৭০ এর দশকে জুমিয়া জাগরনের যে আন্দোলন ছিল, তা ন্যায়সংগত : প্রমোদ বিকাশ কার্বারী

৭০ এর দশকে জুমিয়া জাগরনের যে আন্দোলন ছিল,  তা  ন্যায়সংগত : প্রমোদ বিকাশ কার্বারী

(প্রমোদ বিকাশ র্কাবারী(প্রবিকা)-র জন্ম ২রা জানুয়ারী ১৯৪০ সালে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলা শান্তিপুর গ্রামে। রাঙ্গামাটির পুলিশ লাইন প্রাইমারী স্কুলে পড়ালেখার হাতেখড়ি ১৯৫০ সালে। ১৯৫৯ সালে রাঙ্গামাটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি মেট্রিক পাশ করেন।এইচ.এস.সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরজেীতে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর পাশ করেন। তিনি মেট্রিকে প্রথম বিভাগ, এইচ.এস.সি তে প্রথম বিভাগ এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন।
তিনি ঢাকা,চট্রগ্রাম এবং রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্যঞ্চলের এগারটি সরকারী-বেসরকারী কলেজ ও স্কুলে শিক্ষকতা করেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ছাত্র সংগঠনের সাথেও যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি বাংলায় কবিতা ও ছোট গল্প লিখতেন। কর্মজীবনে তাঁর সাহিত্য-র্চচা অনিয়মিত হয়ে যায়। তারপরও ১৯৭৩ সাল থেকে বাংলায়,ইংরজেীতে কবিতা বিশেষভাবে চাকমা ভাষার কবিতা, ছড়া, ছোট গল্প, নাটক, উপন্যাস লেখার মাধ্যমে নিয়মিত সাহত্যি র্চচা করে যাচ্ছেন তিনি। আইপিনিউজের জন্য প্রমোদ বিকাশ কার্বারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইন্টুমনি তালুকদার।)
ইন্টুমনি তালুকদার: নমস্কার নিবেন। কেমন আছেন?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: নমস্কার। ভালো আছি।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনার ছেলেবেলার স্মৃতি মনে আছে কি? প্রথম স্কুল জীবন সম্পর্কে জানতে চাই।
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: পাহাড়ী গ্রামের ছেলেদের যা হয়, আমারও তাই হয়েছে। দৌঁড়-ঝাঁপ খেলা-ধুলা আর পাহাড়-বন-বাঁদারে ঘুরা। এছাড়া-গ্রামে রাখালদের সঙ্গে গরু-চরানো এবং গাছে উঠে শিষ দেয়া, গান গাওয়া। স্কুলে বাবা ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। শিক্ষকের এক ছাত্রকে মারতে দেখে স্কুল জায়গাটা ভয়ংকর বলে মনে হল । কাজেই আমাকে ভর্তি করানো গেলনা। তারপর আবার আগের আর্কেডিয়্যেক প্যাস্টোরাল লাইফ মানে আনন্দময় রাখালিয়া জীবন। কাকা আমার রাখালিয়াত্ব শেষ করে দিলেন আমাকে রাঙ্গামাটিতে এনে। তখন আমার ৮/৯ বছর বয়স। রাঙ্গামাটির পুলিশ লাইন এলপি স্কুলে ক্লাশ টু-তে আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ঘরে অবশ্য বাল্যশিক্ষা অর্ধেকের মত পড়া ছিল।
ইন্টুমনি তালুকদার: শৈশব-কৈশোর বয়সে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কিভাবে দেখেছিলেন?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: তখন দেখেছি কাছে-দূরে রোমান্টিক স্বপ্নময় সবুজ পাহাড়। সর্বত্র পানিজ-সম্পদে ভরা অজস্র ছড়া-নালা-ডোবা-ঝর্না। আর অসংখ্য বিচিত্র বৃক্ষ পশু-পক্ষীভরা বন-বনানী। সুদূরে পর্বতমালা। নদীর তীরে গ্রাম,কখনো হাট-বাজার,তীর ধরে কোম্পানি (ব্রিটিশ নির্মিত) রাস্তা। মুসলিম ভাসন্যা-বেপারি, বাজারে হিন্দু দোকানদার আর পাহাড়ে জমিতে ধান-কাটুয়া চাঁদগায়্যা-নোয়াখাল্যা মুসলিম । বন-বাঁদার-পাহাড়-পর্বত-ছড়া-নদী-জুম-ভুই ছিল দিনে,এমন কি রাতেও নিরাপদ। বলা যায় নিরাপদ বিচরন ও বনজ সবকিছু সংগ্রহের জনগনের সাধারণ সম্পদ-ভান্ডার। খেলা-মেলা-মেজবান-পুজা-পার্বন-উৎসব-যাত্রা-নাচগানে সর্বত্রই মুখর ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম। সব বয়সের জ্যোষ্ঠরা সব বয়সের কনিষ্ঠদের মান্য, গাইড ছিল। জনগনের মধ্যে অপরাধ-বিবাদ-অসুখ তেমন ছিলনা। তবে কলেরার দাওয়াই ছিলনা বলে কলেরা হলে মানুষ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যেত। পাহাড়ী-বাঙালি ছিল কম। তবে পরস্পর সহযোগী। সম্পর্ক ঘনিষ্ট আত্মীয়ের মত।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনি তো পঞ্চ-ষষ্ঠ দশকের মানুষ। সে সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগোষ্ঠির আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে একটু বলুন?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: অনেকটা আধাসামন্ত-কৃষক সম্পর্কভিত্তিক ছিল আর্থ-সামাজিক অবস্থা । শিক্ষিত বা চাকুরে সংখ্যা নগন্যই ছিল। মানুষ ছিল কম । সে-কারনে অনাবাদী জুম-জমির জায়গা অপ্রতুল ছিলনা। জুম-জমি চাষী প্রায় সবাই। চাষের ফসলই আর্থিক অবলম্বন। ধান বাঁশ-গাছ-সুতো-তিল ব্যবসাও ছিল। খাদ্য-বস্ত্র-চিকিৎসা-গৃহ নির্মাণ সামগ্রীতে প্রায় স্বনির্ভর বলা যায়। স্কুল ছিল কম। হাই স্কুল ছিল মাত্র রাঙ্গামাটি হাই ইংলিশ স্কুল। তৈজসপত্র, কুমার-কামারদের জিনিষ, মনোহারি দ্রব্য, অলংকারাদি, নুন-শুটকি ইত্যাদির জন্যে বাঙালিদের উপর নির্ভর করতে হতো। সমাজে সম্প্রীতি-সহযোগিতা ছিল। দুর্নীতি-চুরি-ডাকাতি-ঝগড়া বা অপরাধ ছিলনা বললেই চলে। জুম্মদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিচার-বিবাদ সমস্যার সমাধান হতো। জনগন হাঁস-মুরগী-শুকর পালতো। অবস্থা সম্পন্নরা গরু-ছাগল-মহিষ, এমন কি অনেকে গয়ালও পালতো। রাঙ্গামাটিতে এদিক-ওদিক মিলিয়ে এক/দেড় মাইল পাকা রাস্তা ছাড়া সব রাস্তাই ছিল কাঁচা। ধান. চাল, তরকারি, ফলমূল, মাছ, কোনটাই প্রায় বিক্রি করা যেতনা। যেহেতু সবাই স্বনির্ভর। চাল খুবই সস্তা ছিল। ৫০ সালে টাকায় ৪/৫ সের, ৬০ সালের দিকে টাকায় ২/৩ সের এবং ৭২-৭৩ সালেও টাকায় ১/২সের চাল পাওয়া যেত। একটা বড় মোরগের দাম ছিল ২/২.৫০ টাকা। দেশে দুর্ভিক্ষ হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে মানুষ না খেয়ে মারা যেতনা । পরিত্যক্ত রান্যা জুমে,বনে-পাহাড়ে-পর্বতে-ছড়ায় সর্বত্রই আলু-ফল-তরিতরকারি-জলজ-বনজ ইত্যাদি খাদ্য পাওয়া যেত। পাহাড়িদের অনেকটা স্বনির্ভর জীবন-জীবিকা ছিল।
ইন্টুমনি তালুকদার,রগো: আপনি ঢাকা বিশ্ববদ্যালয় পড়াশুনা করেছেন। সেই সময় সেখানে আপনার আদিবাসী সহপাঠি মনে আছে কি?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: জগন্নাথ হলে ছিলাম। ১৯৬৪ থেকে ’৬৯ ইং পর্যন্ত। তবে অনার্স ফাইনালে ড্রপ দিয়ে একবছর ব্রেক অব স্টাডি হয়েছিল। একারনে আমার সিনিয়র-জুনিয়র অনেকের সাথে একসংগে ছিলাম। সিনিয়র ব্যাচের ছিলেন রামেন্দু শেখর দেওয়ান(বর্তমানে লন্ডনে), শরদেন্দু শেখর চাকমা (সাবেক রাষ্ট্রদূত), বিপস্সী চাকমা(সাবেক সিএসপি, বাংলাদেশ মহাহিসাবনিরিক্ষা ব্যবস্থাপক?), জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা(এডভোকেট), প্রয়াত প্রফেসর অমরেন্দ্র লাল খীসা। এককালের সহপাঠি প্রয়াত পুর্ণাঙ্গ বরন খীসা, জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লার্মা(চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ), প্রয়াত প্রফুল্ল কুমার চাকমা। এছাড়া যারা জুনিয়র ছিলেন ড: নিরু কুমার চাকমা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর) মং শানু চৌধুরি (সাবেক প্রফেসর), মং সাথোয়াই চৌধুরি, অমুল্য রঞ্জন চাকমা( সাবেক মেজিস্ট্রেট), তারাচরন চাকমা (সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান), প্রফেসর ড: আদিত্য কুমার দেওয়ান (কানাডা), ড; সুধীন কুমার চাকমা (সাবেক কলেজ প্রিন্সিপাল), হরিশ চন্দ্র চাকমা (হাই স্কুল শিক্ষক), পিনাকি রঞ্জন দেওয়ান। তখন ড: ইন্দু বিকাশ চাকমা(লন্ডন),এবং এককালের সহপাঠি ড: চিরঞ্জীব তালুকদার (কানাডা),ডাক্তারি পড়ার সময়, মেডিকেল হোস্টেলে থাকতেন। আর তো মনে পড়ছেনা।
ইন্টুমনি তালুকদার: পার্বত্য চট্টগ্রামে সাহিত্য ও সংস্কৃতি আন্দোলন কখন থেকে শুরু হয়?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: আমার মতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাহিত্য ও সংস্কৃতি আন্দোলন শুরু হয় ৭০ এর মাঝামাঝি থেকে । গবেষনায় জুভাপ্রদ, চিত্র শিল্পে চারুকলা একাডেমি, নৃত্য-সংগীতে গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠি, সংগীত-বাদ্যে গেংখুলি শিল্পী গোষ্ঠিী, সাহিত্যে জাক-এর মাধ্যমে।
ইন্টুমনি তালুকদার: ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে পাহাড়ে বিপ্লবী নেতা এম.এন.লার্মা যে প্রতিবাদ করেছেন সে আন্দোলনে আপনি কি অংশ গ্রহন করেছিলেন? সে ব্যাপারে কিছু বলবেন?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: না। আমি অংশ গ্রহন করিনি। ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত নিয়মিত-কিছুটা অনিয়মিতভাবে ঢাকাতে পড়াশুনা নিয়ে ছিলাম। আমি ১৯৫৯ সালে ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। (পরীক্ষায় ড্রপ। কিছুদিন মারিশ্যায় শিক্ষকতা করে, আবার কানুনগোপাড়া কলেজে ভর্তি) । বাধ বিরোধী আন্দোলনের জোয়ার ঢাকায় তেমন পোঁছেনি। সেখানে ছাত্রও ছিল খুব কম। এটা অনেকটা রাঙ্গামাটি, কানুনগো পাড়া এবং চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ী ছাত্রদের মধ্যে সীমিত ছিল। আর এতে ছাত্রাবস্থায় এম,এন.লারমার ভূমিকা ছিল প্রধান। সরকারের কড়া বাধানিষেধের মধ্যে তখনকার পাহাড়ী নেতারা প্রতিবাদ মুখর এবং জনগন-কে সম্পৃক্ত করতে তৎপর ছিল বলে আমার জানাশুনা নাই। তবে নিশ্চিন্তে তিন রাজাদের নিয়ে আয়ূব খান কাপ্তাই বাঁধ উদ্বোধন করেছিলেন।
ইন্টুমনি তালুকদার: মুক্তিযুদ্ধকালে আপনার বয়স কত ছিল? কিভাবে দেখেন মুক্তিযুদ্ধকে?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ৩০/৩১ বছর। মুক্তিযুদ্ধ তো ন্যায়সংগত যুদ্ধ যার মাধ্যমে বিদেশী/বিজাতীয় শাসন শোষণ নিপীড়ন অন্যায় অত্যাচার আগ্রাসন থেকে দেশ-জাতিকে মুক্ত করা যায়। মুক্তিযুদ্ধ না করলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না এবং এদেশীয় জনগণের অবস্থা অনেক খারাপ হতো। বিজাতীয় শোষণ নিপীড়ন ছিল বলে অনিবার্যভাবে মুক্তিযুদ্ধটা হয়েছে এবং তাই মুক্তিযুদ্ধমাত্রই ন্যায়সংগত।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনার কর্মজীবন সম্পর্কে এবং বাংলাদেশে সামগ্রিক বাস্তবতা সস্পর্কে বলুন।
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: আমার কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশের পর মতলবগঞ্জের মতলব ডিগ্রি কলেজে শিক্ষকতা নিয়ে, যেখান থেকে ছুটি নিয়ে এম.এ. পরীক্ষাটা দিয়েছিলাম। চাকরি করার মানসিকতা ছিলনা বলে বার বার চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু আর্থিক বাস্তবতার কারনে আবার চাকরি নিতে হয়েছে। যে কারনে আমি চট্টগ্রামের ফতেহাবাদ ডিগ্রি কলেজ, রাংগামাটি কলেজ, রাংগামাটি নাইট কলেজ, ঢাকার অভয় বিনোদিনী কলেজ এবং কদমতলা পূর্ব বাসাবো হাই স্কুল এন্ড কলেজ, রাংগামাটি শাহ হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছি। এছাড়াও ঢাকায় প্রাইভেট এন্টরপ্রাইজ ’দি মেরিন সার্ভিস, একতা ইঞ্জিনিয়ার্স এও স্বল্প সময়ের জন্যে চাকরি করেছি। বিভিন্ন সময়ে প্রগতিশীল বিভিন্ন ধরণের সংগঠন-সংস্থার সাথে যুক্তও ছিলাম। তবে ছিলাম অদৃঢ়,অলস এবং নিস্ক্রিয়। তাই অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো হয়েছে। আমার ঢাকায় অবস্থান কালে বহু অনুরোধের কারনে ২০০২ সালে রাঙ্গামাটিতে আসতে হলো এবং দুটো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ’হিল পয়েন্ট’ এবং ’ইস্টার্ন মডেল স্কুল’-এর প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সাথে যুক্ত হই।
বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতা আগের চেয়ে অনেক ভাল। বিশ্বের অনেক দেশ থেকে অনেক ভাল। গাড়ী-বাড়ি-শিল্প-কলকারখানা-রাস্তা-সেতু-জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিক্ষা-প্রযুক্তি-প্রবুদ্ধি-উৎপাদন ইত্যাদি ইত্যাদির উন্নয়ন হয়েছে। সারা বিশ্বে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নন্দিত, প্রশংসিত, পুরস্কৃতও হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনেক ভাল । পত্র-পত্রিকায় এবং দৃশ্যমান চিত্রে দেখা যায় বাংলাদেশে, এখনও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সাধারন মেহনতি মানুষের চাহিদা পুরনের এবং অন্যান্য নানা ধরণের সমস্যাও রয়েছে এবং সমস্যা যোগও হচ্ছে যা একালের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিগুলোতে আছে বা হয়ে থাকে।
ইন্টুমনি তালুকদার: জীবনের সবচেয়ে মজার, দু:খের এবং ভয়ের অভিজ্ঞতা বলুন?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: মজার ঘটনা। ১৯৬২ সালে, মারিশ্যাতে। ঘটনা হলো টাকাগুলো হাতে হাতে বন্ধুকে দিয়ে কিভাবে সেই টাকা আমার পকেটে এলো। যেন ভানুমতির খেলা! আমার এককালের সহপাঠি বন্ধু (বিয়াই ডাকাডাকি করতাম) এবং আমরা উভয়ে তুলাবান স্কুলের শিক্ষকও। কলেজে ভর্তির জন্যে চাকরি ইস্তফা দিয়ে সকালে লঞ্চঘাটে যাচ্ছি। যাবার সময় তাকে হাতে হাতে ধার-নেয়া টাকাগুলো শোধ করেছিলাম। সেও খুশী মনে ধন্যবাদ জানিয়ে টাকাগুলি নিয়েছিল। সকালে মারিশ্যা লঞ্চঘাট পর্যন্ত সে এসেছিল আমাকে বিদায় দিতে। লঞ্চে লঞ্চ না ছাড়া পর্যন্ত কথাবার্তাও বলেছিলাম। লঞ্চ ছাড়বার সময় সে চলে যায়। লঞ্চ চলার সময় হঠাৎ পকেটে হাত দিতেই একটি চিঠি পেলাম। ’বিয়াই তোমার টাকাগুলো শোধ করতে হবেনা। তাই ফেরত দিলাম। তোমার টাকার প্রয়োজন। টাকাগুলো তোমার কাজে লাগবে। ইতি। বিয়াই।’ কোন্ ফাঁকে, কখন যে টাকাগুলো এবং চিঠিটা আমার পাঞ্জাবী পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিল সেই রহস্য এখনো আমার কাছে একটা মজার ঘটনা।
দু:খের ঘটনা হলো, প্রতিষ্ঠিত পরিবারের বিসিএস ক্যাডার, বিদেশে চাকরীরত যুবক যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষে অনার্সে অধ্যয়নরত বাবার একমাত্র আদরের কন্যাকে বিদেশে পড়ালেখা ভাল, বাংলাদেশে পড়াশুনা ভাল না বলে বিয়ে করে বিদেশে নিয়ে গেল। কিন্তু পড়ালো না আর, বিশাল আর্থিক সামর্থ্য থাকা স্বত্ত্বেও। তাকে রাখলো এ ডল্স্ হাউস্ এর নায়িকা নোরার মতো, পরে রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তীর মতো, এবং সর্বশেষে আংকল টমস কেবিন এর ক্রীতদাসির মতো। বাস্তবতা সৃষ্টি করলো যাতে মেয়েটাই বাধ্য হয় ডিভোর্স দিতে। লোকে যাতে বলে পুরুষটা নয়, মেয়েটাই ডিভোর্স দিয়েছে। ঠিকই মেয়েটি ডিভোর্স দিতে বাধ্য হলো।
৬/৭ বছর বয়সের সময় মামার বাড়ীতে একটা ভয় পেয়েছিলাম যা আজীবন মনে থাকবে মনে হয়। ভগ্নীবিহীন পঞ্চপান্ডবদের মধ্যে আমি সহদেব মানে পাঁচ ভাইদের সর্ব কনিষ্ঠ বলে মায়ের আঁচল ধরে মামার বাড়ীতে যেতাম। আর সমবয়সী মামাতো ভাইয়ের সাথে নানা দুরন্তপনা-অভিযানে সারাদিন ব্যস্ত থাকতাম। যেন রবিনসন ক্রুসো। একবার বাদল(ধনুক) দিয়ে ছাতা-শলা দিয়ে অব্যর্থ তীর ছুড়লাম পাচমুষ্ঠি/পাঁচমুট্যা এক পালিত মালা(কাসট্রেটেড) শুকরের পিছনে লেজের গোড়ায়। শেলটি লেগেই রইল। শুকরটি এদিক-ওদিক গেলেও, শেলটি পড়ে যায় না। ভয়ে মামাত ভাইদেরসহ সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরের বাইরে ছিলাম। বড় মামা শেলবিদ্ধ শুকরটি দেখেছিল এবং আমাদেরকে দেখে এমন ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল,আর আমি এমন ভয় পেয়েছি যা এখনও ভুলতে পারিনি। মামারা এত আদর করেন। অথচ এরকম দৃষ্টি? সে-সময়ে অনেকবার এটা স্বপ্নেও দেখেছিলাম। এখন বুঝতে পারি ঐ দৃষ্টিটা আসলে ছিল মামার মামাতো দৃষ্টি! মামাতো রসিকতা!
ইন্টুমনি তালুকদার: ৭০ দশকে মাঝপর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমিয়া জাগরনের আন্দোলনটা বেশ আলোচনায় চলে আসে গণমাধ্যমে। এই আন্দোলনে আপনার কোন ভূমিকা বা অংশগ্রহন ছিল কী? বিস্তারিত বলুন।
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: ’৭০ এর দশকে জুমিয়া জাগরনের যে আন্দোলন ছিল, তা ছিল স্বাধিকার আন্দোলন। তা ন্যায়সংগত। এই কারণে ’পার্বত্য চুক্তি’ সম্পাদিত হয়েছে। দেশ, অঞ্চল, জাতির শান্তির স্বার্থে বলে এটাকে শান্তিচুক্তিও বলা হয়। বিশ্বে এ চুক্তি স্বাগত, সমাদৃত, সম্মানিত হয়েছে। যে শর্তগুলো এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের আশায় জনগণ অদূর ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছে। যে জুমিয়া আন্দোলনের মাধ্যমে শান্তি চুক্তি অর্জিত হয়েছে, সেই আন্দোলনে আমার কোন ভূমিকা বা অংশগ্রহন ছিলনা।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনার জীবনে বাবার প্রভাব কতটুকু ছিল?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: বাবা আমাকে নানা ফেয়ারি টেইলস, হেয়র ট্রি, সিন্দারেলা, নর্থ উইন্ড ইত্যাদি রুপকথা শুনাতেন। আর শুনাতেন রবার্ট ব্রুচ্, নেহেরু, গান্ধী, আতার্তুক, দ্য গল, শিবাজী,রানা প্রতাপ সিংহ ইত্যাদি লোকদের জীবন কাহিনী। এসব শুনে আমারও এসব ব্যক্তিদের মতো হওয়ার ইচ্ছা হতো। ব্যারিস্টারি পড়ার ইচ্ছে হতো। ডিসি হবার ইচ্ছে হতো। এতটুকুই প্রভাব। পরে এসব নামী-দামী হবার ইচ্ছে সবই চলে গেল । তবে রূপকথার কাহিনী এখনও ভাল লাগে।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনার প্রথম লেখালেখি শুরু হলো কিভাবে?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: লেখালেখি কিভাবে কখন শুরু, তাতো মনে পড়ছেনা। লেখা অবশ্য কবিতা দিয়েই শুরু। ভাইয়েরা সবাই অল্প স্বল্প কবিতা লিখতো। কবিতা লেখার আগ্রহটা তাদের থেকে হতে পারে। ৭ম/অষ্টম শ্রেনি মানে ১৯৫৫/৫৬ সাল হবে। আমার জীবনটা ছোটকাল থেকে অনেকটা বোহেমিয়ান। ভাবুক, ভ্রাম্যমান,আগোছালো। নন্-ক্ল্যাসিক। যে কারনে কবিতা সন-তারিখ-স্থান ইত্যাদির কোন রেকর্ড নেই। এযুগের মতো তখন পেপার-পত্রিকার যুগও ছিলনা।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনার পছন্দের কোন বই বা কোন ব্যক্তি যা অনুপ্রেরনা হিসেবে পেয়েছেন?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: নির্দিষ্ট কোন বই মনে পড়েনা। কত বইতো পড়েছি। ইংরেজি সাহিত্যের লোক হয়ে সেক্সপিয়ারের নাটকের একটা ছোট্ট ডায়ালগও এখন বলতে পারিনা । বঙ্কিম চন্দ্রের কপালকুন্ডলা, রাজসিংহ, শরৎ চন্দ্রের দেবদাস ভাল লাগতো। তবে রবীন্দ্রনাথ প্রেরনা হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর ছোটনদী, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, দুই বিঘা জমি আরও অনেক কবিতা ভাল লাগতো। রোমান্টিক, কবিদের তা ইংরেজি বা বাংলায় হোক খুব ভাল লাগতো । ইংরেজি-বাংলা সাহিত্য তো বটেই, প্রাচীন/রেনেসাঁ গ্রীক ও রোমান এপিক, নাটক, স্কটল্যান্ডিশ নাটক, কিছু আমেরিকান কবিতা ও উপন্যাস ইত্যাদি ভাল লাগতো। ইংরেজ রোমান্টিক কবিদের কোন কোন কবিতা আবৃত্তি কেন, পুরো মুখস্ত করে ফেলতাম। রোমান্টিক কবিদের প্রভাব বেশী ছিল বলে মনে হয়। আমার ছাত্র জীবনে সত্যেন্দ্রনাথের মত বিভিন্ন ছন্দে লেখা বাংলা কবিতাগুলো প্রায়ই রবীন্দ্র অনুসারি।
ইন্টুমনি তালুকদার: স্বপ্নের পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ আপনার স্বপ্ন কি?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: আমার স্বপ্নের পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে জুম্ম জাতিরা পারস্পারিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি, ঐক্যের মধ্যে থাকবে। প্রতিক্রিয়াশীল পাহাড়ী-বাঙালীদের শাসন-শোষন-নিপীড়ন-দূর্নীতি থাকবেনা। দেশের প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক পাহাড়ি-বাঙালিদের শাসনে পার্বত্য চটগ্রামে বসবাসরত সব জাতি সম্প্রীতির মধ্যে শান্তিতে বাস করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম হবে বিশ্বের একটা আকর্ষনীয়, দর্শনীয়, বৈচিত্র্যময়, সুবর্ণময়, উৎসবময় অঞ্চল যেখানে মানুষেরা হবে প্রগতিশীল,স্বীকৃত ব্যক্তি-জাতি-আদিবাসীর অধিকারগুলো ভোগ করবে।
আর আমার ভবিষ্যত স্বপ্ন হলো ’আর্টস ফর লাইফ সেইক এন্ড প্লেজার’ সাহিত্য লিখে যাওয়া, সুস্থ দেহ-মন,নিরাপদ-দীঘ-কর্মমর্য়-বিজ্ঞান সম্মত জীবন-যাপন করে সুস্থ-সচেতন-নিরাপদ-সহজ-স্বাভাবিকভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া।
ইন্টুমনি তালুকদার: রেগা প্রকাশনী থেকে আপনার প্রথম দুটো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেই অনুভূতি একটু ব্যক্ত করুন।
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: ’কিযিঙৎ পুগোবেল’ (বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদসহ) কাব্যগ্রন্থটি আমার সুখ-দু;খ-আনন্দ-বেদনার বহির্প্রকাশ। তাই প্রকাশ করাটাই আনন্দ, বইটির মান যাই হোক না কেন। না হলে বাল্মীকির ভাবের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে না পারার মতো অসহায় অবস্থা হতো। যা রবি ঠাকুরের ভাষায়, ’আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন, তার পক্ষে বেদনা অপার’ এর মতো। ’কিযিঙৎ পুগোবেল’ কাব্যগ্রন্থটি সাজসজ্জা, বিন্যাস, মুদ্রনত্রুটি এক কথায় সার্বিক লে-আউট ভাল না হলেও এটা আমার প্রথম প্রকাশিত বই বলে আমি খুশী,আনন্দিত। ’আলোর পথ দেখালো যারা’ জীবনীগ্রন্থটিতে আমার কোন কৃত্বিত্ব নেই। যারা তথ্য দিয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহ করেছে কৃত্বিত্বটা তাদেরই। তাদেরকে আমি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। আমি তাদের লেখা বা বই থেকে তথ্য নিয়ে আমার ধাঁচে পরিবেশন করেছি মাত্র। পার্বত্য অঞ্চলে জাতিগুলোতে আরো কিছু ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাদের তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি এবং অনেকের তথ্য তাদের পরিবার বা অন্যেরা দিতে পারেনি। তবে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত করতে পেরেও আমি খুশী, কারন আমাদের আলোকিত, আলোর পথিকৃৎদের জীবনী আমাদের এবং পরবর্তী প্রজন্মদের জানা উচিত, প্রেরনার জন্যে, আলোকিত হওয়ার জন্যে। দু’টো বই প্রকাশ করতে যা প্রয়োজন, সব দায়িত্ব-ভার রেগা প্রকাশনী কাঁধে না নিলে বই দু’টি আলো দেখতো না, আঁধারে থাকতো। কাজেই রেগার প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনার অপ্রকাশিত গ্রন্থ কয়টি আছে?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: ৯টি । হ্লে সবনর জুমর দেচ্ (বঙ্গানুবাদ সহ ছড়াগ্রন্থ), কোচপানার কবিতা(কাব্যগ্রন্থ), এগ্ গজর চিওন কিৎত্যা (বঙ্গানুবাদ সহ ছোট গল্প), যেঙেরি উধে পুগোবেল(সামাজিক নাটক), ধেবাছড়ির বৌ (সামাজিক উপন্যাস), পরংঙ্যা জিংকানির বৈজাক্যা ঝড় (কাপ্তাইবাধের এক উদ্বাস্তুর সমস্যাভিত্তিক উপন্যাস), ঘর’কুনৎ জিংকানি (স্বামী কর্তৃক নির্যাতিতা নারীর জীবন সম্বলিত উপন্যাস), রাজকুমারি মধুছন্দা (কিংবদন্তী জামাইমারনী মোরোং ভিত্তিক কাল্পনিক উপন্যাস), কুগিমোনোর জুমঅলা মনচান (জুমিয়া জীবনভিত্তিক উপন্যাস)।
ইন্টুমনি তালুকদার: পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধিকার আন্দোলনকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: পার্বত্য চট্টগ্রামের ’স্বাধিকার আন্দোলন’ মানে ’জুম্মদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন’ । এটা গণতান্ত্রিক যুগে বা বিশ্বসংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত অধিকারের জন্য আন্দোলন এবং ন্যায়সংগত। একারনে বর্তমান সরকারের উদ্যোগে পার্বত্য চুক্তি (যা শান্তির লক্ষ্যে বলে ’শান্তি চুক্তি’) হয়েছে। এই চুক্তি বিশ্বে নন্দিত, সমাদৃত, সম্মানিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। চুক্তির পরে চুক্তির বাস্তবায়ন প্রধান-কাজ, যার উপর নির্ভর করে চুক্তির সফলতা ও সার্থকতা। চুক্তির বাস্তবায়নের অপেক্ষায় যা আছে এবং বাস্তবায়নের যে আশ্বাস দেয়া আছে, তার প্রতি সম্মান দেয়া এবং বিশ্বাস রাখা উচিত। আশাবাদী ও প্রো-একটিভ হওয়া উচিত।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনার অপূর্ণতা কি?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: অপূর্ণতা তো আছেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়গুলো যদি সবুজতা না হারাতো ! এবং তাদের ঝর্ণা,মাছ-চিংড়ি-কাঁকড়া,পশু-পাখী পরিবেশ বৈচিত্র্য যদি ক্রম-বিলুপ্ত না হতো ! প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ যদি কিছুটা নাগরিক সুবিধা ভোগ করতো! পত্র-পত্রিকায় যদি নেতিবাচক তথ্য ও উতপ্ত খবর কমে যেত! এখানে-ওখানে,টিভিতে-সিনেমায়-ফোনে যদি উত্তপ্ত লোম হর্ষক বা ব্যঙ্গচিত্র না দেখতাম! প্রতিষ্ঠিত অধিকারগুলো যদি লংঘিত না হতো ! যদি বিশ্বের আদিবাসী বা ক্ষুদ্রজাতি বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়রা তাদের অধিকার গুলো ভোগ করতে পারতো! এবং ব্যাপক মেহনতি মানুষের যদি হাসি বাড়তো, তাদের শিশুদের কান্না যদি কমতো! দেশে বা বিশ্বের সকল জাতির মধ্যে সম্প্রীতি-সমৃদ্ধি যদি আরও বাড়তো! এমন শিক্ষাব্যবস্থা যদি থাকতো যার ফলে ছাত্র-যুবরা সবাই পাশ করতো,পরিশ্রমী-আত্মমর্যাদাশীল-স্বনির্ভর-বিবেকবান-সহনশীল-দেশপ্রেমিক-আন্তর্জাতিকতাবাদী হতো!
ইন্টুমনি তালুকদার: শিশুদের ঘিরে স্বপ্ন বক্তব্য কি? তরুনদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন?
পি.বি.কে: কথায় আছে..শিশুরা জাতি ও দেশের ভবিষ্যত এবং ভিত্তি। সকাল দেখেই নাকি বুঝা যায় দিনটা কেমন হবে। এজন্যে শিশুরা গড়ে উঠবে সততা,সৎসাহস, স্বনির্ভরতা, বিজ্ঞান নির্ভর শিক্ষা, সব ধর্ম-জাতি-সম্প্রদায়ের প্রতি উদার সহনশীল নৈতিকতা এবং ইতিবাচক সংস্কারমুক্ত দৃষ্টিভংগীর মধ্য দিয়ে। শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার মধ্যে এধরণের শিক্ষা, পরিবেশ, ব্যবস্থা থাকতে হবে, রাখতে হবে।
তরুণদের চাকরিই একমাত্র পড়াশুনার লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। এই উদ্দেশ্যে যেনতেন একটা পাশের সার্টিফিকেট যোগার করা উচিত নয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতি এবং দেশের সেবার উদ্দেশ্যে যে জ্ঞান বা শিক্ষা দরকার, তা অর্জন করতে হবে। আগে জ্ঞানের জন্য লেখাপড়া হতো, চাকরীর জন্য নয়। তাতে চাকরীও পাওয়া যেত। এখন চাকরীর জন্য লেখাপড়া করা হচ্ছে, জ্ঞানের জন্যে নয়। তাতে চাকরীও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এই শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতি, দেশ সেবাও করা যাচ্ছেনা। এরকম যদি হয়, তাহলে দুর্দশার চক্র তারা এবং পরবর্তী প্রজন্মদের ভুগতে হবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনায় অধিকাংশ দেশে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি,শিক্ষা-সংস্কৃতি, নীতি-সম্পর্ক, ব্যবসা-উৎপাদন সবই মুনাফার দাস হয়ে গেছে। প্রায় সব দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান কাঠামো-অবকাঠামো মুনাফার স্বার্থ-সেবায় পরিচালিত হচ্ছে। দেহ-নৈতিকতা বিক্রী হচ্ছে, অপরাধ-দুর্নীতি,বেকারত্ব-অন্যায় বাড়ছে। এতে স্বল্প শতাংশ মানুষ স্ফীত হচ্ছে, ব্যাপক মেহনতি মানুষ সংকুচিত হচ্ছে।
তরুনদের কাছে আমার বক্তব্য হচ্ছে: এযুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-ব্যবসার গুণগতশিক্ষা গ্রহন কর। পরিশ্রমী-স্বনির্ভর-ভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলে যোগ্য-কর্মক্ষম-সুনাগরিক হও। সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল-সহনশীল হও। শ্বাশত-নিশ্চল-সংস্কার থেকে মুক্ত থাকো। বিজ্ঞান-গতিশীল-প্রগতিশীল সংস্কৃতিকে গ্রহন করো। উদার-দেশপ্রেমিক- আন্তর্জাতিকতাবাদী হও। রক্ষণশীলতা-প্রতিক্রিয়াশীলতা-সংকীর্নতা-উগ্রতা বর্জন করো। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সৎসাহসী-সক্রিয় হও। নেগেটিভ-নিরাশাবাদী দৃষ্টিভংগী বর্জন করে আশাবাদী-প্রো-একটিভ দৃষ্টিভংগী গ্রহন করো। নিজেকে উৎপাদনশীল, সৃজনশীল এবং আত্মকর্মশীল করো। তাহলে পরিবার ও তাই হবে। পরিবার যদি তাই হয়, সমাজ তাই হবে। সমাজ তাই হলে দেশ-জাতিও তাই হবে।
ইন্টুমনি তালুকদার: একজন সচেতন বুদ্ধিজীবি হিসেবে পাহাড় আর সমতলের আদিবাসী অধিকার নিয়ে আপনার প্রত্যাশা?
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: আমার প্রত্যাশা আগামী দিনগুলোতে দেশে যাতে সবসময় গণতান্ত্রিক-দেশপ্রেমিক-প্রগতিশীল শক্তিগুলো ক্ষমতাসীন থাকে। এজন্যে তাদেরকে আদিবাসীরা যথাসম্ভব সক্রিয় দৃঢ় সহযোগিতা দেবে। কারন দেশের ব্যাপক জনগণের সমস্যা ও আদিবাসী সমস্যা একই রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীন। দেশে ব্যাপক ভাগ্যহীন জনগণের ভাগ্যের সাথে আদিবাসী ভাগ্য জড়িত। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রগতিশীলদের, সক্রিয় সহানুভূতিশীলদের, দেশপ্রেমিকদের, আদিবাসীদের এবং তাদের মত দেশের দুর্ভাগা, ব্যাপক জনগনের সাথে সহযোগিতায় কাজ করতে হবে দেশের ব্যাপক দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের সুবিধা,অধিকার এবং আদিবাসী অধিকার লাভের জন্যে। আমি আশাবাদী যে, যে অধিকার বিশ্সংস্থায় স্বীকৃত, নন্দিত এবং যে অধিকার রাজ্য-সম্পদহারা আদিবাসীদের বনে জংগলে ভীত সন্ত্রস্ত জীবনের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার কবচ স্বরূ। যে অধিকার আদিবাসী মানুষকে অস্তিত্ব রক্ষার/বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে, সেই মানবিক, গণতান্ত্রিক, আদিবাসী অধিকারকে, দেশের জনগনের বৃহত্তর সুষম-উন্নয়নের স্বার্থে এদেশের সরকার স্বীকৃতি দেবে এবং আদিবাসীরাও সেই অধিকার ভোগ করবে।
ইন্টুমনি তালুকদার: আপনাকে ধন্যবাদ।
প্রমোদ বিকাশ কার্বারী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সকল পোস্ট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য