অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: আরাকানে ৫ শতাধিক পাহাড়ি পরিবার দেশান্তরিত

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: আরাকানে ৫ শতাধিক পাহাড়ি পরিবার দেশান্তরিত

বিশেষ প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতা, নানা ধরনের বঞ্চনা, জুম চাষযোগ্য ভূমি সীমিত হওয়া, জীবন-জীবিকার অভাব ইত্যাদি কারণে এবং মিয়ানমার সরকারের নানা প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে বিগত ৪/৫ বছরে বান্দরবান জেলার আলিকদম, থানচি, নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ইত্যাদি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে পাঁচ শতাধিক আদিবাসী পরিবার মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে বলে জানা গেছে। দেশান্তরিত আদিবাসী পরিবারদের মধ্যে ম্রো, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা জাতির লোক রয়েছে। এছাড়া কয়েক পরিবার ত্রিপুরা জাতির লোকও রয়েছে বলে জানা গেছে।

সরেজমিন তদন্তে জানা যায় যে, বাংলাদেশের মধ্যে নানা বঞ্চনা, নিপীড়ন-নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে এসব আদিবাসী পরিবার রাখাইন রাজ্যে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে। বন বিভাগ, নিরাপত্তা বাহিনী ও বিজিবি বাধার কারণে জুম চাষ করতে না পারা, জনসংখ্যার বৃদ্ধির ফলে জুম চাষের জমির অভাব, হাজার হাজার জুমভূমি ও মৌজা ভূমি অস্থানীয়দের নিকট লীজ দেয়া, এলাকা ছেড়ে চলে যেতে আদিবাসীদের প্রতি লীজ মালিকদের হুমকি ও হামলা, রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালি কর্তৃক আদিবাসীদের বিভিন্ন এলাকা বেদখল হওয়া, রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালি অনুপ্রবেশের আশঙ্কা, গ্রামের মধ্যে বা সন্নিকট এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন, নিরাপত্তা বাহিনী ও বিজিবির নিপীড়ন-নির্যাতন, বনজ সম্পদ উজার হওয়া, পানীয় জলের অভাব ইত্যাদির কারণে আদিবাসীরা বাংলাদেশে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে।

আরো জানা যায় যে, নিরাপত্তা বাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা বিনা পারিশ্রমিকে ক্যাম্পের আশেপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করতে স্থানীয় আদিবাসী পরিবারসমূহকে বাধ্য করে থাকে। মাসে কমপক্ষে একবার নামমাত্র মূল্যে ক্যাম্পে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগী প্রদান করতে হয় বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করে। এছাড়া সদস্যরা আদিবাসীদেরকে সময়ে অসময়ে ক্যাম্পে তলব করা, আদিবাসীদের বাড়ি তল্লাসী, অবৈধ গ্রেফতার, মারধর ও হয়রানি করা, ভূমি বেদখলে সেটেলারদেরকে সহায়তা করা ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার বলে গ্রামের অনেকে জানিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, আলিকদমের বুলাই পাড়ার পাশে সুলতান নামে এক সেটেলার বাঙালি বাস করেন। বর্তমানে তিনি রেংখুম কার্বারী পাড়ায় স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছে। প্রথমে তিনি ছিলেন সামান্য একজন শুটকি ব্যবসায়ী। কিন্তু বর্তমানে তিনি অনেক জমির মালিক। বর্তমানে তিনি একজন ভূমি দখলকারী। ভূমি সংক্রান্ত কোন সমস্যা হলেই পাশের বুলাই পাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পে আপত্তি পেশ করে থাকে এবং বিচারে বরাবরই ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ সুলতানের পক্ষে রায় দিয়ে থাকে। ফলে সুলতানের নাম শুনলেই স্থানীয় ম্রো গ্রামবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে উঠে।

এসব প্রত্যন্ত এলাকার আদিবাসীরা অশিক্ষিত হওয়ায় তারা রোহিঙ্গা বা বাঙালি দেখলে ভয় পেয়ে থাকে। রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিরা প্রচার করে যে, আদিবাসীদের এলাকায় রোহিঙ্গাদেরকে পুনর্বাসন করা হবে। আদিবাসীরা এসব এলাকায় থাকতে পারবে না। আগে থেকে সেখান থেকে চলে যেতে তাদেরকে বাধ্য করার জন্য গুজব ছড়ানো হয়। যেমন নাইক্ষংছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নে ২৭০নং নাইক্ষ্যংছড়ি মৌজায় সাতগজ্জাই চাক আদিবাসী পাড়ার চাক পরিবারসমূহকে ভূমিবেদখলকারী সশস্ত্র বাঙালি দুর্বৃত্তরা গ্রাম ছেড়ে হুমকি দেয় এবং তারই ফলশ্রুতিতে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখ সাত পরিবার চাক গ্রামবাসী গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। ২০১৩ সালে এপ্রিল মাসে নাইক্ষ্যংছড়ির বাদুঝিড়ি চাকপাড়ার ২১ পরিবার চাক গ্রামবাসীকে তাদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করা হয়।

বন বিভাগের সামাজিক বনায়নে সেটেলার বাঙালিদেরকেও সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির ফলে বাঙালি অনুপ্রবেশ জোরদার হয়। সেটেলার বাঙালিরা চুরি করে সামাজিক বনায়নের গাছ-বাঁশ কেটে নিয়ে যায়। কিন্তু বন বিভাগ আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে থাকে। রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে গাছ-বাঁশ চুরি হলেই বন বিভাগের লোকেরা নীরহ আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে থাকে। এভাবে মামলার ভয়ে ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে আদিবাসীরা মিয়ানমারে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে।
এসব উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে। আর যেখানেই রাস্তা নির্মিত হচ্ছে সেখানে সেটেলার বাঙালিদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। যেমন বর্তমানে আলিকদম উপজেলার কুরুকপাড়া ইউনিয়নে অনেক নতুন নতুন রাস্তা নির্মিত হয়েছে। এসব নতুন রাস্তা ধরে অনেক সেটেলার বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে, অপরদিকে স্থানীয় ম্রো গ্রামবাসীরা তাদের স্ব স্ব গ্রাম ছেড়ে আরো গহীন জঙ্গলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। নতুন রাস্তা হওয়ার ফলে ম্রো আদিবাসীদের মধ্যে বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা যায় যে, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন এলায়েন্স নামে একটি এনজিও আলিকদম ও থানচি উপজেলার দুর্গম এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার একর পাহাড় ভূমিতে বন সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। থানচিতে একটি প্রাকৃতিক রঙ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়। এসব এলাকা হচ্ছে স্থানীয় মারমা, ম্রো ও ত্রিপুরাদের জুম ভূমি ও বন বিভাগের বনাঞ্চল। এর ফলে স্থানীয় মারমা, ম্রো ও ত্রিপুরা গ্রামবাসীরা উচ্ছেদ হয়ে পড়ার আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে এসব এলাকা থেকে অনেক আদিবাসী পরিবার মিয়ানমারে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে জানা গেছে।

আরো জানা যায় যে, নাইক্ষ্যংছড়ি, আলিকদম ও লামা উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে রোহিঙ্গা সশস্ত্র জঙ্গীদের অবস্থান রয়েছে। তারা স্থানীয় আদিবাসীদেরকে জুম চাষে বাধা দেয়। জঙ্গলে গাছ-বাঁশ, বনের শাক-সবজী ও ছড়ার মাছ-কাঁকড়া খুজতে গিয়ে কিংবা গৃহ পালিত গরু-মহিষ চড়াতে গিয়ে অনেক আদিবাসী ব্যক্তি এসব রোহিঙ্গা জঙ্গীদের হামলা, অপহরণ ও হত্যার শিকার হয়। যেমন গত ২৭ নভেম্বর ২০১৭ নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুনধুম ইউনিয়নের গর্জনবনিয়া এলকার পূর্ব বড়ইতলী গ্রাম থেকে জনৈক আদিবাসীকে রোহিঙ্গা জঙ্গীরা অপহরণ করে। পরে স্থানীয় বাঙালিদের সহায়তা তিনি ছাড়া পান। ১৫ মে ২০১৫ সালে নাইক্ষ্যংছড়িতে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে গলাকেটে হত্যা করে। ছড়ায় মাছ-কাঁকড়া খুঁজতে গিয়ে ২০১৫ সালে তিনজন মারমা গ্রামবাসীকে রোহিঙ্গা জঙ্গীরা অপহরণ করে। তারপর উক্ত তিন গ্রামবাসী আর ফিরে আসেনি।

অপরদিকে বাংলাদেশের ও মিয়ানমারের কিছু স্থানীয় আদিবাসী দালাল প্রচার করে যে, বাংলাদেশের আদিবাসীরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গেলেই তাদের দেওয়া হচ্ছে চাষের জমি, গরু, তিন বছরের জন্য প্রতিমাসে রেশন ও চাষাবাদের উপকরণ, থাকার জায়গা এবং নগদ অর্থ সহায়তা। এমন উড়ো মিথ্যা খবর বিশ্বাস করে বাংলাদেশ ছেড়ে গেছে এসব আদিবাসী পরিবার। এ কথা বিশ্বাস করে নিরাপদে থাকা ও খাওয়ার আশায় বান্দরবানের আলীকদম, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি ও থানচি উপজেলার সীমান্তবর্তী প্রত্যক্ষ এলাকা থেকে শত শত পরিবার দেশ ত্যাগ করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলে গেছে। যেমন এক সময় আলিকদম উপজেলার পোয়ামুড়ি ইউনিয়নে প্রায় ৪০০টির মতো ম্রো জাতির গ্রাম ছিল। বর্তমানে সেখানে মাত্র ২০টি ম্রো গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামের আশেপাশে চাষযোগ্য যে চর ভূমি ছিল সেগুলো বর্তমানে সেটেলার বাঙালিরা জবরদখল করেছে এবং ভোগদখল করছে। ২০১৪-১৫ সালে দালালের মাধ্যমে আলিকদমের প্রায় ৩০০ ম্রো পরিবার মিয়ানমারে চলে যায়। এ সময় দালালরা প্রতি পরিবার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে আদায় করে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি সরেজমিন তদন্তে জানা গেছে যে, এ বিশ্বাসের উপর ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ৬ মাসের মধ্যে বান্দরবানের আলিকদম ইউনিয়নের সীমান্ত সংলগ্ন কুরুকপাতা ইউনিয়নের ৫ ওয়ার্ডের ৯টি পাড়া থেকে ২৬ পরিবারের ১৩৯ জন বাংলাদেশী আদিবাসী নাগরিক জন্মভূমি ছেড়ে মিয়ানমারে চলে গেছে। এ ছাড়া উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের বাসুদেব কারবারী চাকমা পাড়া থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৪টি চাকমা পরিবার ও ৪টি তঞ্চঙ্গ্যা পরিবার মিয়ানমারে চলে গেছে। এছাড়া আলিকদম উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ১৪৮ পরিবারের তালিকা এবং কুরুকপাড়া ইউনিয়নের ১২১ পরিবারের তালিকা পাওয়া গেছে যারা বিগত ২/৩ বছরের মধ্যে মিয়ানমারে চলে গেছে।
স্ব-পরিবারে দেশ ত্যাগ করতে গিয়ে মিয়ানমার অংশে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে অনেক আদিবাসী পরিবারের লোকজন নিহত ও আহত হওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। এমনকি মিয়ানমারের বিদ্রোহী ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার ক্রস ফায়ারেও দেশান্তরিত অনেক আদিবাসী মারা গেছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে আরসা বিদ্রোহী কর্তৃক মিয়ানমার পুলিশ ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনার পর মিয়ানমারে পাড়ি দেয়া অনেক আদিবাসী পরিবারও আরসা বিদ্রোহীর হামলা ও হত্যার শিকার হয় বলে জানা গেছে।

আরো জানা যায় যে, ২০১৭ সালের শেষের দিকে থানচি উপজেলা থেকে ৫০/৬০ আদিবাসী পরিবার মিয়ানমারে চলে যায়। সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময় তারা মিয়ানমান সীমান্ত পুলিশ বাহিনী কর্তৃক ধৃত হয়। পরে তাদেরকে মিয়ানমারের জেলে প্রেরণ করা হয়। মিয়ানমারে পাড়ি দিয়েও সরকারের কোন সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে অনেক আদিবাসী পরিবার বাংলাদেশে আবার ফেরত এসেছে (দৈনিক কক্সবাজার, ২০ মার্চ ২০১৮)। প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও দেশান্তরিত পরিরবারসমূহকে ঠিকমত রেশন দেয়া হয় না, চাষযোগ্য জমি ও ঘরবাড়ি দেয়া হয় না। তাদেরকে ঝুপড়িতে রাখা হয়। সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরে তারা বর্তমানে দুর্বিষহ জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।
এমনিতর অবস্থায় ২০১৮ সালের প্রথম দিক থেকে বান্দরবান জেলার একদল স্থানীয় ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা ও মারমা আদিবাসী অধিকার কর্মী আলিকদম, লামা, থানচি ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় সফর শুরু করেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী গ্রামে গ্রামে গিয়ে আদিবাসীদেরকে এলাকা ছেড়ে মিয়ানমারে চলে না যেতে বারণ করছেন। মিয়ানমারে গেলে আরো বঞ্চনা ও প্রতারণার শিকার হবেন বলে জানিয়ে দিচ্ছেন। নিজ দেশে চাষাবাদ করে বেঁচে থাকার জন্য আদিবাসী গ্রামবাসীদেরকে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন।
এদিকে আলিকদম উপজেলা প্রশাসন জরুরী ভিত্তিতে গত গত ১৫ মার্চ ২০১৮ উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলার চারটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-সদস্যদের নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে বৈঠক করেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপজেলায় বসবাসরত জনসাধারণকে এ রকম মিথ্যা ও উড়ো কথা বিশ্বাস না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

মূল কারণ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া:
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘ ২০ বছর অতিক্রান্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলী হস্তান্তর; পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ; ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার; ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ, ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের স্ব স্ব জায়গা-জমি প্রত্যর্পণসহ পুনর্বাসন; অস্থানীয়দের নিকট প্রদত্ত ভূমি ইজারা বাতিল, প্রতি পাহাড়ি পরিবারসমূূহকে দুই একর করে চাষযোগ্য জমি বন্দোবস্তী প্রদান করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকুরিতে জুম্মদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়োগ, চুক্তির সাথে সঙ্গতি বিধানকল্পে পুলিশ এ্যাক্ট, পুলিশ রেগুলেশন ও ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য আইন সংশোধন; সেটেলার বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন ইত্যাদি চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।
চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় জুম্মদের আবাসভূমি ও ধর্মীয় স্থানসহ রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় ভূমি বেদখল এবং স্বভূমি থেকে তাদেরকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও আইন মোতাবেক জুম্ম জনগণের ভূমি অধিকার নিশ্চিত না করে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের নামে, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের নামে, রিজার্ভ ফরেষ্ট ঘোষণার নামে, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হর্টিকালচার ও রাবার চাষের নামে ইজারা প্রদান করে হাজার হাজার একর জুম্মদের সামাজিক মালিকানাধীন জুমভূমি ও মৌজাভূমি জবরদখল করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পরও ভূমি জবরদখলের কারণে কেবলমাত্র বান্দরবান জেলায় আদিবাসী জুম্মরা তাদের ৩০টি গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। শত শত আদিবাসী পরিবার এখনো উচ্ছেদের মুখে রয়েছে এবং তাদের জীবনজীবিকা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনিতর অনিরাপদ ও নিশ্চিত পরিস্থিতিতে স্থানীয় আদিবাসীরা মিয়ারমারে দেশান্তরিত হতে উৎসাহিত হচ্ছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য