নাহার পুঞ্জির উচ্ছেদ নোটিশ মানি নাঃ পাভেল পার্থ

নাহার পুঞ্জির উচ্ছেদ নোটিশ মানি নাঃ পাভেল পার্থ

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট ইউনিয়নের নাহার চা বাগানের কাছের আসলমও কাইলিন খাসি পুঞ্জি। মূলত আদিবাসী খাসিরা দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে সেখানে পানজুম করে বসবাস করছেন। খাসি ভাষায় গ্রামকে বলে পুঞ্জি। আসলম ও কাইলিন খাসি পুঞ্জি দুটি বাঙালিদের কাছে নাহার পুঞ্জি নামেও পরিচিত। নিদারুণভাবে ৩৪ বছর বয়সী নাহার খাসি পুঞ্জির কাছে এক উচ্ছেদ নোটিশ পাঠিয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সরকারের পক্ষে মৌলভীবাজার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত এ উচ্ছেদ নোটিশটি ২০১৬ সনের ৩০ মে তারিখের। ‘অবৈধ দখল অপসারনের নোটিশ’ নামের এই নোটিশ খানা শ্রীমঙ্গল থানায় দায়েরকৃত একটি উচ্ছেদ মামলার মাধ্যমে জারিকৃত (মামলা নং-০৮/২০১৫-২০১৬)। নাহার পুঞ্জির লুটমন পলং ও পেরলি খাসিয়া বরাবর পাঠানো এ নোটিশটির স্মারক নং-০৫.৪৬.৫৮০০.০১৫.১০০.০৩.১৫.৩৫০(৩)। নোটিশটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং সহকারী ভূমি কমিশনার প্রেরিত প্রতিবেদন সাপেক্ষে জেলা প্রশাসক নিশ্চিত হয়েছেন উল্লিখিত নোটিশ প্রাপকেরা শ্রীমঙ্গলের চলিতাছড়া মৌজার (জেএল নং-১০৫, খতিয়ান নং-১, দাগ নং-১) ১৫০ একর ১নং সরকারি খাস খতিয়ান সরকারি ভূমি অবৈধভাবে পান চাষের মাধ্যমে ভোগদখল করে আছে। ‘সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ভূমি ও ইমারত (দখল ও পুনরুদ্ধার) অধ্যাদেশ ১৯৭০ এবং তৎসহ পিও ৮৫/৭২ এর ৫(১) ধারা অনুযায়ী ১২ জুনের আগে নাহার পুঞ্জি অবৈধ দখল ত্যাগ ও পান গাছ অপসারণের অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। আর তা না হলে সরকার পুলিশ ফোর্সসহ ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সৃজিত পান গাছ অপসারণ করে নাহার পুঞ্জিবাসীকে উচ্ছেদ করে এই জমি সরকারের দখলে আনা হবে।

২.
উচ্ছেদ নোটিশের ১২ জুন চলে গেছে। বিস্ময়করভাবে সেই দিনে ১৯৯৬ সনে রাঙামাটির নিজ গ্রাম থেকে অপহৃত হয় আরেক আদিবাসী কল্পনা চাকমা। এখন নাহার পুঞ্জির নারী, পুরুষ, শিশু ও প্রবীণেরা কী করবেন? ৩৪ বছরের সাজানো সংসার, পানজুম আর জন্মমাটি ছেড়ে কোথায় যাবেন? সরকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আর সহকারী ভূমি কমিশনারের তথাকথিত প্রতিবেদন বিশ্বাস করল। ৩৪ বছর ধরে বসবাসরত আদিবাসী খাসিদের কথা একটিবারের জন্যও শুনল না। যেখানে সরকার আদিবাসীসহ দেশের সকল গরিব নিম্নবর্গের জন্য কাজ করছে, সেখানে কিছু সরকারি কর্মকর্তার এমনতর নিজস্ব মর্জিমাফিক প্রতিবেদন সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় ফেলতে যথেষ্ট। ৩৪ বছর বয়সী একটি গ্রাম কী এমনি এমনি গড়ে ওঠেছে? এই গ্রাম কী বাংলাদেশের রাজস্ব বৃদ্ধি আর জাতীয় উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখেনি? উচ্ছেদ নোটিশটি দেয়ার আগে সরকারের একটিবার চিন্তা করবার দরকার ছিল। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে জোর করে ৩৪ বছরের কোনো গ্রাম উচ্ছেদ করা যায় না। উচ্ছেদ নোটিশটি এমনি এমনি তৈরি হয়নি। এর পেছনে সুস্পষ্টভাবে কর্পোরেট চা বাণিজ্যের ধান্ধা আছে। অন্যায়ভাবে টাকা পয়সা হাতানোর কারসাজি আছে। কারণ নাহার খাসি পুঞ্জি নিয়ে এই জটিল বিবাদ দীর্ঘ দিনের। একে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত নাহার চা বাগান এবং সেলিম ট্রেডার্স নামের একটি কাঠ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এই বিবাদকে নানা সময় নানা দিকে মোড় দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে? মানুষ দেখেছে সরকার একটি গ্রামের মানুষকে তার কৃষি উৎপাদন সমূলে ধ্বংস করে উচ্ছেদ হওয়ার নোটিশ দিয়েছে। মানুষ না দেখেছে চা বাগানের ফায়দা, না জেনেছে কাঠ ব্যবসায়ীর লোভ। এতে বর্তমান সরকারের মানবিক চেহারায় দাগ পড়েছে। সরকারের দায়িত্ব নাহার পুঞ্জি বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সমন্বিত নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কারণ তা না হলে এই ঘটনা সরকারের সাথে জনগণের এক দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা তৈরি করবে। যে কোনো মন্দ কাজ ও ভাল কাজের খবর খুব দ্রুত সংক্রমিত হয় বলে এর প্রভাব অনেকের মনকেই বিষিয়ে তুলবে। আমি নিশ্চিত রাজনৈতিক সরকার এই উচ্ছেদ নোটিশ তৈরি করেনি, জনগণ এবং বাস্তুতন্ত্র বিচ্ছিন্ন সরকারি আমলারাই এটি করেছেন। উচ্ছেদ আতংকে থাকা নাহার পুঞ্জির গরিব আদিবাসী খাসিরা তাই এখনও সরকারের উপর বিশ্বাস রেখেছেন। বিশ্বাস করছেন সরকার কোনোভাবেই কাউকে জোর করে জন্ম-মাটি থেকে উচ্ছেদ করতে পারে না। পানজুম লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে না। টিলা বনের খাদ্য শৃংখল ওল্টেপাল্টে দিবে না। আমরাও বিশ্বাস করি, নাহার পুঞ্জি বিষয়ে সরকারি আমলা নয়, দরকার সরকারের রাজনৈতিক সাড়া ও সিদ্ধান্ত।

৩.
আসুন এই সাম্প্রতিক উচ্ছেদ নোটিশের তলায় কী কী আছে একটু স্মরণ করি। ১৯৬০ সনে প্রায় ৩৫০ হেক্টর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠে নাহার চা বাগান। নাহার চা বাগান থেকে ২০০ একর জায়গা নিয়ে ১৯৮২ সনে গড়ে ওঠে আসলম বা নাহার পুঞ্জি-১। পাশাপাশি কাইলিন পুঞ্জিটি গড়ে ওঠায় সেটিও নাহার পুঞ্জি-২ নামে পরিচিতি পায়। এ পর্যন্ত তিনবার নাহার চা বাগানের মালিকানা বদল হয়। পুঞ্জির লোকজন বছরে ২৫,০০০ টাকা ইজারার জন্য খাজনা হিসেবে নাহার চা বাগানকে দেয়। নাহার পুঞ্জির বর্তমান কর্তৃপক্ষ আসলম পুঞ্জির খাসিদের প্রতি বছর ২০ একর করে জমি ছেড়ে দিয়ে পুঞ্জির জায়গাটি ছেড়ে দেয়ার কথা বলে। নাহার চা বাগান কর্তৃপক্ষ খাসি পুঞ্জি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করতে দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরণের কৌশল নিয়েছে। এমনকি দৈনিক প্রথম আলোকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নাহার চা বাগানের ব্যবস্থাপক পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্যও জানান, আমরা চা বাগানের আয়তন বাড়াতে তাঁদের উচ্ছেদে এখন আইনি পদক্ষেপ নেব (দেখুন, ৯ জুন ২০১৪)। তাহলে রাষ্ট্র হিসেবে কি বাংলাদেশ তার জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কোনো দায় ও দায়িত্ব নিবে না। ইচ্ছে হলেই চা বাগানের মতো কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য বা কোনো তেল-গ্যাস কোম্পানির খনন কাজের জন্য মানুষ কী বন্যপ্রাণী উচ্ছেদ আর নিহত হবে নিরন্তর। স্মরণ করে দেখুন ১৯৯৭ সনের ১৪ জুন মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল মাগুরছড়া গ্যাস ক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেয়। উচ্ছেদ হয়ে যায় লাউয়াছড়া, মাগুরছড়া ও জাগছড়ার অনেক খাসি আদিবাসী। আগুনে পুড়ে যায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি লাউয়াছড়া। রাষ্ট্র কী তবে নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না? জিম্মি হয়ে আছে নানা কর্পোরেট কোম্পানির বাণিজ্যের কাছে?

৪.
এর আগেও বহুবার নাহার পুঞ্জির প্রাণ ও প্রকৃতি জখম করতে রাষ্ট্রকে জিম্মি করেছে এজেন্সি ও কোম্পানি। ২০০৮ সালের ৩০ জুন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় নাহার চাবাগানের কাইলিন খাসি পানপুঞ্জি এলাকার গাছ কাটার রাষ্ট্রীয় অনুমোদন দেয়। ৭ আগস্ট ২০০৮ তারিখে ৪৭ লাখ ৫১ হাজার ৩৯১ টাকা রাজস্ব নির্ধারণ করে নাহার চাবাগানের বিভিন্ন প্রজাতির চার হাজার গাছ কাটার অনাপত্তি দেয় বাংলাদেশ বনবিভাগ। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ হাইকোর্টও নাহার পুঞ্জির গাছ কাটার পক্ষে সাম্প্রতিক প্রতিবেশ বিনাশী রায় ঘোষণা করে। ১৪ মার্চ ২০১০ তারিখে দ্য ডেইলি স্টার, ১৭ মার্চ ২০১০ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পাতায় নাহার চা বাগানের নাহার পুঞ্জি এলাকার গাছ হত্যার নির্মম ছবি ছাপা হয়। চা বাগানের জন্য জমি ইজারা আইন ভঙ্গ করে ১৯৮৪ সন থেকে এ পর্যন্ত নাহার চা বাগান কর্তৃপক্ষ খাসিদের কাছ থেকেও ২০০ একর জমির জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা ভূমি কর অন্যায়ভাবে গ্রহণ করেছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ আইন, জাতিসংঘের আহামরি প্রাণবৈচিত্র্য সনদ কোনোকিছুই নাহার পুঞ্জির গাছদের জীবন বাঁচাতে পারেনি। শুধু গাছ নয়, নাহার পুঞ্জি উচ্ছেদ করবার জন্য কর্পোরেট চা কোম্পানির তৈরিকৃত এই বিবাদে জান দিতে হয়েছে চা বাগানের নিতাই তাঁতিকে। ৩০ মে ২০১৪ আসলম পুঞ্জি (নাহার খাসি পুঞ্জি-১) ও নাহার চা বাগানের শ্রমিকদের ভেতর ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ঘটে। আসলম পুঞ্জির দায়মন লামিন, ক্যেমেন খংস্থিয়া, টিউস ছেল্লা এবং নাহার চা বাগানের টিলাক্লার্ক ডিএম নাঈম ও রুবেল মিয়া আহত হয়। টিপরাছড়া চা বাগানের উদ্বৃত্ত শ্রমিক নিতাই তাঁতী ২ জুন ২০১৪ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় ২ জুন শ্রীমঙ্গল থানায় নাহার চা বাগানের ব্যবস্থাপক এবং নাহার খাসি পুঞ্জির আখতার ধার দুটি মামলা করেন।

৫.
আদিবাসী খাসিরা চোখের সামনে বৈরাগী পুঞ্জি, শীতলা পুঞ্জি, জোলেখা পুঞ্জি, নার্সারী পুঞ্জি, ফুলতলা পুঞ্জি দখল হয়ে যেতে দেখেছেন। বহিরাগত বাঙালি, বনবিভাগ আর চা বাগান খাসিদের ভূমি নিয়ন্ত্রণ করে। প্রস্তাবিত কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৫ পানজুমসহ খাসি পুঞ্জির মতন দেশের এমনসব অনন্য কৃষিজমি সুরক্ষার কথা বলেছে। মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন থেকে যে উচ্ছেদ নোটিশটি এসেছে সেখানে নাহার পুঞ্জিকে সরকারি খাস খতিয়ান বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক ডেইলি স্টারকে জানিয়েছিলেন, বিরোধপূর্ণ জায়গাটি খাস জমি, তবে এটি জেলা প্রশাসনের না বনবিভাগের তা তিনি নিশ্চিত নন (দেখুন, ১ জুন ২০১৪)। আমরা আশা করবো অমানবিক উচ্ছেদ নোটিশটি বাতিল করে সরকার নাহার পুঞ্জির বিবাদকে রাজনৈতিকভাবেই দেখবে। নিশ্চিত করবে খাসি জনগণসহ প্রাণ ও প্রকৃতির ন্যায়বিচার।

পাভেল পার্থ। লেখক ও গবেষক। [email protected]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য