ঢাকায় ফরমালিনমুক্ত পাহাড়ি সবজির দোকান

ঢাকায় ফরমালিনমুক্ত পাহাড়ি সবজির দোকান

শ্যাম সাগর মানকিনঃ ফিরোজ আলম মোহাম্মাদপুর থাকেন, ইউনিসেফে কাজ করেন। কাজীপাড়া ওভারব্রীজ সংলগ্ন ‘হিল বাজার’ দোকানে এসেছেন কেনাকাটা করতে। ‘হিল বাজার’ জুম ফসলের শাক-সবজি, ফলমূল, চাল, মশলাপাতি বিক্রি করে। আগে প্রায় আসা হলেও জ্যামের কারনে আজকাল মাঝে মাঝে আসেন এখানে, কিনে নিয়ে যান প্রয়োজন মত। ‘এখানে অর্গানিক শাক সবজি, ফলমূল বিষমুক্ত, ফরমালিনমূক্ত, পাওয়া যায় বলেই কিনতে আসি। অন্যান্য দোকান থেকে দামের তফাৎও খুব বেশি তেমন নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এখানে অর্গানিক স্বাস্থ্যকর চাল, শাক-সবজি পাওয়া যায়, বর্তমান ভেজালের সময়ে দেশে যা প্রায় দুষ্প্রাপ্যই, তাই আসি’ বলে ‘হিল বাজারে’ কেনাকাটা করতে আসার কারন জানালেন ফিরোজ আলম। এমন অনেকেই আসেন কেনাকাটা করতে ঢাকার মিরপুরের কাজীপাড়াতে থাকা পাহাড়ি দোকান ‘হিল বাজার’, ‘রানন্যে জুম ঘর’ ও ‘জুম চাব স্টোর’ এ।
পার্থ প্রতীম চাকমা(৪০) গত চার বছর ধরে ‘হিল বাজার’ দোকান সামলান। আগে অন্যরা সামলাতো। ২০১৪ থেকে কিনে নিয়েছেন তিনি। মিরপুর পূর্ব কাজীপাড়া ফুটওভারব্রীজের সাথে একটা গলির মুখেই দেখা যায় দোকানটি। পার্থর বাড়ি খাগড়াছড়িতে। সেখান থেকেই প্রতিদিন ৮-১০ হাজার টাকার বিভিন্ন শাক-সবজি, ফলমূল, চাল, মশলাদি, বিভিন্ন মাংস, মাছ ইত্যাদি নিয়ে আসেন। দোকানে পাহাড়ি জুম ফসলের বিভিন্ন তরকারি, সবজি তারা, ঢেঁকি শাক, থানকুনি, শুকনা মুলা, শিমুলের ফুল, ঢেঁকি তে ভাঙানো গুড়া মশলা, জুমের চাল, বিন্নি চালসহ, বিভিন্ন ফরমালিনমুক্ত ফলমূল আনারস, বেল, কাঠাল প্রভৃতি পাওয়া যায়। তাছাড়া পাহাড়ি মুরগীর মাংস, শুকরের মাংস, ব্যাঙের মাংস, কাপ্তাই লেকের মাছ ও বিভিন্ন শুটকিও পাওয়া যায়। বিভিন্ন তরকারি, শাক সবজি, ফরমালিন মুক্ত, বিষমুক্ত বলে পাহাড়িদের পাশাপাশি অনেক বাঙালি ক্রেতাও কিনতে আসেন বলে জানান দোকানি পার্থ প্রতীম চাকমা। কাজীপাড়াতেই একটু ভিতরে তার আরেকটা দোকান আছে যেখানে কেবল ফলমূল বিক্রি করেন বলেও জানালেন তিনি। আগামী বছর নাগাদ মোহাম্মদপুরে নতুন দোকান করার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন পার্থ।
কাজীপাড়াতেই ডাচ বাংলা ব্যাংক বুথ ও ওয়ালটনের শোরুমের পাশে আরেকটা ‘রানন্যে জুম ঘর’ নামে পাহাড়ি দোকান রয়েছে। অমিত চাকমা(৩৫) র মালিকানায় ৪ বছর হলেও দোকানের বয়স প্রায় ৮-৯ বছর হয়েছে। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি থেকেই মূলত প্রতিদিন নিয়ে আসেন বিভিন্ন তরকারি, মাংস, মাছ, শুটকিসহ নানান ফলমূলাদি। দোকানে পাহাড়িদের নিত্য খাবারের সিদোল, শূটকি, বাচ্চুরি, বেগুল, ডাটা শাক, বন্য শুকর, কাকড়া, পাহাড়ি মুরগি,হাঙর, ব্যাঙ, চালতা, টক পাতা প্রভৃতি পাওয়া যায় এখানে। মিরপুরসহ আশেপাশের বসবাসরত আদিবাসী পাহাড়িরাসহ অনেক বাঙালিও কিনে নিয়ে যান প্রয়োজনীয় তরিতরকারি, ফলমূল, মাছ-মাংস। তাছাড়া ‘রানন্যে জুম ঘর’ হোম ডেলিভারি সার্ভিস দিয়ে থাকেন। ফোনে অর্ডার করলেই প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে পৌছে দিয়ে আসেন বাসায় বাসায়। অমিত চাকমা কয়েকবছর আগে ছাত্রত্ব শেষ করে এ দোকান কেনেন। তবে অনেক দূর থেকে আনার ফলে খরচপাতি বেশি হয়, সে তুলনায় খুব লাভ হয়না বলেই জানালেন তিনি। তবুও ভাল কোন চাকরি পাবার আগে দোকান সামলাবেন বলেই জানালেন অমিত।
একই মত ‘জুম চাব স্টোর’রের মালিক মেধাংকর চাকমা মিন্টু (৪০) র। খুব একটা লাভালাভ নাই বলে হালকা কৌতুকের সুরে এটাকে সেবামূলক কাজই বললেন। তিনি হিলবাজার দিয়ে শুরু করেছিলেন এই ব্যবসার কাজ। বর্তমান দোকানটি কেনা ৬-৭ মাস হল। এমনিতে দোকানের বয়স দেড় বছর চলছে। কাজীপাড়া ‘স্বপ্ন’র পাশের গলিতে ঢুকে পনেরো বিশ কদম সামনে গিয়ে হাতের বাম পাশে এগিয়ে গেলেই পাওয়া যায় দোকানটি। মিন্টুর বাড়ি খাগড়াছড়ি দিঘীনালায়, সেখান থেকেই নিয়ে আসেন প্রতিদিনের শাক-সবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস। । সেখানে জুম ফসলের শাক-সবজি, সিদোল, হাঙরমাছ, শুটকি, ব্যাঙ, শুকর মাংস, বিভিন্ন মৌসুমি ফলমূল কলা, আনারস, বেল প্রভৃতি পাওয়া যায়। ক্রেতা মূলত ঢাকায় বসবাসরত আদিবাসীরাই তবে বাঙালি ক্রেতারাও আসে বলে জানালেন দোকানি। বাঙালিরা আসে ফরমালিনমুক্ত শাক-সবজি, ফলমূল পাওয়া যায় বলেই।
ছোট ছোট উদ্যোগের এই পাহাড়ি জুম ফসলের দোকানগুলো অর্গানিক ও স্বাস্থ্যকর তরকারি, সবজি, ফলমূল বিক্রি করে বলে বাঙালি ও আদিবাসি সবার কাছেই আস্থা পাচ্ছে। তবে পার্বত্য জেলা থেকে আসা এমন অর্গানিক, স্বাস্থ্যকর, ফরমালিন বা বিষমুক্ত তরকারি, সবজি, ফলমূল পাহাড়ি উদ্যোগতাদের খরচ বাড়িয়ে দেয় বলে লাভের অংকটা খুব বেশি হয়ে ওঠেনা। তবুও ঢাকায় বসবাসরত আদিবাসী পাহাড়িদের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় তরকারি, সবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস যোগান দিয়ে যাচ্ছে এসব ছোট ছোট ‘হিল বাজার’, ‘রানন্যে জুম ঘর’ ও ‘জুম চাব স্টোর’ পাহাড়ি দোকানগুলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য