)
দৃশ্যত থানচি, অদৃশ্যে-আড়ালে আরো শত থানচি রয়েছে পাহাড়ে। যেখানে ক্ষুধা আর দারিদ্রতা সব সময় তাড়া করে সেসব এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের। মিডিয়ায় প্রকাশ পায় না বলে আমরা কেউই সেসব মানুষের পেটের ক্ষুধা বুঝতে পারিনি, পারছি না। কারণ, ওরা থাকে সরকার পরিচালনাকারী বাবুদের অফিস থেকে বিশ, পঞ্চাশ, শত কিলোমিটার দূরে। একেবারে দেশের প্রান্তে। যেখানে পৌঁছতে খাড়া পাহাড় বেয়ে, ছড়ার পানি আর কাঁচা পাথর মাড়িয়ে, জঙ্গল পথে পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এরা বাজারে আসে মাসে একবার। কেউ কেউ সর্বোচ্চ সপ্তাহে একবার। তাই আমরা তাদের খবর জানি না। জানতেও যেতে চাই না। কারণ, সেখানে যাওয়া দুঃসাধ্য ও কষ্টকর। তবে, পাঁচ বছরে একবার আমরা সবাই তাদেরকে সালাম দিতে যাই। তখন কোনো কষ্টই যেন কষ্ট বলে মনে হয় না আমাদের।
(৩)
যাদেরকে আমরা উপজাতি, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, পাহাড়ী, সম্প্রদায় বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষিত করে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করি। তারা সেই-ই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যাদের জীবন জীবিকার প্রধান মাধ্যম জুম চাষ। গভীর জঙ্গল ঢাকা কাঁচা মাটিতে ফসল ফলিয়েই তারা জীবন যুদ্ধে টিকে থাকে, টিকে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু সময়ের স্রোতে স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃত্রিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমির ওপর সরকারি, বেসরকারি, কোম্পানির আগ্রাসনের চাপে জুমভূমি দ্রুতই হ্রাস পাচ্ছে। হ্রাস পেয়েছে, জুম পাহাড়ের পতিতকাল। পতিতকাল হ্রাস পাওয়ায় ফসল উত্‍পাদনও কমে গেছে অকল্পনীয়ভাবে। কোনো কোনো জুমচাষীরা জানায়, ফসল উত্‍পাদনের চাইতে বিনিয়োগ হয় বেশি। লাভের আশায় নয়, নিজের কাজ নিজেরাই করার উদ্দেশ্য জুম চাষ করছে তারা।
(৪)
কাজের অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নস্থ তৈসাকালক, ছাতিপাড়া, হাজাছড়া পাড়াবাসীর দূরাবস্থার কাহিনী। দারিদ্রতার সংজ্ঞা জানতে চাইলে সেসব এলাকায় ঘুরে আসতে পারেন যে কেউই। কিন্তু সেখানে জনপ্রতিনিধিরা যান না, যাননি কখনো। জুম চাষ তাদের প্রধান জীবিকার মাধ্যম হলেও হাজাছড়া পাড়ার প্রায় সকলেই ‘য়াম'(তল: ধান শুকানোর পাটি) বুনে তা বাজারে বিক্রি করে দুরাবস্থা দূর করার চেষ্টা করে থাকে। সেখানেও অনুযোগের সুর শুনেছি। ‘জুম চাষ এখন না পারতে করা হয়ে থাকে’।
‘জুমে এখন তেমন ফসল হয় না। জুমে উত্‍পাদিত ধান দিয়ে আশ্বিন-অগ্রহায়ণ এই তিন মাসের বেশি খাদ্য মজুদ থাকে না। তারপরের ভরসা জঙ্গলী আলু, কলাগাছসহ নানা ধরণের জঙ্গলী ফল, শাক-সবজি। এগুলোও আগের মত আকর পাওয়া যায় না এখন। জঙ্গলই নাই, জঙ্গলী ফলমুল কোত্থেকে হবে।’
অনেকটা নিয়ম রক্ষায়, বংশ পরম্পরায় জুম করছে জুমিয়ারা। যদিও আসলে তা নয়। পাহাড়ে নিচু সমতল ধান্যজমি নাই বললেই চলে। যেখানে ত্রিপুরা আর ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাস সেখানেতো নেই-ই। সুতরাং জুম চাষ না করা ছাড়া টিকে থাকার বিকল্প কোনো পেশা তাদের হাতে নেই।
(৫)
‘জুম’ কী? এমনটা প্রশ্ন দেশের সমতল অঞ্চলবাসীর অনেকের হতে পারে। ‘জুম’ শব্দটি চাকমা ভাষা। যা এখন স্থানীয় বাংলা এমনকি লিখিত বাংলা হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। জুম’র ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। ত্রিপুরা ভাষায় হৌগ, মারমা ভাষায় ইয়া, খিয়াং ভাষায় লাই, বম ভাষায় লাউ, চাক ভাষায় ইপ্রা, ম্রো ভাষায় উঅ বলা হয়। মূলত, পাহাড়ের ঢালু গায়ের জঙ্গল(বড়গাছ ব্যতীত) পৌষ-মাঘ মাসে কেটে শুকিয়ে রেখে চৈত্রমাসে তা পুড়িয়ে সাফ করে সেখানে ধানের সাথে তিল, তুলা, মসলা, আলু, কচু, ভুট্টা, কাকন, মারকু, আখ, বেগুন, ফুল ইত্যাদি বপন করে আবাদ করাকে জুম চাষ বলা হয়। এটা স্থানান্তরিত চাষ পদ্ধতি। একটা পাহাড়ে একবার চাষ করার পর তা কমপক্ষে পাঁচ-দশ বছর পতিত রাখতে হয়। এই পাঁচ/দশ বছরে সেই জুমিয়া পরিবারকে কমপক্ষে আরো পাঁচ/দশটা পাহাড় চুষে জুম চাষ করার সুযোগ থাকতে হবে। এই পাঁচ-দশ বছরে পূর্বের চাষকৃত পাহাড়টি আবারও জঙ্গলে আচ্ছাদিত হয়ে উর্বর হয়ে উঠবে। জুম চাষের শুভ যুগে জুমিয়ারা জুমে উত্‍পাদিত ধানেই বছর পার করতো। জুমের সাথী ফসলগুলো কিছু অংশ বাজারে বিক্রি করে পরিবারের অন্য চাহিদা মিটাতে সক্ষম ছিল।
(৬)
সরকার আন্তরিক হলে জুম চাষ দ্বারাই এখনও জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব বলে মনে করে জুমিয়ারা। জুম চাষকে দেশের জাতীয় কৃষিখাতে অন্তর্ভুক্ত করে জুমিয়াদেরকেও কৃষি ভর্তুকির আওতায় নিয়ে আসলে জুমে এখনও ভাল ফলন আনা সম্ভব। কারণ, জুম একসময় রাসায়নিক সার-ওষুধ ছাড়াই চাষ সম্ভব হলেও এখন আর সম্ভব নয়। জুমে এখন যোগ হয়েছে রাসায়নিক আগাছানাশক, কীটনাশক আর সার। এসব রাসায়নিক বিষ-ওষুধ কিনতে জুমিয়াকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয় মহাজন বা এনজিও’র নিকট। অন্যদিকে, জুমজমিগুলো বন্দোবস্তকৃত না হওয়ায় সরকারি ব্যাংকের ঋণ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত জুমচাষীরা।
জুম চাষকে জাতীয় কৃষিখাতে অন্তর্ভুক্ত করে চাষীদের জন্য কৃষি ভূর্তুকি ও স্বল্প বা বিনা সুদে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দিলে জুম চাষ স্থানীয়ভাবে স্থায়ী খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে তার কোনো সন্দেহ নেই। সরকার এই পন্থায় সুযোগ দিতে না পারলে বিকল্প হিসেবে স্থায়ী রেশনের ব্যবস্থা করা দরকার। যা ‘৮০-৮১তে পাহাড়ে নিয়ে আসা সমতল বাঙালিদের জন্য সরকার এখনও করে যাচ্ছে। লাখ লাখ বাঙালি পরিবার এখন এ সুবিধা ভোগ করছে শহরঘেষা এলাকায় বসবাস করে। যাদের অনেকেই এখন ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, লাখপতি-কোটিপতি হয়েছে। সেই অধিকার থেকেই জুমিয়ারাও সরকারের রেশন সুবিধা পাওয়ার যোগ্য।
৭) ভাত দে নইলে মাটি দে: এই মুহুর্তে থানচিবাসীর প্রতিবাদী ও দাবির শ্লোগান হতে পারে, ‘ভাত দে নইলে মাটি দে’। কারণ, মাটি ছাড়া ভাত(ধান) ফলানো সম্ভব নয়। আর এক সময় আদিবাসীরা মাটি আঁকড়ে ধরেই বেঁচে ছিল। বেঁচে ছিল যুগ যুগ ধরে, শতাব্দীর পর শতাব্দী। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই জীবন যাপনে অভ্যস্ত তারা। আধুনিক কৃষিযন্ত্র লাঙ্গল, পাওয়ারটিলার, ট্রাক্টর, পাম্প কোনোটাই প্রয়োজন ছিল না তাদের। কারণ, তারা গভীর জঙ্গলের কাঁচা মাটিতেই ফসল ফলাতে সক্ষম। রাইস মিল বা ধান ভানার মেশিনেরও প্রয়োজন ছিল না তাদের। যে জঙ্গলে তাদের বাস সেই জঙ্গলের গাছ কেটে ঢেঁকি তৈরী করে ধান ভানতে জানা তারা। কিন্তু এর জন্য তাদের দরকার মাটি। কেবলই মাটি। মাটি পেলেই সরকারি চালের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তাদের চাই কেবল মাটি। তাদেরকে মাটি দে নইলে পর্যাপ্ত ভাত দে। কারণ তারাও ক্ষুধামুক্ত-দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশের মানুষ।
(৮)
তাদেরকে মাটির অধিকার, কৃষির অধিকার, নাগরিক অধিকার দিয়ে পরিবেশবান্ধব মাটি ব্যবহারের কৌশল জানার অধিকার দিলে সরকার বা কারোর দয়া তারা গায়ে মাখবে না। ঘাম ঝরিয়ে খেটে বাঁচতে সক্ষম তারা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা(এনজিও) রয়েছে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য। তাদেরকে প্রকল্পবিহীন বেকার বসিয়ে না রেখে কাজে লাগানো সম্ভব। সাধারণ মানুষ এখনও সরকারের চাইতে এনজিওকে বিশ্বাস করে বেশি। এনজিওদের হাতে টেকনিক-লজিক ধরিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিন পাহাড়ের থানচিগুলোতে। জৈব সার, কম্পোস্ট সার, জৈব কীটনাশক তৈরীতে জুমিয়াদের সহায়তা করুক তারা। এতে করে পরিবেশ বাঁচবে, জুমিয়ারাও বাঁচবে। বাঁচবে বাংলাদেশ।
(৯)
অনেকে জুম চাষের কথা বললে ‘পরিবেশ গেল পরিবেশ গেল’ বলে চিল্লানি দিয়ে থাকে। ভাবুনতো, পৃথিবীর কৃষির সূচনালগ্নই ছিল জুম চাষ। কত হাজার বছর ধরে জুম চাষ হয়ে আসছে? পরিবেশের কি কোনো ক্ষতি হয়েছিল? কারণ, জুমচাষে পাহাড়ের বড়গাছগুলো কাটা হয় না। জুমের প্রয়োজনেই রেখে দিতে হয়। কোনোটা পাখি বসার জন্য কোনোটা সারের ক্ষমতা পাওয়ার জন্য আর কোনোটা বিশ্রামের ছায়ার জন্য। পাহাড়ের কড়ই গাছ, গামাঢ়ী গাছের পাতা ঝরে পড়ে সার হিসেবে কাজ করে তাই এসব গাছ জুমে রেখে দেয়া হয়। পাখিরা গাছে বসলে ক্ষতিকর পোকা শিকার করবে আর বিষ্ঠা ফেলবে- একসাথে দুটোই উপকার হয়। তাই কতগুলো গাছ পাখিদের জন্য রাখা হতো। জুম চাষের ফলে মাটি ক্ষয়তো প্রশ্নই আসে না। কারণ, জুমের মাটি কোদালে কোপানো হয় না। দা দিয়ে ধানসহ ফসলের বীজ বপন করা হয়। এখানে বাঙালি অনুপ্রবেশের আগে কখনো পরিবেশের বিপর্যয় ঘটেনি। জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হয়নি।
(১০)
পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র ধ্বংস শুরু হয় আশির দশক থেকে। সমতল অঞ্চলের বাঙালি অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ক্ষেপিয়ে পাহাড়ের রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে সরকার। তারপর নিরাপত্তার অজুহাতে গভীর জঙ্গলের বিশাল বিশাল গাছসহ নির্বিচারে গাছপালা, ঝোপ-জঙ্গল কেটে ফেলা হয়। সেই সময় পাহাড় মরুভূমি হয়ে গিয়েছিল। এখানকার রাস্তাঘাট তৈরীতে উত্তোলন করা হয় পাহাড়ের ছড়া-খাদ থেকে পাথর। ইট পোড়াতে নির্বিচারে কাটা হয় গাছপালা।
তারপর বনবিভাগ আর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সেগুন বাগান প্রকল্প আর রাবার বাগান প্রকল্প দিয়ে শুরু করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র ধ্বংস প্রক্রিয়া। জুম চাষে সাময়িক পরিবেশের ক্ষতি হলেও তা স্থায়ী নয়। ফসল উত্তোলনের পরপরই পাহাড় আবার সবুজ হয়ে উঠতে শুরু করতো। কিন্তু রাবার-সেগুন চাষে বহুমুখী পরিবেশের ক্ষতি হতে থাকে। আরেকটা বিষয় না বললে নয়। মেনে নিলাম, মানুষের জন্য সুস্থ পরিবেশ দরকার। কিন্তু মানুষ কি কেবল অক্সিজন খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে? মানুষ যদি খেয়ে না বাঁচতে পারে তাহলে পরিবেশ দিয়ে কী হবে? ফসল উত্‍পাদনের জন্য যে সমস্ত পাহাড় ব্যবহৃত হচ্ছে সেসব পাহাড়গুলোকে আমরা পরিবেশের সাথে জড়াবো না। পরিবেশ রক্ষার জন্য আরো অনেক পাহাড় রয়েছে যেগুলোতে জুম চাষ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেসব পাহাড়েও সেগুন চাষ সম্ভব। তাই বনবিভাগের সেগুন বাগান প্রকল্পে সেই সমস্ত পাহাড়ও বাদ যায়নি।
একটা আধুনিক খবর হলো, গত কয়েক বছর ধরে খাগড়াছড়ির বাজারগুলোতে প্রতিবছর কোটি কোটি সেগুনের চারা বিক্রি হয়েছে। এবছরও হচ্ছে। হাজার হাজার ব্যক্তিগত সেগুন বাগান গড়ে উঠেছে, উঠছে। এই বিষয় নিয়ে মিডিয়ায় খুব একটা গলা ফাটানো খবর দেখি না। কিন্তু যে জুম চাষে মানুষের জীবন রক্ষা পায় মানুষের জীবন রক্ষাকারী চাষাবাদকে নিয়ে অনেক মিডিয়া গবেষক বনে যেতো।
পপেন ত্রিপুরা; সংবাদকর্মী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য