লংগদুর আগুন নিভেছে কী?- সতেজ চাকমা

লংগদুর আগুন নিভেছে কী?- সতেজ চাকমা

আজ ২ জুন। কিছুক্ষণ আগে কোনো একটা বই খুঁজতে আমাদের জগন্নাথ হলের বড়গাঙ রুমে লাইব্রেরীর তাকে হাত দিলাম । হঠাৎ নজরে এলো গুনমালা চাকমা’র পুড়ে যাওয়া হাড়! মনে আছে বিগত বছরের আজকের এই দিনের সেই লংগদুর পাহাড়ী জনপদের আগুন সন্ত্রাসের গল্প । গল্প নয় সত্যি ঘটনা । এ ঘটনার সাক্ষী হলেন ৭০ বছরোর্দ্ধ গুনমালা চাকমা এবং আমরা সবাই ।
দিঘীনালার চার মাইল এলাকায় নুরুল ইসলাম নয়ন নামের এক সেটলার বাঙালীর লাশ পাওয়াকে কেন্দ্র করে গত বছর এই দিনে সাম্প্রদায়িকতার গুজব রটিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ২১৪ টি পাহাড়ী পরিবারের সাজানো সংসারের স্বপ্ন ও সমগ্রতা ।
সেই সাথে পুড়িয়ে মারা হয় গুনমালা চাকমা নামের সেই বয়সী মহিলাটিকে । যার একখন্ড হাড় সংগ্রহে আছে আমাদের বিভিন্ন বইয়ের সাথে ছোট্ট সংগ্রহশালায় । মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দেয় এই একখন্ড হাড়টি কেমন আছে আমার পাহাড় ?
হত্যা,ধর্ষণ,হামলা,অগ্নিসংযোগ থেকে শুরু করে এমন কিছু কী বাকী আছে যা পাহাড়ে ঘটে না ? এইসবই কেমন যেন হয়ে গেছে সবুজ পাহাড়ের নিত্যদিনের রুপ, রং । আর মন্দের ভালোর এই বাস্তবতায় যাপিত হচ্ছে পাহাড়ীদের ফ্যাকাসে জীবন।
পাহাড়ের এই সাধারণ চিত্রের মধ্যে এই লেখাটির দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে চায় কেবল লংগদুর দিকে । কারন একখন্ড লংগদুর পোড়া পাহাড়ী জনপদই তো পুরো পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি । ১৯৮৯ সালের ৪ মে লংগদু গণহত্যা ! তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ এর লংগদুর অগ্নিসংযোগ ও গুনমালার বিদায় অত:পর রাষ্ট্রের একটু টনক নড়া এবং বছর পরে রাষ্ট্রের নীরবতার স্বাভাবিক মূর্তি ।
অত্যন্ত দায়ছাড়া ভাবে লংগদুকে আঘাত করা হচ্ছে সেই সাথে পুরো পাহাড়ী মানুষদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি যে এখনো পাল্টানো হয়নি তার নগ্ন বহি:প্রকার পরিবেশিত হচ্ছে একের পর এক ।
পুড়ে গেল ২১৪ টি বাড়ি ঘর । যতদূর জানি লংগদু উপজেলার সদরের অত্যন্ত কাছের তিনটি গ্রাম তিনটিলা,বাত্যেপাড়া ও মানিকজোরছড়া । এ তিনটি গ্রামের মোটামুটি অবস্থা সম্পন্ন পাহাড়ীদের বাড়ীতেই আগুন দেওয়া হয়েছে । এমনও অনেক পরিবার আছে যারা বিগত দুই এক যুগের মধ্যে দুই তিনবার বাড়ী পোড়ানোর শিকার হয়েছে । তিল তিল করে গড়া সংসারের স্বপ্ন একটু এগিয়ে গেলেই আবারো পুড়ে যাই সাম্প্রদায়িকতার কৃত্রিম আগ্নেয়গিরির জলন্ত আগুনে ।
যাক বিগত বছরের এই দিনে বাড়ী পুড়ে গেল ! গুনমালা চাকমাকে পুড়িয়ে মারা হল।
কিন্তু রাষ্ট্রের তার স্বাভাবিক দায়-দায়িত্ব কী হতে পারে ?
প্রথমত, রাষ্ট্রকে এই হামলার সুষ্ঠু বিচার ও তদন্ত করতে হবে এবং পোড়া জনপদের মানুষের যান-মালের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে ।
দ্বিতীয়ত, অগ্নিসংযোগের শিকার মানুষদের দ্রুত পুনর্বাসনে রাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হবে । আপাতত এই দুটি মূখ্য কর্তব্য এবং দায়িত্ব রাষ্ট্রকে অবশ্যই পালন করতে হবে ।কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র কী আধো তার এ দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়েছে নাকি বিভিন্ন ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে ভুলিয়ে রাখার আয়োজন চালিয়ে যাচ্ছে তা দেখার বিষয় ।
যতদূর জানি, বিগত বিঝুতে লংগদুর পোড়া পাহাড়ী জনপদে বিঝুর সুর বাজতে পারেনি । অভাবী পেতে আর পুড়ে যাওয়া স্বপ্নের বাশিঁতে কী আর সুর আসে ?
পোড়া জনপদ যেখানে অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও দু:খের আগুন এখনো দাউদাউ করে জ্বলছে সেই আগুনে কী আর পাজন রান্না হয় ?
সম্ভব নয় ।
লংগদু উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের মোট ১৭৬ জন ঘরের মালিককে চিহ্নিত করে তাদের ঘর প্রতিটি চার লাখ ৭২ হাজার টাকা সরকারি অর্থ দিয়ে নির্মাণের জন্য বিঝু পর্যন্ত তিন দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু লোকসানের আশঙ্কায় কোন ঠিকাদার এতে অংশ নেননি। কোনো ঠিকাদার অংশ নেননি কারণ টেন্ডারের সাথে কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল ।
গত কিছুদিন আগে স্থানীয় এক সাংবাদিকের পোষ্ট দেখলাম লংগদুর পোড়া মানুষদের পুনর্বাসনের প্রকল্প উদ্ধোধন করছেন সরকার দলীয় জেলা সভাপতি অথচ তা করার কথা ছিল স্থানীয় নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি কিন্তু জনগনের সত্যিকার মঙ্গলের চাইতে তাদের উদ্দেশ্য কেবল দাবার ছকে গুটি নাড়ানো । সামনে নির্বাচন!!
যতদূর জানি এই লেখা লেখার আগ পর্যন্ত রাষ্ট্র এখনো উপরে উল্লিখিত দুইটি মূখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করতে পারেনি ।
তাই আমি মনে করি লংগদুর আগুন এখনো নিভেনি । এ আগুন স্থায়ীভাবে নেভাতে হলে রাষ্ট্রকে হতে হবে মানবিক অন্যথায় গুনমালাকে তার স্বকীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে সেটা হল – পাহাড়ী জনগনকে ভয় দেখাতে হবে আমরা কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আছি ।
গুনমালা চাকমার আত্মার সৎগতি কামনা করছি । রাষ্ট্রের বোধদয় হোক এ কামনা করছি । লংগদুর আগুন নিভে যাক । পোড়া জনপদ সবুজ শ্যামল হয়ে উঠুক আবার সেই জনপদে বেজে উঠুক বিঝুর বাশিঁর সুর ।
ভালো থাকুক লংগদুর হতভাগা পাহাড়ী মানুষগুলো এবং প্রিয় পাহাড় ।
……………………….
লেখক- সতেজ চাকমা, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য