খোকা স্যারঃ আলোর পথে নিভৃতচারী অভিযাত্রী

খোকা স্যারঃ আলোর পথে নিভৃতচারী অভিযাত্রী

শ্যাম সাগর মানকিন: ছয় ভাই-বোনের মধ্যে বাবা-মার একমাত্র ছেলে সন্তান তাই আদর করে খোকা বলে ডাকতো সবাই। এখনো সে নামেই বেশ পরিচিত মুখ বান্দরবান শহরের উজানী পাড়ার স্কুল শিক্ষক ক্য শৈ প্রু মারমা। শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে আদিবাসী মারমা জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে তার অবদান সর্বজন বিদিত ও সন্মানিত। মারমা ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা মারমা শিশু শিক্ষার্থীদের কাছে পৌছে দিতে কাজ করে গেছেন দিনের পর দিন। স্কুলের শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও এখনো মাতৃভাষায় মারমা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের কাজের সাথে জড়িয়ে রেখেছেন নিজেকে। অসামান্য এই গুনী মানুষের জন্ম ১৬ জানুয়ারি ১৯৪৯ সালে বান্দরবনে। বাবা সা থোই অং ছিলেন বান্দরবান সদর হাসপাতালের কম্পাউন্ডার আর মা সুই ম্রা চিং পুরোদস্তুর গৃহিনী। ক্য শৈ প্রু মারমা খোকা ডনবস্কো উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি ডন বস্কো উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ৩৮ বছর শিক্ষকতার পর ২০১৪ সালে অবসরে যান। স্ত্রী ম্য য়ে প্রু মারমা ছিলেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটের অফিস সহকারী। তিনিও অবসরে গেছেন। সংসার জীবনে দুই ছেলে এক মেয়ের বাবা। বড় দুই ছেলের বিয়ে হয়েছে, তাদের বাচ্চাও হয়েছে। এখন অখন্ড অবসরে নাতিপুতিদের সাথে আর বান্দরবান ব্যাপ্টিস্ট চার্চের পালকত্বের কাজ করেই সময় কাটান। ১৯৮৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বান্দরবান ব্যাপ্টিস্ট চার্চের পালক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
শিক্ষা জীবন শুরু হয় বান্দরবান পাড়ার একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যেটা পরে বান্দরবান পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। হাই স্কুল তৎকালীন নারানগিরী পাইলট হাই স্কুল, চন্দ্রঘোণা, সেখান থেকেই এসএসসি পাশ করেন ১৯৬৬ সালে। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার স্যার আশুতোষ কলেজে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাশ করেন ১৯৬৮ সালে । দুটো প্রতিষ্ঠানই পরবর্তীতে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সে বছরই ডিগ্রীতে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পড়ালেখা আর শেষ করা হয়নি। এমন অবস্থায় ডন বস্কো উচ্চ বিদ্যালয় বান্দরবনে শিক্ষকতায় যোগ দেন তিনি।
ডন বস্কো উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময় মাতৃভাষা রক্ষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি। উনার ভাষায়, বিভিন্ন সভা সেমিনারে গেলে অনেকে জিজ্ঞেস করতো আপনার মাতৃভাষা আছে, বর্ণমালা আছে, কথাও বলতে পারেন কিন্তু আপনি কি আপনার মাতৃভাষায় লিখতে পড়তে পারেন? মাতৃভাষা থাকা সত্বেও মাতৃভাষার বর্ণমালার জ্ঞান নাই, তাতে কিছুটা লজ্জিত হলাম। সেই গুলো থেকে নিজের তাগিদ তৈরি হলো মাতৃভাষার প্রতি। বাংলা ইংরেজী ভাষা সেতো জীবন জীবিকার তাগিদ। কিন্তু নিজের আত্মার, শ্বাস-প্রশ্বাসের যে তাগিদ, নিজ জাতিসত্বার রক্ত কণিকার যে তাগিদ, হৃদপিন্ডের যে তাগিদ তার ব্যাপারে তো কোন অবদান রাখতে পারলাম না! সে থেকে নিজ প্রচেষ্টায় মাতৃভাষায় লিখতে ও পড়তে শেখা টা রপ্ত করে নিলাম। রপ্ত করার পর মনে হলো, মাতৃভাষায় শিক্ষা কেবল নিজে রপ্ত করলে তো আর হবেনা। মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রজন্মের কাছে পৌছে দেবার দায় বোধ করলাম। সেই তাগিদ থেকেই মূলত মাতৃভাষায় শিক্ষা নিয়ে কাজ করা শুরু করলাম।
যেহেতু সরকারি উদ্যোগের আগে বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান সমূহ আগে এই নিয়ে কাজ শুরু করেছিলো তাই তাদের হাত ধরেই প্রথম শিশুদের জন্য মারমা ভাষায় বই লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন ক্য শৈ প্রু মারমা। বলে রাখা ভালো কাজগুলো তিনি একা করেননি, একটা কমিটির মাধম্যে কাজগুলো সম্পন্ন হতো। কিন্তু কাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তিনি সবসময় ছিলেন। প্রথম কাজ ইউএনডিপির সাথে ১৯৯৬ সালের দিকে। সে সময় তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে মারমা-চাকমা-ত্রিপুরা ভাষা নিয়ে কাজ করেছিলো। মারমা ভাষায় বই প্রকাশের জন্য একটা ল্যাংগুয়েজ কমিটি করা হয় যেখানে তিনি সভাপতি হিসেবে বই প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে ইউএনডিপির পরিচালনায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বাচ্চাদের উপযোগী বই প্রণয়ন করেন। যেখানে মারমা ভাষাভাষী শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য মারমা ভাষার প্রাথমিক পরিচয়, বর্ণমালা পরিচিতি, সাধারণ গণনা ইত্যাদি প্রাথমিক বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত ছিলো। এটাই ছিলো মারমা ভাষায় বই প্রণয়নের তার প্রথম কাজ। পরবর্তীতে ২০০২-২০০৩ এর দিকে খ্রিষ্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশ সংক্ষেপে সিসিডিবি-র একটা প্রজেক্ট আসে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার। সেখানে তিনি আবার বই প্রণয়নের দায়িত্ব পান। সিসিডিবি তাদের স্কুলের জন্য মারমা ভাষায় বই প্রকাশের করতে তার কাছে গেলে তিনি সিসিডিবির সেই কাজে যুক্ত হন।
এরপর ২০০৫ সালে কারিতাস থেকে আসে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দায়িত্ব। সে সময় কারিতাসের তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০-৩০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো। মারমাপাড়ায় মারমা শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের উদ্দেশ্যে বই প্রকাশের সে কর্মযজ্ঞে তিনি সে বছর যুক্ত হন। সেটা কারিতাসের একটা প্রজেক্ট আইসিডিবি সিএইচটির অংশ ছিলো। সেখানে গ্রেড ১ থেকে গ্রেড ৩ পর্যন্ত বই প্রকাশের কাজ করেন তিনি। সমস্যা দেখা দিলো যখন কারিতাসের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকবৃন্দ পড়াতে গেলেন। মারমা ভাষা বলতে পারলেও নিজ বর্ণমালায় লেখা ও পড়া কেউ পারেননা। উনার ভাষায়, কারিতাস থেকে আমাকে বলা হল যে কারিতাসের স্কুলের শিক্ষকরা নিজেরাও মারমা ভাষা নিজ বর্ণমালায় লিখতে ও পড়তে পারেনা। ফলে তাদেরকেই আগে কর্মশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করার প্রয়োজন হল। ২০০৫ থেকেই ব্যাচ আকারে কারিতাস স্কুলের শিক্ষকদের মারমা ভাষায় প্রশিক্ষন দেওয়া শুরু হলো। আমি সেখানে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলাম।
কারিতাসের পর বান্দরবানের স্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইকো ডেভেলপমেন্ট বই প্রকাশের জন্য খোকা স্যারের শরণাপন্ন হন। । ২০১১-১২ তে ইকো ডেভেলপমেন্টের জন্য গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ এর বই প্রকাশ করা হয়। পরে ২০১৩-১৪ তে সেই বইয়ের উপর ইকো ডেভেলপমেন্টের স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষন দিতে হলে তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।
ইকো ডেভেলপমেন্টের সমসাময়িক সময়ে সেভ দ্য চিলড্রেন সংস্থার জন্য মারমা ভাষায় বই প্রকাশের কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। সেখানে প্রি-প্রাইমারি থেকে গ্রেড ৩ এর শিক্ষার্থীদের উপযোগী বই প্রকাশ করা হয়। সেভ দ্য চিলড্রেন কাজটি করেছিলো জাবারাং নামে এক পার্বত্য সংস্থার সহযোগীতায়। পরবর্তীতে তাদের সংস্থার স্কুলগুলোর যে শিক্ষকরা ছিলেন তাদেরকেও প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন খোকা স্যার।
এছাড়া ১৯৯৯ সালে বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে বয়স্ক শিক্ষার আদলে মারমা মাতৃভাষার প্রশিক্ষন কোর্স তৈরি ও তার উপযোগী মারমা ভাষা শিক্ষার জন্য পুস্তক প্রণয়ন করেন তিনি। যেটি এখনো বহাল রয়েছে। সেখানে তিনি প্রথমে পরীক্ষক হিসেবে ছিলেন। তারপর সেই কোর্সের প্রশিক্ষকও হন। তবে বর্তমানে আবার সেই মাতৃভাষা প্রশিক্ষন কোর্সের পরীক্ষক হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছেন।
সরকারি উদ্যোগে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলেও পরোক্ষ অংশগ্রহন করেছিলেন। সরকারি উদ্যোগে যখন আদিবাসী শিশুদের শিক্ষা উপযোগী বই প্রকাশ করা হচ্ছে সে সময় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন তিনি। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার যে পদক্ষেপ সরকার কর্তৃক নেয়া হচ্ছে তাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তিনি। দেরিতে হলেও সরকারের এই পদক্ষেপে আশার আলো দেখেন তিনি। তার ভাষায়, মারমা মাতৃভাষায় শিশু শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যাপারে এনজিওরাই অগ্রগামী, এবং তাদের ভূমিকাটাই অধিক। তবে বিলম্বে হলেও জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০র প্রেক্ষিতে সরকারি ভাবে, জানামতে প্রাক-প্রাথমিক পাঠ্যবই, প্রথম শ্রেনীর পাঠ্যবই তৈরি হয়ে গেছে। দ্বিতীয় শ্রেণীর পাঠ্যবই প্রক্রিয়াধীন। হিল ট্র্যাক্টস অঞ্চলে মারমা-চাকমা-ত্রিপুরা তিন ভাষার বই হয়েছে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের কোর্স কো অর্ডিনেটরের মাধ্যমে আমাকে অনুরোধ করা হল, যেনো প্রাক-প্রাথমিক যে বই এনসিটিবি করেছে তার উপরে কাউখালীতে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মারমা ভাষার শিক্ষকদের প্রশিক্ষন দেয়া হয়। আমি সেটা করেছি। তারমানে সরকারি ভাবে মাতৃভাষায় বই হয়েছে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে যা খুব ইতিবাচক।
মারমা মাতৃভাষায় গানও লিখেছেন । গান লেখার ব্যাপারটা খুব জোরসোরে না হলেও চর্চার মধ্যে ছিলো। চার্চের পালক হিসেবে মারমা চার্চের জন্য গান লিখেছেন তিনি। মাঝে মাঝে স্কুলের শিক্ষার্থীরা গান লিখে দিতে বললে লিখে দিতেন । সে সুবাদে মারমা ভাষায় কিছু প্রেমের গান লেখা হয়। তাছাড়া শিশুদের শিক্ষামূলক ছড়াগানও লিখেছেন। সব মিলিয়ে ২০-৩০ টার মতন গান লিখেছেন তিনি।
ক্য শৈ প্রু মারমা খোকা বান্দারবান সদরে অবস্থিত ডন বস্কো হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৭৬ সালে। কর্মজীবনে অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ নানা পুরষ্কারে ও সন্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৮৯ সালে শিক্ষা সপ্তাহ অনুষ্ঠানে বান্দরবান জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে পুরস্কার ও সন্মাননা লাভ করেন। বান্দরবান জেলা শিল্পকলা একাডেমি ২০১৪ সালে লোক সংস্কৃতি বিভাগে গুণীজন সন্মাননায় ভূষিত করেন তাকে। ২০১৫ সালে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরষদের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, গবেষণা ও সৃজনশীলতা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ সন্মাননা লাভ করেন। তাছাড়া বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট, মোনঘর, বান্দরবান একুশে বইমেলা প্রভৃতি থেকে নানান সন্মাননা গ্রহন করেন তিনি।
মাতৃভাষার মাধ্যমে যদি প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করা যায়, তবে সেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে অগ্রগতিটা খুবই সহায়ক হয়। কিন্তু পরভাষায়, পরভাষার বর্ণমালা দিয়ে যদি শুরু করা হয়, তবে ভাষাগত বৈষম্যের কারনে, ভাষাগত তারতম্যের কারনে, বোধগম্যতার বাঁধার কারনে মানসন্মত শিক্ষার যে সুযোগ, মননশীলতা সহায়ক হয়না বলেই মনে করেন তিনি। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিশুশিক্ষা শুরু করলে সেই শিশু মাতৃভাষাসহ বহুভাষিক শিক্ষার মাধ্যমে জীবনে উৎকর্ষতা সাধন করতে পারে । তাছাড়া মাতৃভাষায় শিক্ষা চালু হলে আদিবাসী বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষা বিলুপ্তির হাত থেকে রেহাই পাবে বলে মত দেন তিনি। সে জন্যেই মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রজন্মের হাতে পৌছে দিতে কাজ করে গেছেন, এখনো করে যাচ্ছেন ক্য শৈ প্রু মারমা খোকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য