বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৫

বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৫

 

আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকালীন বছরে (২০১৫) এদেশের আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন কোন আইনগত এবং নীতিগত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়নি। সরকার ২০১৫ সালে বেশ কিছু আইন, প্রবিধান এবং নীতিমালা পাশ করেছে, যেমন- বাংলাদেশ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ এ্যাক্ট ২০১৫ এবং লেবার রেগুলেশন ২০১৫ সংসদে পাস হয়েছে এবং গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫ মন্ত্রীসভায় অনুমোদন পেয়েছে। এই আইন বা নীতিমালাগুলোতে আদিবাসীদের ব্যাপারে স্পষ্টভাবে কোন কিছুই বলা হয়নি।

বন আইন সংশোধনীর কাজ ২০১২ সালে শুরু করে ২০১৫ সালেও সরকার তা অব্যাহত রেখেছিল। খসড়া বন আইন ২০১৫-তে বেশ কিছু বিধান আছে যেগুলো আদিবাসী ও বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য ক্ষতিকর। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ সংশোধনের উদ্যোগ ২০০১ সাল থেকে নেওয়া হলেও ২০১৫ সাল পর্যন্ত তা সংশোধন করা সম্ভব হয়নি। গতবছরের জানুয়ারিতে ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের জন্য দি¦তীয়বারের মতো ১৩ দফা সম্বলিত সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু জাতীয় সংসদে পাশ করার নিমিত্তে এখনো পর্যন্ত মন্ত্রীপরিষদেও পেশ করা হয়নি।

অন্যদিকে আদিবাসীদের পাঁচটি মাতৃভাষায় (প্রথমত ছয়টি) প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে আদিবাসী শিশুদের হাতে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আবারো ব্যর্থ হয়েছে যেটা ২০১৩ সালে দেওয়ার কথা ছিল। তথাপি আশার কথা হলো, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকীর পরিকল্পনার মতো সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০১৬-২০২০) খসড়াতেও আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র ও আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ বাস্তবায়নের কথা পুনরুল্লেখের মাধ্যমে সরকারের সদিচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে।

 

নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারের পরিস্থিতি

আদিবাসী জনগণের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার অনেক ক্ষেত্রেই লঙ্ঘিত হয়েছে। আদিবাসী অধিকার কর্মীরা যারা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, ভূমি এবং সম্পদের সুরক্ষা ও সংরক্ষণের ন্যায়সঙ্গত কর্মপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে তাদেরকে প্রায়ই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে তারা গ্রেফতার, আটক, গুম এবং এমনকি রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয়ে থাকে। ২০১৫ সালে কমপক্ষে ৭৪ জন আদিবাসী যার মধ্যে আদিবাসী নারী ও স্কুলের ছাত্রীকে পর্যন্ত ফৌজদারী অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তাদের বেশীরভাগই পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়েছে। অপরদিকে কমপক্ষে ১১৭ জন আদিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলের ১৩ জন আদিবাসী (৩ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু হত্যাসহ) বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে আদিবাসীদেরকে অবৈধ গ্রেফতার, আটক এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডর মতো ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে সংঘটিত হয়েছে। ১৯১ জনের অধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে যেখানে ২০১৪ সালে মাত্র ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

একই সময়ে কমপক্ষে ১৩৪ জন আদিবাসী যার মধ্যে ১০১ জন পার্বত্য চট্টগ্রামের এবং ৩৩ জন সমতলের আদিবাসীকে নির্যাতন ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করা হয়েছে। যেখানে আদিবাসীদের উপর শারীরিক নির্যাতনের বড় অংশই সংঘটিত হয়েছে প্রভাবশালী বাঙালিদের দ্বারা। এছাড়াও এধরনের ঘটনা ঘটার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষগুলো, যেমন- নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরোক্ষ সমর্থন বা নিস্ক্রিয় ভূমিকা ছিল।

দুষ্কৃতিকারীদের হাতে আদিবাসী বাড়ী-ঘর ভাঙচুর ও সম্পদ লুটের ঘটনাও ঘটেছে। গতবছর সমতলের কমপক্ষে ৮৪টি আদিবাসী পরিবারের বাড়িতে দুষ্কৃতিকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে অন্যদিকে সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কমপক্ষে ৩৪টি আদিবাসী পরিবারের বাড়ি ভূমিদস্যুরা অগ্নিসংযোগ করে ভস্মিভূত করেছে।

 

ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন

পূর্বের বছরগুলোর মত ভূমি সংক্রান্ত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ২০১৫ সালেও অব্যাহত ছিল। ২০১৫ সালে ভূমিদস্যূ কর্তৃক সমতলের ২৬টি আদিবাসী বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং ৬৫ টি বাড়িঘরে ভাংচুর ও লুটতরাজ চালানো হয়। ভূমি সংক্রান্ত সংঘর্ষে ৪৪ জন আদিবাসী- যাদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৫ জন এবং সমতলের ৩৯ জন আদিবাসী- ভূমিদস্যূদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।

২০১৫ সালে কমপক্ষে ৪৫ টি আদিবাসী পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে এবং ১৪০০ টি পরিবার উচ্ছেদের হুমকির মধ্যে রয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৬৫৭ টি পরিবার। ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সমতলের অন্তত একটি আদিবাসী গ্রাম হামলার শিকার হয়েছে, অপরদিকে সমতলের ১১.৫ একরসহ মোট ৫,২১৬ একর জমি রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষ কর্তৃক দখল করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে, বিশেষ করে বান্দরবানে বহিরাগত ভূমি ইজারাদার কর্তৃক আদিবাসী জুম্মদের জুম ও মৌজাভূমি বহিরাগতদের দ্বারা দখলের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে ঐ এলাকার আদিবাসী জুমচাষীদের জীবন ও জীবিকা হুমকির মধ্যে রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ২২.৫ একরসহ প্রায় ১৩২৬.৯৯ একর ভূমি অবৈধ জবরদখল ও অধিগ্রহণের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ২০১৫ সালে ভূমিদুস্যরা সমতল অঞ্চলে ১১ জনসহ মোট ২৮ জন প্রতিবাদকারী আদিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের করেছে।

১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ স্থল সীমান্ত চুক্তি ২০১৫ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে অনুমোদনের ফলে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার আদিবাসী খাসি জনগোষ্ঠীর পাল্লাথল পুঞ্জির মোট ৩৬০ একর ভূমি ভারতের হাতে চলে যাওয়ার শংকায় প্রায় ৩৫০ টি খাসিয়া ও গারো পরিবার চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে। এতে করে তাদের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে।

তথাকথিত ইজারাদার ও প্রাইভেট কোম্পানির রাবার চাষ, ক্যাম্প ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, সংরক্ষিত বন ঘোষণার নামে ও সেটেলার বাঙালি কর্তৃক জবরদখলের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা তাদের চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। অন্যদিকে প্রভাবশালী বাঙালি ভূমিদুস্য, চা বাগানের মালিক, জাতীয় রাজনৈতিক দলের নেতা ও সরকারি কর্তৃপক্ষ সমতলের আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের জন্য দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার, জাতীয় আইন ও নীতিমালা, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং সমতলে পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ অমান্য করে ভূমি জবরদখল করা হয়। এক্ষেত্রে সমতলে স্থানীয় পুলিশ ও ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা প্রায়ই ভূমিদস্যূদের সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে; তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী, সেটেলার বাঙালি ও বেসরকারি কোম্পানিরাই ভূমি জবরদখলে জড়িত। বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী অপরাধীদের দায়মুক্তির কারণে ভূমি-কেন্দ্রীক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলেছে।

 

আদিবাসী নারী   কন্যাশিশুদের পরিস্থিতি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সারাদেশে ৮৫ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৪ জন পার্বত্য চট্টগ্রামের এবং ৪১ জন সমতলের আদিবাসী নারী ও শিশু। ২০০৭ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মোট ৪৩৪ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতন সহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে ২৬ টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণ, ৩ টি হত্যা, ১১ টি শারীরিক লাঞ্ছনা, ১৬ টি ধর্ষণের চেষ্টা, ৫টি অপহরণ, ৬ টি শারীরিক ও যৌন হয়রানি এবং ২টি পাচারের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালে সংঘটিত মোট ৬৯ টি ঘটনার মধ্যে ৩৮টি পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং বাকিগুলো সমতলে সংগঠিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানা যায়, ঘটনার শিকার নারী ও শিশুদের বয়স ৪ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে ৬৯ টি ঘটনার মধ্যে ৪৬ টি ঘটনায় শারিরীক ও যৌন নিপীড়নের মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বাকিগুলো স্থানীয় সালিশি দ্বারা মীমাংসিত হয়েছে অথবা পুলিশের কাছে মামলা করা হয়নি। উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭৮% ঘটনা অ-আদিবাসী কর্তৃক, ১৫% আদিবাসী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে; পক্ষান্তরে ৬% এর ক্ষেত্রে ঘটনা সংঘটনকারীদের চিহ্নিত করা যায়নি এবং ১% ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দ্বারা সংঘটিত হয়েছে।

পূর্বের বছরগুলোর মতো বাংলাদেশে আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অধিকাংশ ঘটনা ভূমি কেন্দ্রীক। জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণে এই সহিংসতা ঘটে বলে বলা যায়। ভূমি দখল, ভূমি থেকে উচ্ছেদের প্রয়াসে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আদিবাসী নারীদের উপর সহিংসতা চালানো হয়। আদিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যেই এ সমস্ত সহিংসতার প্রধান উদ্দেশ্য। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ২০১৫ সালের ১৯ জুন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে একদল ভূমিদস্যূ আদিবাসীদের উপর হামলা চালায়, এতে ১০ জন আদিবাসী নারী ও শিশু আহত হয়। গত বছরের ২৪ জুলাই কিছু সেটেলার বাঙালি ভূমি দখলের উদ্দেশ্যে এক মারমা নারীকে ছুরিকাঘাত করে মারাত্মকভাবে আহত করে। সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে আদিবাসী নারী ও শিশুর উপর উদ্বেগজনক হারে সংঘটিত সহিংস ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনারও ন্যায় বিচার পাওয়ার উদাহরণ নেই। পক্ষান্তরে অধিকাংশ ঘটনায় বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতির কারণে এবং ফলশ্রুতিতে দোষীর ব্যক্তির প্রতি পক্ষপাতিত্বের ফলে ঘটনা সংঘটনকারী ব্যক্তিরা জামিনে জেল থেকে বের হয়ে এসেছে এবং অপরাধের শাস্তি থেকে রেহাই পেয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ২০১৫ সালে সংঘটিত মামলাগুলোর মধ্যে যেসব ঘটনার মামলা সংঘটিত হয়েছে তার কোনটির যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যদিও মামলা দায়েরের পর কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেফতার ও জেলে প্রেরণ করা হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি ও বিচারহীনতার কারণে এ ধরনের ঘটনা দেশে ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমা অপহরণকারীদের আজ পর্যন্ত বিচারের জন্য আদালতে হাজির করানো যায়নি। উক্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার ২২ বার সময় নিলেও তা এখনো জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। সমতলের আদিবাসী নারী নেত্রী বিচিত্রা তির্কির উপর ভূমিদস্যূদের বর্বরোচিত হামলা সংক্রান্ত মামলায় হামলাকারীরা তদন্ত কর্মকর্তা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে ২০১৪ সালের আগস্টে জেল থেকে জামিন নিতে সক্ষম হয়েছে। সুজাতা চাকমা (১১ বছর বয়সী) এর বিচার প্রক্রিয়া খুবই মন্থর গতিতে চলছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৩-২০১৪ সালে পাঁচজন স্বাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া হলেও ২০১৫ সালে কোন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়নি।

 

যুব, শিশু এবং শিক্ষার অধিকারের পরিস্থিতি

যেখানে দেশের আদিবাসীদের সামগ্রিক পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে, তার চেয়েও আদিবাসী শিশু ও যুব এবং তাদের শিক্ষার অধিকারের চিত্র খুবই নাজুক। আদিবাসী যুব এবং শিশুদের শিক্ষার অধিকারের ইস্যুটি প্রায় উপেক্ষিত; এ নিয়ে খুব বেশী আলোচনাও করা হয়না এবং এই বিষয়ে পৃথক ও বস্তুনিষ্ঠ তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এ কারণে দেশের আদিবাসী শিশুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা খুবই কঠিন। তবে পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের আদিবাসী শিশুরা দুই ধরনের অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়- প্রথমত আদিবাসী হিসেবে তাদের অধিকার লঙ্ঘন হয়, দ্বিতীয়ত শিশু হিসেবে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুস্বাক্ষরকারী হলেও প্রতিনিয়ত আদিবাসী শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন করা হয়। সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত শিশু অধিকার কমিটির বাংলাদেশ পর্যালোচনায় পরিস্থিতির চিত্র করুণভাবে ফুটে উঠেছে। শিশু অধিকার কনভেনশন এর আলোকে শিশুদের অধিকারকে সম্মান প্রদর্শন, সুরক্ষা এবং প্রতিপালনের জন্য বাংলাদেশে শিশু আইন ২০১৩ পাশ করা হয়। বস্তুত এই আইন কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে, আইনের ধারাগুলো সরকার যথাযথভাবে এখন পর্যন্ত পূরণ করতে পারেনি। পাশাপাশি আদিবাসী শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট কোন ধারা বা তাদের সম্পর্কে কোথাও কোন কিছু এই আইনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ২০১৫ সালে এসেও আদিবাসী শিশুদের অধিকার প্রচন্ড ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে।

আদিবাসীদের শিক্ষা অধিকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নীতি নির্ধারণী মহলে কিছুটা আলোচনায় এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের গৃহীত বেশ কিছু পদক্ষেপের মধ্যে মাতৃভাষা ভিত্তিক শিক্ষা প্রবর্তন করার পরিকল্পনা, পাড়াকেন্দ্র (গ্রাম-সেন্টার) স্থাপন এবং নিরক্ষরতা হার কমিয়ে আনা ইত্যাদি অন্যতম। যদিও সরকার আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, কিন্তু দীর্ঘ বছর পরেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৫ সালে শিক্ষার অধিকার পরিস্থিতির কিছুটা ইতিবাচক অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও পূর্বের বছরগুলোর মতোই এখনো নাজুক অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অবস্থা

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভূমি ও অন্যান্য অধিকারসহ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো বাস্তব অগ্রগতি ব্যতীত ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারা সংশোধনের জন্য সরকারের প্রতিশ্রুতি এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।

এথানে উল্লেখ্য যে, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতির মধ্যকার বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৬ টি সংযুক্তিসহ “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যেসব বিষয় বাস্তবায়িত হয়নি তার বিবরণ” শিরোনামে ১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন গত ১ এপ্রিল ২০১৫ প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি।

পার্বত্যাঞ্চলের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে অগ্রাহ্য করে, আত্মনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ধারাকে খর্ব করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র ও বিশ্ব আদিবাসী সম্মেলনের ওয়াটকাম দলিলে স্বীকৃত স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতির অধিকার পদদলিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক মন্তব্য