গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল হত্যাকান্ড ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের দুই বছর উপলক্ষ্যে সমাবেশ

গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল হত্যাকান্ড ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের দুই বছর উপলক্ষ্যে সমাবেশ

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মে আদিবাসী সাঁওতাল হত্যাকান্ড ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ঘটনার দুই বছর উপলক্ষ্যে ৬ নভেম্বর মঙ্গলবার সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ ও জনউদ্যোগের আয়োজনে গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহীদ মিনারে আদিবাসী-বাঙালি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, তিন সাঁওতাল হত্যাকান্ড ঘটনার পর থমাস হেমব্রম বাদী হয়ে ৩৩ জন নামীয়সহ ৫-৬শ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা করেন। কিন্ত গত দুই বছরে পেরিয়ে গেলেও সাঁওতাল হত্যার মূল আসামী গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বুলবুল আকন্দসহ মূল আসামীদের কেউই গ্রেফতার হয়নি। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ, শহীদ তিন ব্যক্তির পরিবারে আর্থিক সহায়তা এবং বাপ-দাদার সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাজে কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নেতৃবৃন্দ।

বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, ‘সেখানে যে হত্যাকান্ড, অগ্নিসংযোগ ও লুটের ঘটনা ঘটেছে তার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’ তিনি বলেন, ‘এ রকম একটি নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করার মতো ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটা আমাদের জাতির জন্য লজ্জাজনক।’

সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমরা যদি নিজেদের মানুষ হিসেবে মনে করি, তাহলে যেসব মানুষের অধিকার হরণ হচ্ছে, তাহলে তাদের পক্ষে দাঁড়াব। আমরা জোর গলায় বলতে চাই, এই মানুষেরা ঠিক যে অবস্থায় ছিল, সেই জায়গায় তাদের ফিরিয়ে আনা হোক। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। যাতে তারা যেভাবে জীবন চালাচ্ছিল, অন্তত সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারে।’

ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ ও বাগদা ফার্ম এলাকায় পরিকল্পিতভাবে পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ ও বাঙালি কৃষকদের ওপর আক্রমণ চালায়। পুলিশের উপস্থিতিতে চিনিকল মালিকের সন্ত্রাসীরা তাঁদের বাড়িঘরে আগুন দেয়। পুলিশের গুলিতে তিন জন সাঁওতাল নিহত হন।’

সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির আন্দোলনের এক পর্যায়ে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ওই এলাকায় আখ কাটার কথা বলে আদিবাসী উচ্ছেদ করতে গেলে আদিবাসী গ্রামে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিন সাঁওতাল শ্যামল হেমরম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু। আহত হন অসংখ্য সাঁওতাল। একই সাথে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ওইদিন। সমাবেশের শুরুতে বিশাল শোক র‌্যালি মাদারপুর জয়পুর গ্রাম থেকে বের হয়ে দীর্ঘ ১২ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। তিন আদিবাসী শহীদের স্মরণে পৌর শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পন ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করার পর ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, মানবাধিকার ও ভূমি অধিকার কর্মী শামসুল হুদা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য জেলা সভাপতি মিহির ঘোষ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ গাইবান্ধার আহবায়ক এ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ নওগাঁ জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল, ওয়ার্কার্স পার্টির রংপুর জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য অশোক সরকার, জেএসডি গাইবান্ধার জেলা সভাপতি লাসেন খান রিন্টু, জাসদ রংপুর মহানগর সভাপতি গৌতম রায়, ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম প্রধান, নারী আদিবাসী নেত্রী প্রিসিলা মুর্মু, আদিবাসী নেতা সুফল হেমব্রম, বার্নাবাস টুডু, দ্বিজেন টুডু, স্বপন শেখ প্রমুখ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য